E-Paper

ভাঙতে নয়, গড়তে আসা

প্রিয় শিষ্য নরেন্দ্রনাথ নির্বিকল্প সমাধিতে মগ্ন হতে চান, আর পাঁচ জন গুরু হলে খুশি হতেন।

অসিতবরণ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫২

Sourced by the ABP

একুশ শতকের সমাজ, দেশ ও বিশ্বে এক অসংহতির বাতাবরণ। ধর্মান্ধতা নিয়ে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, যা অতিমারির চেয়েও ভয়ঙ্কর। এমন বিপর্যস্ত অবস্থায় শ্রীরামকৃষ্ণের সমন্বয়ী ভাবনা আরও বেশি শিক্ষণীয় ও গ্রহণীয়; তাঁর মত ও পথ যাবতীয় জটিলতা প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে আলো দেখাতে পারে। কারণ তিনি শুধু সব ধর্মেরই নয়, সমস্ত রকম ভাবেরও সমন্বয়ের পক্ষে। বিভেদ নয়, ঐক্যই যে বেঁচে থাকার মূল সোপান— বুঝিয়েছেন।

জীবন ও সাধনার প্রতি স্তরে তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল মানুষ। ভক্ত দর্শনার্থীদের তাঁর সহজ-সরল ভাষায় বলতেন, “মানুষ কি কম গা? সে যে ঈশ্বরচিন্তা করতে পারে।” মানুষই পারে অসীম অনন্ত সত্তাকে অনুভব করতে; ঈশ্বর মানে সেই অশেষ সম্ভাবনা, যা সর্বার্থে মানুষের শুভ মঙ্গলানুভূতিকেই মনে করায়। প্রতিটি মানুষের মধ্যেই সেই অনন্ত সত্তা ও সম্ভাবনা রয়েছে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই মানবতার উত্তরণই আধ্যাত্মিকতা, আসল ধর্ম।

প্রিয় শিষ্য নরেন্দ্রনাথ নির্বিকল্প সমাধিতে মগ্ন হতে চান, আর পাঁচ জন গুরু হলে খুশি হতেন। শ্রীরামকৃষ্ণ কিন্তু দুঃখিত: ভেবেছিলাম তুই একটা বটবৃক্ষ হবি! আত্মকেন্দ্রিক মনোভাব ছাড়িয়ে ভবিষ্যতের বিবেকানন্দকে এগিয়ে দিলেন কর্মের পথে। আমরাও পেলাম লোকহিতার্থে আত্মনিবেদনের শিক্ষা, ‘বহুজনহিতায়, বহুজনসুখায়’। অনেকের মতো সন্ন্যাসের বাসনায় যখন গিরিশ ঘোষও শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে আবেদন করছেন, তিনি তাঁকেও বলেছেন নিজের পথে থাকতে— নাটকে যে লোকশিক্ষা হয়! এখানেও দেখি তাঁর মানবপ্রেম, বৃহৎ কল্যাণের জন্য ক্ষুদ্র স্বার্থ পরিহার করে কর্ম-পরিকল্পনা— শুভের উদ্বোধনে প্রকৃত যা-যা করা দরকার, করতে হবে।

তাঁর মনুষ্যত্ব-ধর্মের মূল কথাই হচ্ছে লোকহিতার্থে কর্মের সাধনা। এতে হৃদয় প্রসারিত হয়, সেবার বোধ জাগ্রত হয় সর্বোচ্চ ও গভীরতম স্তর পর্যন্ত। অদ্বৈত দর্শনের এক আধুনিক ব্যাখ্যা পাই তাঁর জীবন ও বাণীতে; মানুষের মধ্যে পদে পদে যে অনৈক্য ও বিভাজন, তার নিরসনে এই ভাবনা আমাদের দিশারি হতে পারে। ‘অদ্বৈতজ্ঞান আঁচলে বেঁধে যা ইচ্ছা তা-ই করো’, শ্রীরামকৃষ্ণের এই কথাটি একুশ শতকে সমাজকল্যাণের বিকাশেও আমাদের অবলম্বন। কেউই পর নয়, অপরও নয়, সবাই আপন, সবাই আমি— এই বোধের জাগরণ হলে আর কোনও বিভেদ থাকে না। কর্ম তখন সেবায়, পূজায় রূপান্তরিত হয়। শ্রীরামকৃষ্ণ মানুষের মধ্যে এই চৈতন্যের জাগরণ ঘটাতে চেয়েছিলেন।

