E-Paper

এআই আর কল্পনার ভবিষ্যৎ

কম্পিউটার-সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্রে পথিকৃৎ সম্প্রতি প্রয়াত ব্রিটিশ দার্শনিক, মার্গারেট বোডেন। তিনি তিনটি শর্তের কথা বলেছেন: মূল্য, অভিনবত্ব ও বিস্ময়।

বিশ্বদীপ সেনশর্মা

শেষ আপডেট: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:১৪

এক পত্রিকা-সম্পাদকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি রীতিমতো উদ্বিগ্ন, বললেন, কী শুনছি বলুন তো, এআই-এর দৌলতে কি আসল-নকল এক হয়ে যাবে? শিল্পী-সাহিত্যিক মহলে এ সংশয় অনেকেরই। সৃজনশীল বিভিন্ন বৃত্তিতে এআই ইতিমধ্যেই ব্যবহৃত হচ্ছে। শিল্পী ও ডিজ়াইনাররা চ্যাটজিপিটি-র মতো এআইগুলিকে বিভিন্ন নির্দেশ বা ‘প্রম্পট’ দিয়ে অতি দ্রুত ছবি, ভিডিয়ো, নতুন ডিজ়াইন তৈরি করছেন। শিল্পীর সৃষ্টিশীলতা ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে এআই-এর শক্তি ও গতির মেলবন্ধন। এর প্রভাবও ব্যাপক। একটি সমীক্ষা অনুযায়ী ‘ক্রিয়েটিভ ইন্ডাস্ট্রি’তে কর্মহানি ইতিমধ্যেই ২৬ শতাংশ। নৈতিকতা, কপিরাইট ও অন্য অনেক কিছু নিয়ে প্রশ্নও উঠছে। তবে এগুলির স্রষ্টা মানুষই, এআই সহায়ক মাত্র।

কম্পিউটার-সৃষ্টিশীলতার ক্ষেত্রে পথিকৃৎ সম্প্রতি প্রয়াত ব্রিটিশ দার্শনিক, মার্গারেট বোডেন। তিনি তিনটি শর্তের কথা বলেছেন: মূল্য, অভিনবত্ব ও বিস্ময়। অর্থাৎ কম্পিউটারের সৃষ্টির মধ্যে অভিনবত্ব থাকবে, তা বিস্ময় জাগাবে এবং তাকে সুসমঞ্জস ও অর্থপূর্ণ হতে হবে। কী ভাবে তা করা যায় তার ভিত্তিতেও তিনি তিনটি শ্রেণিবিভাগ করেছেন। প্রথমত, সমন্বিত সৃষ্টিশীলতা (কম্বিনেশনাল ক্রিয়েটিভিটি): দু’টি পরিচিত আইডিয়াকে নতুন ভাবে মিলিয়ে কিছু সৃষ্টি করা, যেমন কবিতায় রূপক ও উপমার ব্যবহার। দ্বিতীয়টি, অনুসন্ধানমূলক বা ‘এক্সপ্লোরেটরি’— নির্দিষ্ট শর্ত বা সীমার মধ্যে যা একটি ‘আইডিয়া’কে ভেঙেচুরে নতুন সৃষ্টির প্রয়াস করে। যেমন, মোৎজ়ার্টের স্টাইল অনুসরণ করে নতুন সিম্ফনি সৃষ্টি করা। তৃতীয় বা সর্বোচ্চ স্তরে আছে রূপান্তরমূলক বা ‘ট্রান্সফর্মেশনাল’ সৃষ্টিশীলতা, যা এই সীমা ভেঙে দেয়। মহান স্রষ্টারা এটা পারেন। উদাহরণ, পিকাসোর ছবি, জয়েসের উপন্যাস বা রবীন্দ্রনাথের সামগ্রিক সাহিত্যকীর্তি।

এআই-এর মূল চালিকাশক্তি ‘ডিপ লার্নিং’। এই পদ্ধতিতে এআই-কে বিপুল তথ্যভান্ডার, লেখা, ছবি, বৈজ্ঞানিক তথ্যরাশি ব্যবহার করে শেখানো হয়। এগুলি ঘেঁটেই সে নিয়ম ও ‘প্যাটার্ন’ শেখে, সেই অনুযায়ী প্রশ্নের উত্তর দেয়; নতুন ডিজ়াইন, ছবি, লেখা তৈরি করে। বোডেন-কথিত প্রথম দুই শ্রেণির সৃষ্টি তার সাধ্যের মধ্যে। বিভিন্ন প্যাটার্ন যোগ করে ও নতুন করে সাজিয়ে সে পিকাসোর স্টাইলে তাজমহল আঁকতে পারে বা ছন্দ মিলিয়ে কয়েক লাইন পদ্য সাত রকম ভাবে লিখতে পারে। এ ব্যাপারে এখনও যে সীমাবদ্ধতা আছে তা নিছক প্রযুক্তিগত, এক দিন সে মধ্যমানের চিত্তাকর্ষক সাহিত্য সৃষ্টি করবে, ধরেই নেওয়া যায়। কিন্তু মৌলিক সৃষ্টি তার সাধ্যের বাইরেই থাকবে। ট্রেনিংয়ে শেখা নিয়ম ও প্যাটার্নের বাইরে সে যেতে পারে না।

অন্য দিকে, বিজ্ঞানী ও ভবিষ্যদ্বক্তা রেমন্ড কার্জ়ওয়াইল বা নিক বোস্ট্রমের মতো কারও কারও মতে, আমাদের চেতনা ও বিমূর্ত চিন্তাগুলি মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলির মধ্যে নিয়ত সঙ্কেত বিনিময়ের মাধ্যমে নিছক যান্ত্রিক প্রক্রিয়াতেই তৈরি হয়। রেমন্ডের মতে, ডিপ লার্নিং পদ্ধতিতে এআই যে ভাবে শেখে, তা মূলত মানবশিশুর শেখার মতো। তাকে ট্রেনিংয়ের সময়ে যা শেখানো হয় তা সে নিছক যান্ত্রিক ভাবে কাজে লাগায় না, তা থেকে নিজস্ব যুক্তি ও চিন্তা গড়ে তোলে, যা তাকে শেখানো হয়নি এমন বিষয়ও ‘বুঝতে পারে’। মস্তিষ্কের বহুস্তরীয় নেটওয়ার্কের তুলনায় এআই এখনও সরল— তার ক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের অনেক রহস্যের সমাধান মিলবে। এটি এখনও অনুমানমাত্র, তবে প্রযুক্তি এগিয়েই চলেছে। এআই চ্যাটবটগুলি যে ভাবে মানুষের মতোই স্বচ্ছন্দে কথাবার্তা চালায়, কয়েক বছর আগেও তা অকল্পনীয় ছিল।

ডিপ লার্নিং ছাড়া অন্য মডেল নিয়েও পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে। একটি হল ‘নভেলটি বেসড রিওয়ার্ড’, এআই-কে প্রচলিত ধ্যানধারণার বাইরে গিয়ে সৃষ্টি করতে উৎসাহ দেওয়া। ২০১৭-য় ‘আইক্যান’ নামে একটি মডেল প্রচলিত স্টাইলগুলি সচেতন ভাবে এড়িয়ে ছবি এঁকে সমালোচকদের প্রশংসা পায়। আর একটি উল্লেখযোগ্য মডেল, বিবর্তনমূলক (ইভলিউশনারি) অ্যালগরিদম বা ইএ। প্রকৃতি যে ভাবে দীর্ঘদিন ধরে বিবর্তনের মাধ্যমে মানুষ ও অন্য প্রজাতি তৈরি করেছে, সে ভাবেই একটি ছবি বা লেখার বিভিন্ন পরিবর্তন (মিউটেশন) ঘটিয়ে তাদের মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়া (সিলেকশন)। এই পদ্ধতি বিভিন্ন এঞ্জিনিয়ারিং ডিজ়াইনে সাফল্য পেয়েছে, শিল্পকর্মের ক্ষেত্রেও মৌলিক সৃষ্টি সম্ভব। সমস্যা হল, ডিপ লার্নিং-এর মতো আমাদের লেখা, ছবি ইত্যাদির সঙ্গে সে পরিচিত নয়, নতুন হলেও সার্থক সৃষ্টির সম্ভাবনা কম। ইদানীং এই পদ্ধতি ডিপ লার্নিং-এর সঙ্গে একে অন্যের পরিপূরক হিসাবে ব্যবহারের চেষ্টা হচ্ছে।

দার্শনিকরা যাকে ‘হার্ড প্রবলেম’ বলেন, গতানুগতিক চিন্তার বাইরে গিয়ে মৌলিক সৃষ্টির জন্য সেখানেই ফিরে আসতে হবে, অর্থাৎ যন্ত্রের চেতনা, অনুভূতি ও ইচ্ছা থাকতে হবে। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এ সমালোচক স্যাম ক্রিস যেমন লিখেছিলেন, “আমি যা ভাবি তা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভাবতে পারে না, কারণ আমি যা অনুভব করি তা সে অনুভব করতে পারে না।”

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

AI

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy