বন্ধ্যত্বের চিকিৎসার পরে গর্ভবতী হয়েছিলেন বছর ২৪-এর তরুণী। কিন্তু, একের পর এক শারীরিক জটিলতায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল সুস্থ সন্তানের জন্ম দেওয়া নিয়ে। বিশেষত, জরায়ুতে আঙুরের থোকার মতো তরল ভর্তি থলি বা টিউমার তৈরি হয়ে দেখা দিয়েছিল সব চেয়ে বড় সমস্যা। যদিও তার পরেও আর জি কর মেডিক্যাল কলেজহাসপাতালের স্ত্রী-রোগ বিভাগের চিকিৎসকদের সহযোগিতায় সুস্থ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন হুগলির বাসিন্দা ওই তরুণী।
চিকিৎসকদের দাবি, প্লাসেন্টায় আংশিক ‘মোলার চেঞ্জ’, অর্থাৎ জরায়ুতে বেশ কিছু আঙুরের থোকার মতো তরল ভর্তি থলি বা টিউমার তৈরি হওয়ার পরেও সুস্থসন্তান প্রসবের ঘটনা বিরল। বিশ্বে এখনও পর্যন্ত ১২-১৪টি এমন ঘটনা রয়েছে বলে জানাচ্ছেন আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের স্ত্রী-রোগ বিভাগের শিক্ষক-চিকিৎসক অভিজিৎ রক্ষিত।
হুগলির কামারকুণ্ডুর বাসিন্দা জেসমিনা সিদ্দিকা গর্ভবতী হওয়ার পরে ‘এনটি-স্ক্যান’ করতেই ধরা পড়ে সমস্যা। দেখা যায়, গর্ভস্থ ভ্রুণ ঠিকঠাক থাকলেওপ্লাসেন্টায় আংশিক ‘মোলার চেঞ্জ’ রয়েছে। যার ফলে গর্ভস্থ শিশুর শারীরিক গঠন ঠিক মতো না হওয়ার আশঙ্কাই সব চেয়ে বেশি। এমন পরিস্থিতিতে জেসমিনা ও তাঁর স্বামী সৈয়দ মোকারাম হোসেনের কাউন্সেলিং করেন অভিজিৎ। তিনি বলেন, ‘‘ঝুঁকির বিষয়টি ওঁদের বুঝিয়ে বলার পরেও ওঁরা গর্ভপাত করাতে রাজি হননি। বরং, মনের জোর নিয়ে ছিলেন ওই দম্পতি। তাতে আমরাও বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম।’’ চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, ২০ সপ্তাহের মাথায় অ্যানোম্যালি স্ক্যান করে দেখা যায়, বাচ্চার গঠন স্বাভাবিক রয়েছে। কিন্তু তরুণীর জরায়ু মুখ খুলে গিয়েছে। ২১ সপ্তাহের মাথায় সেটি সেলাই করে দেন অভিজিৎ। কিন্তু তার পরে আবারও তৈরি হয় সমস্যা।
৩১ সপ্তাহের মাথায় ‘গ্রোথ-স্ক্যান’ করে দেখা যায়, গর্ভস্থ শিশুর বৃদ্ধি কম হচ্ছে। তখন জেসমিনাকে ভর্তির সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকেরা। পরে, ২৯ জানুয়ারি আর জি করে ভর্তির দিন দশেক পর থেকে আচমকাই ওই তরুণীর সারা শরীরে চুলকানি শুরু হয়। তিনি চিকিৎসকদের জানান, শিশুটি কম নড়াচড়া করছে। অভিজিৎ জানাচ্ছেন, তখন বিশেষ একটি রক্ত পরীক্ষা (বাইল অ্যাসিড) করে দেখা যায়, তাতে যে পরিমাপ এসেছে, সেটি গর্ভস্থ শিশুর পক্ষে ঝুঁকির। এর পরে আর বেশি দেরি করার ঝুঁকি নেননি চিকিৎসকেরা।
গত ৫ ফেব্রুয়ারি ওই তরুণীর সিজ়ার করেন অভিজিতেরা। তাতে সুস্থ পুত্রসন্তানের জন্ম দিয়েছেন জেসমিনা। এখনও তিনি আর জি করে চিকিৎসাধীন। মঙ্গলবারওই তরুণী বলেন, ‘‘অনেক বাধা এসেছিল। কিন্তু আমরা ঠিক করেছিলাম, শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করব। আর ডাক্তারবাবুরাও তাতে আমাদের মনে সাহস দিয়েছিলেন।’’ একের পর এক বাধা পেরিয়ে ওইতরুণীকে সুস্থ সন্তান জন্ম দিতে সহযোগিতা করতে পেরে খুশি অভিজিৎ-সহ তাঁর পুরো দল। দিনকয়েক পরেই ওই তরুণী ও সন্তানকে ছুটি দেওয়া হবে বলে হাসপাতাল সূত্রের খবর।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)