E-Paper

ভিডিয়ো কলে ভুয়ো আদালতে সাজানো ‘বিচার’, গায়েব ৫৩ লক্ষ

জানা গিয়েছে, বছর তেষট্টির এই প্রৌঢ়ের আদি বাড়ি ত্রিপুরায়। সেখানেই স্কুলে শিক্ষকতা করতেন তিনি। মেয়ে চাকরি সূত্রে কলকাতায় থাকেন। অবসরের পরে তাই সস্ত্রীক মেয়ের কাছে চলে আসেন।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৫:৩০

— প্রতীকী চিত্র।

অনলাইনে বিচার চলছে! রয়েছেন সিবিআই, ইডি-র অফিসারেরা। রয়েছেন বিচারকও। বিচারকের পিছনে আবার মহাত্মা গান্ধীর ছবি। অনলাইনেই গীতা দেখিয়ে শপথবাক্য পাঠের নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। নরমে-গরমে দেখানো হচ্ছে শাস্তির খাঁড়া, একই সঙ্গে বাঁচার উপায়ও।

এই সবটাই যে সাজানো, তা বুঝতেই প্রাক্তন শিক্ষক, পিকনিক গার্ডেনের বাসিন্দা বিপুল সাহার লেগে গেল ২৫ দিন! ভুয়ো আদালতের নির্দেশ মেনে তাঁকে পুরো সময়টাই থাকতে হয়েছিল গৃহবন্দি। বলা হয়েছিল, ‘‘আপনাকে ডিজিটাল অ্যারেস্ট করা হল!’’ এক সময়ে বলা হয়, নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে মুক্তি পেতে দিতে হবে ৫৩ লক্ষ টাকা। জীবনভর সঞ্চয়ের সর্বস্ব, ৫৩ লক্ষ টাকাও দিয়ে দেন তিনি। অবশেষে প্রতারিত হয়েছেন বুঝে পুলিশের দ্বারস্থ হন বিপুল। লালবাজারের সাইবার ক্রাইম বিভাগে অভিযোগ দায়ের করেন তিনি। কিন্তু অভিযোগ, দেড় মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও টাকা উদ্ধার হয়নি। লালবাজারের দাবি, সব দিক দেখে তদন্ত এগোচ্ছে।

জানা গিয়েছে, বছর তেষট্টির এই প্রৌঢ়ের আদি বাড়ি ত্রিপুরায়। সেখানেই স্কুলে শিক্ষকতা করতেন তিনি। মেয়ে চাকরি সূত্রে কলকাতায় থাকেন। অবসরের পরে তাই সস্ত্রীক মেয়ের কাছে চলে আসেন। প্রৌঢ় জানান, তাঁর কাছে প্রথম ফোনটি সাধারণ কল হিসেবে এসেছিল ২ ডিসেম্বর। কেন্দ্রীয় টেলিফোন সংস্থার এক কর্তার পরিচয়ে এক জন ফোন করে। বলা হয় যে, তাঁর নামে ফোনের সিম কার্ড, প্যান কার্ড এবং আধার কার্ড দিয়ে কোনও এক ব্যক্তি দিল্লির একটি ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খুলে ৫ কোটি ৮০ লক্ষ কালো টাকা সাদা করেছে। এর পরেই ফোনটি কেটে যায়।

তার পরেই ভিডিয়ো কলে এক ব্যক্তি সিবিআইয়ের পোশাকে হাজির হয়। নিজেকে বিজয় খন্না পরিচয় দিয়ে সে বলে, প্রৌঢ়কে দিল্লির ইডি-র আদালতে পরদিন তোলা হবে। বিপুলের কথায়, ‘‘সিবিআই-কর্তার পরিচয় দেওয়া ওই ব্যক্তি ভিডিয়ো কল কাটতে নিষেধ করে। আরও বলা হয়, আমার এবং আমার মেয়ের উপরেও নজরদারি চলছে। সহযোগিতা না করলে মেয়েকেও গ্রেফতার করার হুমকি দেওয়া হয়।’’ বিপুল জানান, তাঁর মনে হয়েছিল, মেয়েকে গ্রেফতার করলে চাকরি চলে যাবে! তাই তিনি কাউকে কিছু বলেননি।

বিপুলের দাবি, পরদিন ভিডিয়ো কলের মাধ্যমে তাঁকে ইডি-র ভুয়ো আদালতে তোলা হয়। সেখানে ইডি অফিসার সেজে হাজির হয় নিশা পটেল নামে এক মহিলা। নিশা তাঁকে জানায়, তাঁর আর্থিক দুর্নীতির তদন্ত করছে সে। কিছু ক্ষণের মধ্যেই আদালতে ভুয়ো বিচারক এসে দাবি করে, তার নাম রাহুল গুপ্ত। কোর্টের এজলাস যেমন হয়, ঠিক সে রকমই এজলাস ছিল বলে দাবি প্রৌঢ়ের। ভিডিয়ো কলের মাধ্যমেই গীতায় হাত রেখে বিপুলকে শপথ করতে হয়। প্রৌঢ়ের কথায়, ‘‘নিজের সম্পর্কে সেখানে সব বলতে হয়। বিচারক সব শুনে জানায়, আমাকে জামিন দেওয়া যাবে না।’’ পরের দিন আবার ওই ইডি অফিসার নিশা ভিডিয়ো কলে তাঁকে জানায়, জামিন পাইয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সাত দিনের মধ্যে প্রমাণ করে দেওয়া হবে যে, তিনি নির্দোষ। সে জন্য তাঁকে রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের একটি অ্যাকাউন্টে ৫৩ লক্ষ টাকা রাখতে হবে। মামলা শেষ হলেই সেই টাকা ফেরত দিয়ে দেওয়া হবে।

বিপুল বলেন, ‘‘তখনও বুঝিনি যে, পুরো সাজানো চিত্রনাট্য। মাঝেমধ্যে আমাকে ভয় পাইয়ে দেওয়া হচ্ছিল। তার পরেই সান্ত্বনা দেওয়া হচ্ছিল। ফলে, সবই সত্যি বলে মনে হয়। সব সময়ে মনে হত, মেয়ের যেন ক্ষতি না হয়। বিষয়টি স্ত্রী জানতেন। মেয়েকে কিছু বলতে নিষেধ করেছিল।’’

বিপুল বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে প্রথমে ২০ লক্ষ টাকা, পরে ১৮ লক্ষ টাকা প্রতারকদের বলে দেওয়া অ্যাকাউন্টে জমা দেন। স্ত্রীর একটি শেয়ারের ডি-ম্যাট অ্যাকাউন্ট থেকেও ১৫ লক্ষ টাকা দেন। বিপুলের দাবি, ‘‘পরে মামলার কী হল, জিজ্ঞাসা করায় ভিডিয়ো কলের এক ব্যক্তি বলে, ইডি ও সিবিআই অফিসার ছুটিতে গিয়েছে। ছুটি থেকে ফিরলেই টাকা ফেরত পাব। এর পরেই ভিডিয়ো কল কেটে দেওয়া হয়। আর ফোন আসেনি, ভিডিয়ো কলের সূত্র ধরে যোগাযোগও করা যায়নি।’’

প্রতারিত হয়েছেন বুঝে বিপুল কসবা থানায় লিখিত ডায়েরি করেন। পরে কসবা থানা তাঁকে লালবাজারের সাইবার সেলে অভিযোগ জানাতে বলে। সেখানে অভিযোগ দায়ের করেছেন। বিপুলের কথায়, ‘‘মেয়ের বিয়ের জন্য এবং নিজের চিকিৎসার জন্য রাখা টাকাও চলে গিয়েছে। কী করলে সুরাহা পাব, জানি না।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Financial Fraud Digital Arrest Cyber Crime

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy