শ্রীমন্তী রায় রচিত “‘নরম মেয়ে’র উপাখ্যান” (১০-১) প্রবন্ধ পড়ে আমাদের পিতামহের কাছে শোনা এক বড় ইস্পাত কোম্পানির এক বিজ্ঞাপনের ভাষা মনে পড়ল ‘উই আর আ সফট হার্টেড স্টিল কোম্পানি’। আমাদের এই উন্নয়নশীল বিশ্বের বঙ্গ সমাজের মেয়েরা বড় হয়ে ওঠার পথে দেখেছি, শুনেছি, সংসার সুখী হয় শুধুমাত্র রমণীরই গুণে। সংসারে সেই মেয়েদের নানা ‘তন্ত্র’ বেঁধে ফেলেছে যুগ যুগ ধরে। এমনই আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধেছে যে, অসংখ্য নীরব হাহাকার, দীর্ঘশ্বাস ঘরের নিভৃত কোণটিতে মিলিয়ে গিয়েছে। আমরা মেয়েরা এই ‘তন্ত্র’-এ এমন ভাবে সেঁধিয়ে গিয়েছি যে, বুঝতেই পারছি না কোনটা প্রকৃত আমি। যতটা আমরা চাই আমাদের মতো করে, সেই জায়গাটা আমাদের সবচেয়ে কাছের জনরাই হরেক নিয়মের পাকে বেঁধে হাত-পা নাড়ানোর জায়গাটুকুও রাখেনি।
অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, প্রেমেন্দ্র মিত্র, প্রতিভা বসু, আশাপূর্ণা দেবী, সুচিত্রা ভট্টাচার্য প্রমুখ তাঁদের গল্পের মহিলা চরিত্রদের বৃত্ত ভেঙে বেরোনোর পথটি দেখিয়েছেন। বিশেষ ভাবে উল্লেখ্য আশাপূর্ণা দেবী। একেবারে শূন্য থেকে শুরু করে পূর্ণতার শেষে উপচে পড়ার মতো শক্তি দেখিয়েছেন তিনি। সশব্দে পুরুষতন্ত্রকে আঘাত না করে দেখিয়েছেন এ ভাবেও পরিবর্তন করে দেখানো যায়। মেয়েদের সীমাকে সীমাবদ্ধতা বলে তিনি ধরে নেননি। যেমন নেয়নি বঙ্কিমচন্দ্রের কপালকুণ্ডলা, দেবী চৌধুরানীর মতো চরিত্ররা। ছোট ছোট পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজের রুচি, দৃষ্টিভঙ্গি, কাজের ধারার পরিচয় তুলে ধরে ধৈর্য সহকারে নিজেকে সকলের কাছে পরিবর্তনকামী রূপে প্রতিপন্ন করাই প্রাথমিক পন্থা। সে ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনের স্পর্শের মাধ্যমে একটু একটু করে দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে পারে। তবে মুখ বুজে সহ্য করা একেবারেই নয়। মুখ খুলে কিছু বলার চেয়ে করে দেখানোই সেরা পথ। আজকাল আগের মতো সময় আর নেই। মেয়েদের হাতে নানা ভাবে কিছু অর্থের সমাগম হচ্ছে। সেটুকুও কম নয়। আর সামাজিক ক্ষেত্রে বহুবিধ কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগে পারস্পরিক ভাব বিনিময়ও চলছে। তবে এ-ও যে ভিন্ন ধরনের এক ‘তন্ত্র’, সেটুকু অস্বীকার করে লাভ নেই।
প্রতিমা মণিমালা, হাওড়া
পরিপূরক
শ্রীমন্তী রায়ের প্রবন্ধ “‘নরম মেয়ে’র উপাখ্যান” পড়ে একটু একপেশে মনে হল। প্রবন্ধকার বলছেন মেয়েদের স্বাধীনতার পরিসর পুরুষের ঠিক করে দেওয়া। কিন্তু বাস্তবে আমরা অনেক নারীকেই জানি, যাঁরা প্রবল স্বাধীন চিন্তার অধিকারী। প্রথমেই রানি রাসমণির কথায় আসা যাক, প্রবল বুদ্ধিমত্তা, স্বাধীন চেতনার অধিকারিণী, সেই আমলে যখন বহু পুরুষ রায়বাহাদুর উপাধি পাওয়ার জন্য ইংরেজদের পদলেহন করছেন, তখন রানি রাসমণি ইংরেজদের জব্দ করে গঙ্গায় তাদের নৌবহর আটকে দিয়েছিলেন, প্রজাদের স্বার্থে। মা সারদা ধর্ম-বর্ণ সব কিছু অতিক্রম করে বলেছেন, শরৎ (সন্ন্যাসী স্বামী সারদানন্দ) যেমন তাঁর সন্তান, তেমনই নিম্নবর্গীয় মুসলমান আমজাদও তাঁর সন্তান। সেই সময়কালে সেই সমাজে এই রকম ঘোষণা করতে হলে কতটা সাহস দরকার হয়, বলার অপেক্ষা রাখে না! আর গৃহস্থালি কাজকর্ম করলে নারীর ক্ষমতা সঙ্কুচিত হচ্ছে, এই ধারণাটিও অতিসরলীকরণ। একটা সংসার পরিচালনা করতে গেলেও অনেকগুলি কাজের মধ্যে সমন্বয় সাধন করতে হয়। যেমন— রান্নার কাজ, বাড়ির সদস্যদের দেখাশোনা, সন্তানদের পড়াশোনা, অতিথি আপ্যায়ন, লৌকিকতা— বিভিন্ন বিভাগকে একই সঙ্গে সমান দক্ষতায় পরিচালনা করতে হয়। এটা করতে পারাও মেয়েদের পক্ষে গৌরবের।
এখনকার সমাজে কোন কাজটি পুরুষের জন্য, আর কোন কাজটি নারীদের জন্য— এমনটা আলাদা করে ভাবার প্রবণতা অনেক কমে এসেছে। পুরুষরা যেমন শেফের কাজ করছে, একই সময় মেয়েরাও বোমারু বিমান চালাচ্ছে। যখন কারও লেখা গল্প পড়ে ভাল লাগে, তখন কিন্তু পাঠক প্রথমেই এটা ভাবতে বসেন না, গল্পটি এক জন মহিলা লিখেছেন, না কি কোনও পুরুষ লিখেছেন! পাঠকের কাছে গল্পটি সুখপাঠ্য কি না, সেটিই বিবেচ্য। প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীর চারিত্রিক দৃঢ়তা এবং মানসিক শক্তির সমতুল্য কত জন পুরুষ রাজনীতিবিদ ভারতীয় রাজনীতিতে এসেছেন? মাতঙ্গিনী হাজরা গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন, তাঁকে কি অবলা নারী বলা যাবে? মেরি কম ভারতের মুখ উজ্জ্বল করেছেন, পি ভি সিন্ধু, সানিয়া মির্জা, ভারতের বিশ্বকাপজয়ী মহিলা ক্রিকেট দলের সদস্যরা— আর কত মহিলা খেলোয়াড়ের কথা বলব, যাঁরা শারীরিক মানসিক সব দিক থেকেই দৃঢ়? আসলে নারীর সঙ্গে পুরুষের কোনও প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই, তাঁরা একে অপরের পরিপূরক।
সর্বানী গুপ্ত, বড়জোড়া, বাঁকুড়া
বালুচরি
শৈবাল বসুর ‘একটি শাড়ির যাত্রাপথ’ (৭-২) প্রবন্ধে ‘বাংলার অসাম্প্রদায়িক সাধনা’র মূল্যবান পরিচয়ের জন্য ধন্যবাদ জানাই। নিম্নবর্ণের কায়িক শ্রমের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বৌদ্ধিক শ্রমের মিলনের ফসল এই বালুচরি বয়ন শিল্প। উৎপাদিত শাড়ি ক্রমাগত হাতবদলের মাধ্যমে উচ্চবর্ণের অবস্থাপন্ন ক্রেতার সম্পত্তি হয়ে যায়। কিছু পৌঁছে যায় বিদেশের জাদুঘরে। উৎপাদক হিসেবে শিল্পী, অসাম্প্রদায়িক সাধনাভিত্তিক শিল্পকে মধ্যস্বত্বভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পারিশ্রমিক কমে যাওয়া, শোষণের নিয়তিকে বাধ্য হয়েই মেনে নিতে হয়। ফলে এই সাধনা পূর্ণবৃত্তে সুফল দিতে পারে না। প্রবন্ধকার বর্ণিত হিন্দু-মুসলিম মিলিত শিল্পসাধনার আলোর অপর দিকে আজকের অন্ধকার ভাবা যায়নি। ইতিমধ্যে বয়নশিল্পে সম্ভাবনাপূর্ণ সমবায় অর্থনীতির অস্তিত্ব আক্রান্ত হয়েছে লোভসর্বস্ব অনৈতিকতা ও সাম্প্রদায়িক পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির দ্বারা। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিল্প-সংস্কৃতি কোনও দিকে বালুচরি শিল্প ও শিল্পীসাধনা পরবর্তী প্রজন্মের জীবিকা নিশ্চিত করতে পারছে না। প্রায় সব ধরনের বয়নশিল্পী বর্তমানে প্রচলিত যন্ত্র প্রযুক্তিতে সম্ভবত শেষ প্রজন্ম। নবীন প্রজন্মকে আধুনিক যন্ত্র প্রযুক্তি অন্য জীবিকায় নিয়ে যাচ্ছে। অথচ, শ্রমবিকাশের সম্ভাবনা ছিল যদি সরকার প্রকৃত অর্থে সহায়ক হত। পশ্চিমবঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুকূলে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে। কিন্তু বিনাশ্রমে অনুদান-নির্ভর রাজনীতি শ্রমনিবিড় এই সব শিল্পে বিনিয়োগ ও উৎসাহ কেড়ে নিচ্ছে। ভোটসর্বস্ব রাজনীতি রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় অশান্তি বাড়িয়ে সাম্প্রদায়িকতাকে ইন্ধন দিচ্ছে। আগামী দিনে বয়নশিল্পে বাংলার ইতিহাসের কলঙ্কিত অমানবিক ও সাম্প্রদায়িক ইতিহাসের ভিতটি থাকবে নেপথ্যে।
শুভ্রাংশু কুমার রায়, চন্দননগর, হুগলি
অব্যবস্থা
বিধাননগর পরিকল্পিত শহর হিসেবে পরিচিত হলেও এখানকার ফুটপাত ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা গভীর উদ্বেগের কারণ। বহু জায়গায় ফুটপাত ও ফুটপাত সংলগ্ন বাড়ির মধ্যে প্রায় ৮ থেকে ১০ ইঞ্চি উচ্চতার তফাত দেখা যায়। ফলে পথচারীদের, বিশেষত বয়স্ক নাগরিকদের বার বার নীচে নামতে হচ্ছে ও উঠতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত কষ্টকর এবং বিপজ্জনক। এর পাশাপাশি ফুটপাত সংলগ্ন রাস্তায় সারি দিয়ে গাড়ি পার্ক করে রাখার ফলে বহু ক্ষেত্রে পথচারীদের ফুটপাত ছেড়ে ব্যস্ত রাস্তায় নেমে হাঁটতে হয়। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বহু গুণ বেড়ে যায়, বিশেষ করে রাতে ও বর্ষাকালে। এমন চিত্র কলকাতার অন্যত্রও হামেশাই দেখা যায়। কিন্তু একটি পরিকল্পিত শহরে এমন অব্যবস্থা অনভিপ্রেত। অবিলম্বে ফুটপাতের উচ্চতা সমান করা, বেআইনি পার্কিং নিয়ন্ত্রণ এবং পথচারীবান্ধব পরিকাঠামো গড়ে তোলার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা করা হোক।
দেবপ্রসাদ ঘোষ দস্তিদার, কলকাতা-৯৭
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)