E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: মূল্যহীন জীবন?

কিন্তু দশ মিনিটের মধ্যে জিনিস পৌঁছে দেওয়ার এই ম্যাজিক দেখানোর প্রয়োজনটাই বা কী? এর ফলে যে মানুষগুলো পিঠে পর্বতপ্রমাণ বোঝা বেঁধে মোটরসাইকেলে পড়ি কি মরি করে ছুটছেন, তাঁদের জীবনের কি কোনও মূল্য নেই?

শেষ আপডেট: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৪:২২

গিগ কর্মীদের উপর ভয়াবহ শোষণের প্রতিবাদে সম্পাদকীয় ‘পাকাপাকি অস্থায়ী’ (১৩-১) প্রসঙ্গে এই পত্র। প্রবন্ধে গিগ কর্মীদের দুর্দশা অত্যন্ত যথাযথ ভাবেই তুলে ধরা হয়েছে। সত্যিই, বাড়িতে বসে মাত্র দশ মিনিটের মধ্যে দোকানবাজার সেরে ফেলার যে তথাকথিত অত্যাধুনিক জীবনযাত্রার ধারা শুরু হয়েছে, তার আদৌ কি এতটা প্রয়োজন ছিল? এ কথা ঠিক যে, বর্তমানে বহু বয়স্ক বা অসুস্থ মানুষ একা বসবাস করেন। আবার অনেকের চাকরি বা পেশাগত ব্যস্ততার কারণে নিয়মিত দোকানবাজারে যাওয়ার সময়ও হয়ে ওঠে না। তাঁদের ক্ষেত্রে এই পণ্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত উপযোগী।

কিন্তু দশ মিনিটের মধ্যে জিনিস পৌঁছে দেওয়ার এই ম্যাজিক দেখানোর প্রয়োজনটাই বা কী? এর ফলে যে মানুষগুলো পিঠে পর্বতপ্রমাণ বোঝা বেঁধে মোটরসাইকেলে পড়ি কি মরি করে ছুটছেন, তাঁদের জীবনের কি কোনও মূল্য নেই? বাড়ির পাশেই যদি পাড়ার মুদি দোকান থাকে, সেখান থেকেও দশ মিনিটের মধ্যে সওদা করে আসা সম্ভব নয়। সেই প্রত্যাশাও কেউই করেন না। কাজেই অসহায় গিগ কর্মীদের জীবন বিপন্ন করা ছাড়া এই অতিদ্রুত পণ্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থার আর কী-ই বা সার্থকতা থাকতে পারে?

এই ধরনের অনৈতিক পরিষেবা বর্জন করা ক্রেতাদের কর্তব্য। কিন্তু সামাজিক দায়িত্ববোধ ও নৈতিক কর্তব্যবোধের ধারণা বাজার অর্থনীতির দাপটে আজকের দুনিয়ায় এতটাই ক্ষীয়মাণ হয়ে পড়েছে যে, কেবল ক্রেতাসাধারণের কর্তব্যবোধ জাগ্রত হওয়ার অপেক্ষায় থাকা বাস্তবসম্মত হবে না। অতএব, বেড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার দায়িত্ব প্রশাসনকেই নিতে হবে। বাজার অর্থনীতির নামে অবাধ প্রতিযোগিতা যদি চলতেই দেওয়া হয়, তবে অনৈতিক ও বিপজ্জনক এই প্রতিযোগিতা চলতে দেওয়া নিশ্চয়ই প্রশাসনের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা বলে প্রতিভাত হবে। আইন করে এই অতিদ্রুত পণ্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা বন্ধ করা উচিত। পণ্য সরবরাহ কেন্দ্র (ডেলিভারি হাব) থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে পণ্য পৌঁছে দিতে ন্যূনতম এবং সর্বাধিক কত সময় লাগতে পারে, তা আইন করে নির্দিষ্ট করা জরুরি।

পিঠে ভারী বোঝা নিয়ে বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালাতে ডেলিভারি কর্মীরা বাধ্য না হলে পথ-দুর্ঘটনার আশঙ্কাও কমবে।

পার্থ ভট্টাচার্য, উত্তর ২৪ পরগনা

সমস্যা যেখানে

‘পাকাপাকি অস্থায়ী’ সম্পাদকীয়টি দেশে গিগ কর্মীদের দুরবস্থা এবং অসংবেদী ক্রেতাদের পণ্য হাতে পাওয়ার তড়িৎ তাড়নাকেই চিহ্নিত করে। তবে সমাধানের প্রশ্নে সম্পাদকীয় ধনতন্ত্রের কাছে কিছু নিবেদন রাখে, যা বাস্তবায়ন করা খুব মুশকিল।

কেন মুশকিল, তার ব্যাখ্যা আছে লেনিনের ইম্পিরিয়ালিজ়ম: দ্য হায়েস্ট স্টেজ অব ক্যাপিটালিজ়ম গ্রন্থে। তিনি উদাহরণ সহযোগে ধনতন্ত্রের কল্যাণবেশী রূপটিকে উন্মোচিত করে তার প্রকৃত স্বরূপ প্রকাশ করেছিলেন। ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় অর্থশাস্ত্রের তত্ত্ব নয়, শেষ কথা বলেন বণিকরাই। বাজার জবরদখল, অনৈতিক প্রতিযোগিতা, এলাকার ভাগবাঁটোয়ারা, উৎপাদন ব্যবস্থার ঘনীভবন এবং তার অনিবার্য পরিণতি হিসাবে শ্রমশক্তির ছাঁটাই ও সঙ্কোচন— এই সবই ধনতন্ত্রের একচেটিয়া আধিপত্যের শেষ কথা। ফলত, ধনতান্ত্রিক মুক্ত অর্থনীতিতে শ্রমিকদের কল্যাণ কোনও ভাবেই স্বতঃসিদ্ধ নয়; তা সর্বদাই শর্তসাপেক্ষ। ধনতন্ত্রের পক্ষে পরিস্থিতি প্রতিকূল হলে, কিংবা শ্রমিক আন্দোলন সঙ্ঘবদ্ধ ও তীব্র হলে তবেই ধনতন্ত্র সাময়িক ভাবে নমনীয় ও কল্যাণমুখী রূপ ধারণ করে। কিন্তু সেই কল্যাণও ক্ষণস্থায়ী।

প্রণব বর্ধন আ ওয়ার্ল্ড অব ইনসিকিয়োরিটি গ্রন্থে এই সমস্যাকে স্পষ্ট ভাবে চিহ্নিত করে আজকের কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, নিজেদের দাবিদাওয়া ছাপিয়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বৃহত্তর সমাজের সুখ-দুঃখের সঙ্গে যুক্ত হতে। কারণ বিচ্ছিন্নতাই শ্রমিকদের দুর্বল করে। ধর্মঘটে শামিল হলে শুধু কর্তৃপক্ষই নয়, ক্রেতাকুলও তাঁদের বিপক্ষে যাচ্ছে। গিগ কর্মীদের সাম্প্রতিক ধর্মঘটগুলির ব্যর্থতাই সেই বাস্তবতাকে নির্মম ভাবে প্রকট করে।

মানস দেব, কলকাতা-৩৬

প্রতিবাদ নয়...

রোহন ইসলামের ‘নিরাপদ থাকার নীরবতা’ (১-১) প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কিছু কথা। বর্তমান সমাজব্যবস্থায় সবার নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ যেন ক্রমশ নিজ নিজ হাতে তুলে নেওয়ার দায়িত্বে পরিণত হয়েছে, এমনটাই শাসনব্যবস্থার হাবভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।

মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হল, কোথাও কোনও অনৈতিকতা বা অন্যায় দেখলে তার প্রতিবাদ করা। কিন্তু আজ সেই প্রতিবাদের জায়গাটিকেই রাজনৈতিক থাবায় অস্বাভাবিকতার মার্গে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ফলে বৃদ্ধাশ্রমের সামনে, হাসপাতালের সামনে কিংবা কোনও অসুস্থ মানুষ বাড়িতে থাকা সত্ত্বেও প্রবল শব্দে ডিজে বাজানো বা শব্দবাজির উৎপাত অসহনীয় হয়ে উঠলেও মানুষকে চুপ করে থাকতে হয়। মুখ খুললেই সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক চাপ এসে পড়ে। তখন বলা হয়— এমন কী অসুবিধা হল যে থানায় জানাতে হবে? কী তাদের অপরাধ? এই প্রশ্নগুলো হুমকির সুরেই প্রতিবাদীর দিকে ছুড়ে দেওয়া হয়। এমনই এক ঘটনায় দেখা গিয়েছিল, প্রতিবাদী চিকিৎসককে সর্বসমক্ষে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়েছিল। রাজনৈতিক বা সামাজিক ভাবে কেউই সে দিন তাঁর পাশে দাঁড়াননি। সংবাদপত্রে পড়েছিলাম, প্রতিবাদের কারণে আবৃত্তিকার পার্থ ঘোষ ও গৌরী ঘোষকেও নিপীড়নের শিকার হতে হয়েছিল।

নিশ্চয়ই কিছু মানুষ প্রতিবাদীর সমর্থনে থাকেন, কিন্তু ভয়, ভীতি বা অকারণ ঝামেলার আশঙ্কায় তা প্রকাশ্যে বলতে পারেন না। এই প্রবণতা কেবল সমাজে নয়, রাষ্ট্রব্যবস্থাতেও সমান ভাবে লক্ষণীয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক ক্ষমতা ও অর্থের প্রভাব খাটিয়ে নৈতিকতা ও সত্যকে আড়ালে রেখে কাজ করার প্রবণতা বেড়েই চলেছে।

মানুষ শান্তি চায়, সুরক্ষা চায়। সুরক্ষা যদি ঠিকমতো না-ও মেলে, তবু শান্তির আশা করাটা স্বাভাবিক। সেই কারণেই আজ প্রতিবাদী মানুষজন নিজেদের এবং পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে অন্যায়, অবিচার বা অনৈতিকতা দেখেও চুপ করে থাকা, কিংবা না-দেখার ভান করা শিখে ফেলেছেন। এর ফলেই অনৈতিক ক্রিয়াকর্মের পথে কার্যকর বাধা দেওয়ার মতো মানুষ ক্রমশ বিরল হয়ে উঠছে।

স্বরাজ সাহা, কলকাতা-১৫০

ঘুম ভাঙবে?

দেবাশিস দাশের লেখা ‘অবাধে জলাজমি ভরাট হাওড়ায়, ভয়ে মুখে কুলুপ পঞ্চায়েত-প্রধানের’ (৭-১) প্রতিবেদনটি পড়ে গত অক্টোবরে কয়েক দিনের জলমগ্ন কলকাতা ও তার আশপাশের এলাকার ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। নাগরিক জীবনের এই চরম অসহায়তা ও নাকাল অবস্থার সাক্ষী হয়েও মানুষের ঘুম যেন এখনও ভাঙছে না।

হাওড়ায় বাঁকড়ায় কী ভাবে জলাজমি ভরাট হয়ে চলেছে, ছবি দেখেই তার আন্দাজ পাওয়া যায়। মাসখানেক ধরে সেখানে ভরাটের মাটি ফেলা হচ্ছে। এর পরিণতি কী হতে পারে, তা অনুমান করতে বিশেষ কষ্ট হয় না। বর্ষা নামলেই রাস্তা জুড়ে জল দাঁড়াবে, নিচু ঘরবাড়ির অন্দরে মাছ, সাপ, পোকামাকড়ের অস্থায়ী বাসস্থান গড়ে উঠবে। অথচ অতিবৃষ্টি হলে জলাভূমিগুলিই জল ধারণ করে এলাকা জলমগ্ন হওয়া থেকে বাঁচাত। জমিমাফিয়াদের দৌরাত্ম্যে সেই প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে। পঞ্চায়েত প্রধানরাই নাকি তটস্থ। প্রশ্ন হল, ব্যবসাদাররা কোন গ্রহের বাসিন্দা যে শাসনের কোনও আঁচই তাঁদের গায়ে লাগে না?

সৌম্যেন্দ্র নাথ জানা, কলকাতা-১৫৪

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Gig Workers Food Delivery Apps Online Delivery

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy