অশোক কুমার লাহিড়ী তাঁর ‘আরও একটি সন্ধিক্ষণ’ (২১-১) শীর্ষক প্রবন্ধে রাজ্যে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বিরোধী দলের পক্ষে বিপুল ভাবে আসন বাড়ানো সম্ভব বলে যে মন্তব্য করেছেন, সেই প্রসঙ্গে কিছু কথা। তাঁর প্রবন্ধে বক্তব্য যে ভাবে এগিয়েছে, তাতে অনায়াসেই ‘বিরোধী’ কথাটির পরিবর্তে ‘বিজেপি’ উল্লেখ করলেও কোনও ভুল হত বলে মনে হয় না। আসনসংখ্যা প্রাপ্তির নিরিখে পাটিগণিতের যে হিসাব তিনি দেখিয়েছেন, তাতে বিজেপির পক্ষে ১৫৫টির মতো আসনে জয়লাভ করা সম্ভব। বাংলার মানুষ রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলের পক্ষেই ভোট দেবেন, তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এই আশা তিনি করতেই পারেন। যদিও এই বিষয়ে তিনি যে নিঃসংশয়ী নন, তাঁর বক্তব্যে সেটা উঠে এসেছে বিজেপি সম্বন্ধে বাংলার মানুষের ‘অজানা’ ভয় এবং তাতে তৃণমূলের উস্কানি দেওয়ার প্রসঙ্গে। উপরন্তু বিজেপির সাম্প্রদায়িকতা বা খাদ্যাভ্যাসে নানাবিধ বিধিনিষেধ আলোকপ্রাপ্ত বাঙালি অস্মিতা-সম্পন্ন মানুষের কাছে যে আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়, তার ইঙ্গিতও প্রবন্ধকার নিজের প্রবন্ধে দিয়েছেন। এই সমস্ত বিষয় বিজেপি দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে বোঝানো সর্বাগ্রে প্রয়োজন। তাঁদের বোঝা দরকার, সরাসরি প্রতিবাদ করার মতো জোর, বর্তমানে দলের কোনও রাজ্য নেতৃত্বেরই নেই।
এর সঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে, সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশি তকমা দিয়ে বিভিন্ন রাজ্যে যে ভাবে বাঙালিদের উপর নির্যাতন শুরু হয়েছে, যে ভাবে এসআইআর-এর কারণে সাধারণ মানুষের হয়রানি হলেও নির্বাচন কমিশনের সে বিষয়ে কোনও হেলদোল নেই, তাতে পালের হাওয়া যে কোনও ভাবেই বিজেপির দিকে বইবে না, এটা জানতে ভোট-বিশারদ হওয়ার প্রয়োজন নেই। তাই আগামী বিধানসভা নির্বাচনে কোনও পাটিগণিতের হিসাব নয়, বাংলার মানুষের ভোটদানের ক্ষেত্রে এই সাম্প্রতিক ইতিহাসই অগ্রাধিকারের তালিকায় থাকবে, সেটা প্রবন্ধকারের পক্ষেও অস্বীকার করা সম্ভব নয়। বিশদ ব্যাখ্যার মধ্যে না গিয়েও বলা যেতে পারে, বর্তমান রাজ্য শাসক দলের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ থাকলেও, বাংলার সংস্কৃতি ও ধর্মীয় আচরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত মানুষ বিজেপির পক্ষে ভোট দেওয়ার আগে দু’বার ভাববেন। মানুষের রুটি-রুজির দাবিকে চাপা দিয়ে যে ভাবে রাজ্যের শাসক দল ও প্রধান বিরোধী দলের মধ্যে ভোট ভাগাভাগির মেরুকরণ চলছে, তাতে সাধারণ মানুষের মনে বিকল্প ভাবনা না আসা পর্যন্ত রাজ্যে স্থিতাবস্থা বজায় থাকার সম্ভাবনাই প্রবল। বর্তমান সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে এটাই পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ।
অশোক দাশ, রিষড়া, হুগলি
ভোটের রায়
অশোক কুমার লাহিড়ীর ‘আরও একটি সন্ধিক্ষণ’ শীর্ষক প্রবন্ধ প্রসঙ্গে কিছু কথা। নির্বাচনে ৫ শতাংশ ভোট-সুইং ঘটলে তার সম্ভাব্য রাজনৈতিক অভিঘাত একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সূচনা করে, তবে এই বিশ্লেষণকে সম্পূর্ণ করতে হলে বাম ও কংগ্রেসের বর্তমান ভূমিকা, ২০১১ সালের পরিস্থিতির সঙ্গে আজকের বাস্তবতার তুলনা এবং বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর স্বতন্ত্র অবস্থান আলাদা করে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ২০১১ সালে পরিবর্তনের কেন্দ্রে ছিল দীর্ঘ ৩৪ বছরের শাসনের বিরুদ্ধে জমে ওঠা ব্যাপক ক্ষোভ; তখন বামফ্রন্ট প্রশাসনিক বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছিল এবং কংগ্রেস ছিল সেই পরিবর্তনের শরিক। আজ পরিস্থিতি ভিন্ন— বাম ও কংগ্রেস দু’পক্ষই সংগঠনগত ভাবে দুর্বল। ফলে শাসক দলের বিরুদ্ধে অসন্তোষ থাকলেও তার বড় অংশ কার্যকর বিরোধী ভোটে রূপান্তরিত হচ্ছে না, যার ফলে বিজেপি একটি রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগ পাচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে মুসলিম ভোটারদের ভূমিকা আলাদা করে দেখা জরুরি। দীর্ঘ দিন ধরে তাঁরা মূলত প্রতিরোধমূলক ভোট দিয়ে এসেছেন— যে রাজনৈতিক শক্তিকে বিজেপির বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর মনে হয়েছে, তাকেই সমর্থন করেছেন। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে মুসলিম সমাজের মধ্যে যে অসন্তোষ রয়েছে, তা মূলত নাগরিক অধিকার ও উন্নয়নের প্রশ্নকেই ঘিরে, কোনও একক প্রশাসনিক উদ্যোগ বা সাম্প্রতিক এসআইআর সংক্রান্ত আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়। অন্য দিকে, এসআইআর নিয়ে যে বিক্ষোভ ও প্রশ্ন উঠছে, তা একটি বৃহত্তর নাগরিক উদ্বেগের প্রতিফলন— যেখানে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও অংশগ্রহণের দাবি জানাচ্ছেন। ভোটের রায়ই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে কে নাগরিকের দৈনন্দিন সমস্যাগুলিকে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য ভাবে চিহ্নিত করে তার বাস্তবসম্মত সমাধানের দিশা দেখাল।
অলোক কুমার মুখোপাধ্যায়, সোদপুর, উত্তর ২৪ পরগনা
ভাতের লড়াই
অশোক কুমার লাহিড়ীর প্রবন্ধের পরিপ্রেক্ষিতে কিছু কথা। প্রবন্ধ জুড়ে একরাশ হিসাবনিকাশ, কোন ভোট কত শতাংশ কোন দিকে গেলে ফলাফলের ক্ষেত্রে কী প্রভাব পড়বে, তার বিস্তারিত জটিল পাটিগণিত অঙ্ক রয়েছে। এই সব অঙ্কে না গিয়ে বরং আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে এই রাজ্যের পালাবদল সংক্রান্ত বিষয়ে প্রবন্ধকারের পর্যবেক্ষণ নিয়ে খানিক আলোকপাত করা যেতে পারে। প্রবন্ধকার নিজে বিজেপি বিধায়ক, সেই সূত্রে তিনি স্বাভাবিক ভাবেই চাইবেন ২০২৬-এর নির্বাচনে বিজেপি জিতুক। কিন্তু তাঁর চাওয়া আর বাস্তব পরিস্থিতি একদম ভিন্ন।
সাধারণ ভাবে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঠিক রূপায়ণ, নাগরিক সুবিধা প্রান্তিক জনের কাছে পৌঁছে দেওয়া ইত্যাদি শর্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে পালনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকে। কিন্তু হামেশাই ঘটে ঠিক উল্টো। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি আবার অন্যান্য রাজ্যের রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। প্রধান বিরোধী দল বিজেপির এই রাজ্যের কোথাও বলিষ্ঠ সংগঠন নেই। বুথ স্তরের রাজনীতিতেও শাসক দল বিজেপিকে অনায়াসে হারাতে পারে। কারণ যে ভোটব্যাঙ্কের কথা প্রবন্ধকার উল্লেখ করেছেন, সেই ভোটব্যাঙ্ক বিজেপির নয়। ঠিক যে, ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির ঝুলিতে ১৮টি আসন এবং ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে ৭৭টি আসন গিয়েছিল। কিন্তু, সিপিএমের যত শতাংশ ভোট কমেছে সেই ২০১১ সাল থেকে, ঠিক তত শতাংশ ভোট বেড়েছে বিজেপির। অর্থাৎ, ভোটব্যাঙ্ক কথাটা জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না। এই ভোটদাতাদের ‘ফ্লোটিং ভোটার’ বলা যেতে পারে, কারণ পঞ্চায়েত ভোটে এই ভোটের বেশির ভাগ সিপিএমের ঝুলিতেই ফিরে আসে।
তা ছাড়া অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকে প্রবন্ধকার কোনও আলোকপাত করেননি। আমরা যারা গত বিধানসভা নির্বাচনের প্রত্যক্ষদর্শী, তারা জানি যে, নির্বাচন ঘোষণা হওয়ার পরের দিন থেকে জার্সি বদলের যে হিড়িক পড়েছিল, তা ফল প্রকাশের আগে পর্যন্ত চলেছিল। শুধু নেতানেত্রীরা নন, বিধায়কেরা পর্যন্ত পদ্ম শিবিরে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে গিয়েছিলেন। এই রাজ্যের সিপিএমের বহু সাংসদ, বিধায়ক এখন বিজেপির সাংসদ অথবা বিধায়ক। তাই সংগঠন বা নীতি আদর্শ নিয়ে কথা উঠলে খানিক খটকা লাগে। হিন্দুত্ববাদী ধারার যে রাজনীতিতে বিজেপি অভ্যস্ত, সেই রাজনীতি বঙ্গে কিন্তু বার বার হোঁচট খায়। এখানে প্রান্তিক খেটে-খাওয়া মানুষটিও জানেন, লড়াইটা ভাতের, জাতের নয়।
রাজা বাগচী, গুপ্তিপাড়া, হুগলি
দুরবস্থা
বাজারে দশ টাকার নোটগুলি ক্রমশ মলিন এবং ছেঁড়াফাটা হয়ে যাচ্ছে। এই নিয়ে নিত্য ঝামেলা হচ্ছে বাসে-ট্রামে-বাজারে। এ দিকে কুড়ি টাকার নোটগুলির অবস্থাও খারাপ। ব্যাঙ্কে এই ধরনের নোট পাল্টাতে গেলে হাজারও প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। সরকার কি সত্যিই খুচরো নোটের কোনও বিকল্প আনবে না?
সনাতন মাইতি, কলকাতা-৩২
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)