আশ্চর্য লাগে যখন দেখি, এই সবই তিনি বলে গেছেন আজ থেকে প্রায় দেড়শো বছরেরও বেশি আগে। উনিশ শতকের মধ্যভাগে তাঁর অনতিদীর্ঘ জীবন (১৮৩৬-১৮৮৬), বাঙালি তথা ভারতীয় সমাজ তখন ভিতরে-বাইরে নানা সমস্যায় জর্জরিত। এক দিকে জাতি-বর্ণ নিয়ে ভেদাভেদে সামাজিক জীবন বিষময়, অন্য দিকে বিদেশি শাসনে পর্যুদস্ত। পশ্চিমি শিক্ষার আলো এসেছে, তবে অন্ধকারও রয়ে গেছে অনেকটাই। রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রমুখ মনীষী আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন অশিক্ষা, কুসংস্কার, জাতিদম্ভ দূর করে মানুষকে ক্ষুদ্র থেকে বৃহতের পথে এগিয়ে দিতে। এই রকম সময়েই শ্রীরামকৃষ্ণও এসে বললেন, সব ধর্মের সারকথাটি এক; সেই এক-ই বহু হয়েছেন। এই ভাবটি সমন্বয়ের: ভাঙার নয়, গড়ার। তাঁর আহ্বান সব অবস্থানের মানুষকে কাছে টানল— কেশবচন্দ্র সেনও তাঁর কাছে আসেন, বিনোদিনী দাসীও তাঁর আশীর্বাদধন্য।

মানুষকে আপন করার এই শক্তি, অপাঙ্‌ক্তেয়কেও সমান মান দেওয়া— শ্রীরামকৃষ্ণের এই ‘সমাজসংস্কার’-এর ভূমিকাটি নিয়ে আমরা বড় একটা কথা বলি না। উনিশ শতকের সমাজ-ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে তাঁর এই জনহিতের দর্শনকে বিশ্লেষণ করা দরকার। রাজনীতি, সমাজ ও দর্শনের নানান তত্ত্বে ‘মানুষ’ আর ‘ধর্ম’কে শুধু পৃথক করেই নয়, দুই বিপরীত মেরুতে রেখে বিবেচনা করা হয়। শ্রীরামকৃষ্ণের দর্শন বলে, এই দুই পরস্পরের সম্পূরক, আর দুইয়ে মিলে আবার নতুন এক পথের সন্ধান মেলে: অনন্ত পথ, অনন্ত মত।

শ্রীরামকৃষ্ণের এই শাশ্বত প্রেমের আদর্শ রবীন্দ্রনাথকেও আকর্ষণ করেছিল। তিনি বলেছিলেন, ‘পরমহংসদেব’কে তিনি ভক্তি করেন, কারণ ধর্মনৈতিক ধ্বংসবাদের যুগে তিনি আমাদের আধ্যাত্মিক সম্পদ ও তার সত্যতা উপলব্ধি করেছিলেন। শ্রীরামকৃষ্ণের সরল অনাড়ম্বর জীবনযাত্রাও সকলের বিস্ময়ের উদ্রেক করত। মালঞ্চ উপন্যাসে অসুস্থ নীরজার শয়নকক্ষে তার মাথার উপরের দেওয়ালে শ্রীরামকৃষ্ণের ছবিকে স্থান দিয়েছেন লেখক রবীন্দ্রনাথ, অসুস্থ নায়িকার মন প্রাণ সর্বস্ব যেন সেই ছবিতে সমর্পিত। রবীন্দ্রনাথেরই রাজা নাটকে দেখি, নানা দেশ থেকে আসা রাজারা এসে লক্ষ করছেন, এখানে পৌঁছনোর নির্দিষ্ট কোনও একটি পথ নেই। তাঁরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছেন, যে পথ দিয়েই আসা হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত এক গন্তব্যেই পৌঁছনো যাবে। এও যেন শ্রীরামকৃষ্ণের বাণীরই বহিঃপ্রকাশ!

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

birth anniversary

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy