E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: পাত পেড়ে খিচুড়ি

মফস্‌সল থেকে এলাম শহর কলকাতার স্কুলে শিক্ষকতার কাজে। ঠাটবাট একেবারে আলাদা। আমাদের সহকর্মী সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদারের তত্ত্বাবধানে প্রতিমা গড়া হত।

শেষ আপডেট: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:২৫

Sourced by the ABP

অনিতা অগ্নিহোত্রীর ‘হারিয়ে যাওয়া বাণী-আরাধনা’ (রবিবাসরীয়, ১৮-১) প্রবন্ধে সরস্বতী পুজোর সে-কাল ও এ-কালের একটি বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে। যুগ ও জীবনের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সরস্বতী পুজোর ভাব ও আঙ্গিকে গত কয়েক বছরে যে দ্রুত পরিবর্তন ঘটেছে, তা অভিজ্ঞতায়ও ধরা পড়ে।

মফস্‌সলে বড় হয়েছি। ছোটবেলায় পুষ্পাঞ্জলি দিয়েছি স্কুলে গিয়ে। স্কুলে পুষ্পাঞ্জলি হত দুপুর বারোটার দিকে। খিদের জ্বালায় ছটফট করতাম। তাই পুষ্পাঞ্জলি দেওয়ার আগে বাড়িতে এক অভিনব প্রথা চালু হল। ভোররাতে ঘুম থেকে উঠে দাঁত মেজে মায়ের তত্ত্বাবধানে খেয়ে নিতাম দুধ-গুড় মিশিয়ে এক বাটি মুড়ি। ব্যস, আর তো চিন্তা নেই। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সারা গায়ে সর্ষের তেল মেখে কপালেশ্বরী নদীর স্বচ্ছ জলে ডুব দিতাম। তার পর পরিষ্কার জামা-প্যান্ট পরে সোজা মাঠ পেরিয়ে দৌড় লাগাতাম নিজের স্কুলে। সেখানে তখনও ঠাকুরমশায়ের দেখা নেই। এই সুযোগে বন্ধুদের সঙ্গে স্কুলের বিরাট চত্বরে ঘুরে বেড়াতাম, গল্প করতাম। কাঁসর, ঘণ্টা, শাঁখের আওয়াজ শুনতে পেলেই দৌড়ে হাজির হতাম পুজো প্রাঙ্গণে। তার পর সেই বহু প্রতীক্ষিত পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া। তবে চোখ বন্ধ করে পুষ্পাঞ্জলি শেষে দেবী সরস্বতীর কাছে কখনও পড়াশোনায় ভাল হওয়ার জন্য বর চেয়েছি বলে মনে পড়ে না। শুধু মনে পড়ে, বন্ধুদের সঙ্গে এক সারিতে বসে কলাপাতায় গরম গরম খিচুড়ি, বাঁধাকপির তরকারি, টমেটোর চাটনি, বোঁদে খাওয়ার কথা। আর অবশ্যই সন্ধ্যাবেলা পুজো প্রাঙ্গণে ছাত্র-শিক্ষক সমন্বয়ে গান-বাজনার আসরে যোগ দেওয়া। কী আনন্দই না ছিল আমাদের স্কুলের সেই সরস্বতী পুজোয়।

মফস্‌সল থেকে এলাম শহর কলকাতার স্কুলে শিক্ষকতার কাজে। ঠাটবাট একেবারে আলাদা। আমাদের সহকর্মী সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদারের তত্ত্বাবধানে প্রতিমা গড়া হত। ছাত্ররা তাঁকে সাহায্য করত মাটি, খড়, বাঁশের টুকরোর জোগান দিয়ে। তাতে স্কুলে মাসখানেক কিছুটা হইচই হলেও শিক্ষকরা মানিয়ে নিতেন। প্রধান শিক্ষকও এ সব সৃষ্টিশীল কাজে খুব উৎসাহ দিতেন। পুজোর আগের দিন ছাত্রদের নিয়ে বাজারহাট, কেনাকাটা তো ছিলই। প্রতিমার সামনে বিরাট আলপনা দেওয়া হত। পুরোহিত না-পাওয়া গেলে আমাদের সহকর্মী মুরারিবাবু পুজো করতেন। ছাত্ররা এসে দলবেঁধে পুষ্পাঞ্জলি দিত। প্রথম প্রথম ছাত্রদের খিচুড়ি, তরকারি, বোঁদে খাওয়ানো হলেও পরে খিচুড়ির জায়গায় এল লুচি, আলুর দম, পান্তুয়া। তাতে এক বিপত্তি দেখা দিল। বেশ কিছু ছাত্র দু’পকেট ভরে লুচি নিয়ে পালাল। অবশেষে ও-সব বাদ দিয়ে ফ্রায়েড রাইস, ছোলার ডাল, আলুর দম, মিষ্টি খাওয়ানো হত।

অমরনাথ করণ, কলকাতা-৬০

স্মৃতির পুজো

‘শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি’ (২১-১) শীর্ষক ছবিতে সরস্বতী প্রতিমার সারি সারি মূর্তি দেখে প্রায় ষাট-পঁয়ষট্টি বছর আগের সরস্বতী পুজোর কথা মনে এসে গেল। যৌথ পরিবারে মানুষ হয়ে ওঠা আমরা সকলে মিলে সরস্বতী পুজো ভীষণ ভাবে উপভোগ করতাম। আমাদের ছোটদের নিয়ে বাবা-জেঠু বাড়ির কাছাকাছি পটুয়াপাড়া থেকে প্রতিমা আনতে যেতেন। তার আগে বাড়ির সদর ঘরের সমস্ত আসবাবপত্র সরিয়ে রেখে ঘর ফাঁকা করে ধুয়ে-মুছে রাখা হত। সে ঘর তখন পুজোর ঘর। পুজোর আগের দিন দুপুর, বিকাল, সন্ধ্যা ধরে ঠাকুর সাজানোর কাজ চলত। দেবীপ্রতিমার কাপড়ের মধ্যে চুমকি বসিয়ে, বীণার উপর সুতো দিয়ে তার তৈরি করে, শোলার অলঙ্কারের উপর নিজেদের পছন্দমতো আরও অলঙ্কার দিয়ে ঠাকুর সাজাতাম। দরজার সামনে দেবদারু পাতা দিয়ে তোরণ তৈরি করা হত। মা-জেঠিমার সিল্কের শাড়ি দিয়ে ঘরেই মণ্ডপ তৈরি করতাম। নতুন একটা কাপড় টাঙিয়ে চাঁদোয়া বানানো হত। তার পর নানা রঙের সেই কাগজ সরু করে কেটে ময়দার তৈরি আঠা দিয়ে জুড়ে জুড়ে শিকলি বানাতাম। পুজোর ঘরে ও বাইরে সেই রঙিন শিকলি টাঙানো হত।

সরস্বতী পুজোর সময় আমাদের নতুন জামা হত। সুতির কাপড়ের সাদা রঙের পোশাক। সেই নতুন সাদা জামাকে মায়েরা বাসন্তী রং তৈরি করে তাতে ছুপিয়ে দিতেন। সেই বাসন্তী রঙের জামা পরেই আমরা অঞ্জলি দিতাম। পুজোর দিন অঞ্জলি না-দেওয়া পর্যন্ত একবারে উপবাস। তাই বাড়ির বড়দের অনুরোধে পুরুতমশাই পুজো শুরুর কিছুটা সময় পরে আমাদের ছোটদের দিয়ে অঞ্জলি দেওয়াতেন। আমাদের খাওয়া হত, আবার পুজোও চলত।

অমলকুমার মজুমদার, শিবপুর, হাওড়া

অন্তঃসারশূন্য

তরুণকান্তি নস্করের ‘বাড়ছে স্কুলছুট, কমছে স্কুল’ (১৭-১) শীর্ষক প্রবন্ধটি সারা ভারতে শিক্ষাব্যবস্থার করুণ চিত্রকে তুলে ধরেছে। তিনি নির্দেশ করেছেন ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ নামক কেন্দ্রীয় প্রকল্পটি অনেকাংশে ম্লান হয়ে গেছে। কিশোরীদের শিক্ষার বিকাশ ও চেতনার প্রসার সে ভাবে হচ্ছে না। আমাদের পশ্চিমবঙ্গে রয়েছে কন্যাশ্রী প্রকল্প, তরুণের স্বপ্ন প্রকল্প। কিন্তু তাতে স্কুলছুট আটকানো যাচ্ছে না। অথচ, ছাত্রছাত্রীদের সুবিধার কথা ভেবেই সরকারি মিড-ডে মিল প্রকল্প, বই-খাতা দেওয়া, পোশাক, সাইকেল বিতরণ প্রভৃতি নানান প্রকল্প চালু আছে। কিন্তু বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে।

এ বড় দুঃসময়। এক শ্রেণির অভিভাবক সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আর ভরসা রাখতে পারছেন না। ফলে আমাদের রাজ্যে অনেক এসএসকে (শিশু শিক্ষা কেন্দ্র), এমএসকে (মাধ্যমিক শিক্ষা কেন্দ্র), সরকারি ও সরকার পোষিত বিদ্যালয় একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কন্যাশ্রী প্রকল্প চালু থাকা সত্ত্বেও আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে গ্রামাঞ্চলে নাবালিকা বিবাহ হচ্ছে। মনে হয় আমরা যেন স্রোতের বিপরীতে চলেছি। শিক্ষার অধিকার আইন, সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়েছে। তাই ছাত্রছাত্রীদের আনন্দময় পাঠ দিতে গেলে, স্কুলমুখী করতে গেলে শিক্ষা বিভাগের আধিকারিকদের নতুন করে ভাবনাচিন্তার প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়।

রতন নস্কর, সরিষা, দক্ষিণ ২৪ পরগনা

ভারসাম্য চাই

বাংলা মাধ্যম ও ইংরেজি মাধ্যম নিয়ে আজ এত বেশি আলোচনা হচ্ছে, তার পিছনে রয়েছে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সামাজিক পরিবর্তন। দীর্ঘ দিন ধরে বাংলায় পড়াশোনা করেই বহু মানুষ প্রশাসন, সাহিত্য, বিজ্ঞান ও বিভিন্ন পেশায় সাফল্য পেয়েছেন। কিন্তু বিশ্বায়নের যুগে চাকরি, উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি ও গবেষণা ক্ষেত্রে ইংরেজির প্রয়োজনীয়তা বেড়েছে। তাই অনেক অভিভাবক মনে করেন, ইংরেজি মাধ্যমেই ভবিষ্যৎ বেশি নিরাপদ।

ছোটদের প্রাথমিক শিক্ষা মাতৃভাষায় হলে তারা সহজে বিষয় বুঝতে পারে, ভাব প্রকাশ করতে পারে এবং শেখার ভিত্তি মজবুত হয়, চিন্তার জগৎ বিকশিত হয়। এর পর ধীরে ধীরে ইংরেজিতে দক্ষতা গড়ে তুললে তারা দেশ-বিদেশের সুযোগও পেতে পারে। যদি আমরা নিজের ভাষাকেই ছোট করি, তা হলে শিক্ষার্থীর মনেও হীনম্মন্যতা জন্মায়। যত দামি স্কুল তার তত ভাল শিক্ষা, আর তার মানেই তত দ্রুত পেশায় সাফল্য— এ-হেন ভাবনা থেকে বার হতে হবে। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি পরিচয়ের অংশ। তাই ক, খ, গ আর এ, বি, সি, ডি-কে প্রতিদ্বন্দ্বী না-ভেবে এক সঙ্গে শেখার পরিবেশ তৈরি করাই আজকের সময়ের দাবি। শিক্ষা যেন কেবল পরীক্ষায় নম্বর তোলার জন্য না-হয়ে জীবনের জন্য প্রস্তুতি হয়, যেখানে থাকবে যুক্তিবোধ, মানবিকতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, পরিবেশ সচেতনতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ। ভাষা সেই পথে চলার একটি মাধ্যম মাত্র। তাই ভাষার লড়াই নয়, শিক্ষার মানোন্নয়নই হোক মূল লক্ষ্য। মাতৃভাষায় দৃঢ় ভিত্তি ও ইংরেজিতে দক্ষতা— এই দুইয়ের সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে আত্মবিশ্বাসী ও সফল ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।

সন্দীপন সরকার, পাল্লা রোড, পূর্ব বর্ধমান

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

rituals

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy