Advertisement
২৫ জুন ২০২৪
প্রবন্ধ ২

ঘড়ি পালটে নিলে আলো বাঁচে, বিদ্যুৎও

গোটা দেশে কেন একটাই সময় চালু থাকবে? অসম থেকে দাবি উঠেছে, পূর্ব এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য আলাদা ‘টাইম জোন’ চালু হোক। এই দাবির পক্ষে অনেক সুযুক্তি আছে। কেন্দ্রের তা শোনা উচিত।শে ষ পর্যন্ত কথাটা পেড়েই ফেললেন জানু বরুয়া। অসমের নামী চলচ্চিত্র পরিচলক। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নাম জাতীয় মহলে তো বটেই, আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁকে সম্মান জানিয়েছেন রাজ্যপাল। এর পরে সম্মানিত ওই চলচ্চিত্রনির্মাতাকে কিছু বলতে বলা হয়েছিল। এবং বহু দিন ধরে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যে দাবিটি মানা হচ্ছে না, গুয়াহাটিতে আয়োজিত সভায় সেটাই ফের উত্থাপন করলেন তিনি।

দেবদূত ঘোষঠাকুর
শেষ আপডেট: ০১ জুলাই ২০১৫ ০০:০৩
Share: Save:

শে ষ পর্যন্ত কথাটা পেড়েই ফেললেন জানু বরুয়া। অসমের নামী চলচ্চিত্র পরিচলক। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নাম জাতীয় মহলে তো বটেই, আন্তর্জাতিক স্তরে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁকে সম্মান জানিয়েছেন রাজ্যপাল। এর পরে সম্মানিত ওই চলচ্চিত্রনির্মাতাকে কিছু বলতে বলা হয়েছিল। এবং বহু দিন ধরে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যে দাবিটি মানা হচ্ছে না, গুয়াহাটিতে আয়োজিত সভায় সেটাই ফের উত্থাপন করলেন তিনি। সম্মান জানানোর এই অনুষ্ঠানে এমন কথা বলা উচিত কি না তা নিয়ে একটু ধন্দও ছিল তাঁর। কিন্তু যেহেতু অনুষ্ঠানটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত, তাই বলেই ফেললেন কথাটা।
না, সীমান্ত নিয়ে টানাপড়েন নয়। ভাষা আন্দোলন নয়। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নয়। উগ্রপন্থা নয়। এমনকী কেন্দ্রীয় বঞ্চনাও নয়। যে দাবিটি জানু বরুয়া উত্থাপন করলেন তা হল ভারতে দুটি ‘টাইম জোন’ বা ‘সময় অঞ্চল’ প্রচলনের। জানু বরুয়ার দাবি, সূর্যের উদয়-অস্তের সময়কে সম্মান দিয়ে ভারতের জন্য দু’টি টাইম জোন ঠিক করুক কেন্দ্রীয় সরকার। একটি পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য। অন্যটি দেশের বাকি অংশের জন্য।
ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ড টাইম (আইএসটি) যে অক্ষাংশের নিরিখে তৈরি, সেটি গিয়েছে ইলাহাবাদের কাছাকাছি এলাকা দিয়ে। এর পশ্চিম দিকে যে সব অঞ্চল রয়েছে, প্রাকৃতিক কারণেই সেগুলির সূর্যোদয়ের সময় পূর্বের রাজ্যগুলির থেকে অন্তত আধঘণ্টা পিছিয়ে। জানু বরুয়া বিষয়টি নিয়ে পনেরো বছর ধরে বিভিন্ন ফোরামে দাবি জানিয়ে চলেছেন। গত বছরই অসম সরকার সরকারি ভাবে কেন্দ্রের কাছে একই দাবি জানিয়েছে। দাবি জানিয়ে আসছেন বিজ্ঞানীরাও। বেঙ্গালুরুর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজ-এর ন্যাচারাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গবেষকেরা টাইম জোন নিয়ে একাধিক বার কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে তাঁদের সুপারিশ পেশ করেছেন। পাঁচ বছর ধরে কেন্দ্রীয় সরকার বিষয়টি নিয়ে বিস্তর বৈঠক ডেকেছে। কিন্তু এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।

কিন্তু একাধিক টাইম জোনের দরকার কী? দুটি দৃশ্য কল্পনা করা যাক।

দৃশ্য ১: আইএসটি অনুযায়ী ঘড়িতে রাত আটটা। কলকাতায় অর্ধেক শহর অফিস সেরে ঘরে ঢুকে গিয়েছে। মুম্বইয়ের জুহু বিচে সূর্যের আলো তখনও পুরো নেভেনি।

দৃশ্য ২: ঘড়িতে ভোর চারটে। কোহিমায় সূর্য উঠছে, গুজরাতের পোরবন্দরে মধ্যরাত্রি।

এটাই গোলমাল। অন্তত দুটি টাইম জোন থাকলে এই বিসদৃশ অবস্থাটা অনেকখানি দূর হবে।

অসম সরকারের মতে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের টাইম জোন বাকি ভারতের টাইম জোন থেকে দুই ঘণ্টা এগিয়ে থাকা উচিত। কোহিমায় সূর্য ওঠা এবং অস্ত যাওয়ার সময় ধরে তৈরি হোক ওই নতুন টাইম জোন। অর্থাৎ কোহিমায় যখন ছয়টা বাজবে, তখন পোরবন্দরের ঘড়িতে সময় থাক ভোর চারটে। পোরবন্দরের সন্ধ্যা ছটায় কোহিমায় হোক রাত আটটা।

তাতে লাভ কী হবে? কাজের সময় অতিরিক্ত দু’ঘণ্টা সূর্যালোক পাবে উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলো। এখন যে দু’ঘণ্টা দৈনন্দিন কর্মতালিকা থেকে বাদ যায়। আবার দু’ঘণ্টা সময় এগিয়ে আসায় সূর্যাস্তের পরে আর অফিসগুলিতে কাজ করতে হবে না। এখন আইএসটি মেনে অফিসের কাজ হওয়ায় বিকেল চারটের পরেই আলো জ্বালিয়ে দিতে হয় অফিসে। ফলে অতিরিক্ত দু’ঘণ্টা বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়। এই সব যুক্তি দেখিয়েই সম্প্রতি উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আঞ্চলিক সময় চালুর দাবি জানিয়েছে অসম। এর সপক্ষে যুক্তি হিসেবে অনেকেই বলছেন, আমেরিকা, রাশিয়া কিংবা অস্ট্রেলিয়ায় একাধিক আঞ্চলিক সময় রয়েছে। তা হলে ভারতে হবে না কেন!

একটা সময়ে ভারতেও একাধিক আঞ্চলিক সময় চালু ছিল। ১৮৮০’র ১ জানুয়ারি সব প্রদেশের নিজস্ব সময় চালু হয়। তার আগে কলকাতার সময় মেনেই চলত দেশের বেশির ভাগ প্রদেশ। ১৯০৬ সালে অভিন্ন ভারতের প্রামাণ্য সময় (আইএসটি) তৈরি হয়। এর পরে দু’বার অদলবদল হলেও ১৯৪৫ সালে ফের গ্রেনিচ-এর থেকে সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা এগিয়ে থাকা ভারতীয় প্রামাণ্য সময়েই ফেরে দেশ। তার পর থেকে এই প্রথম পৃথক সময়ের দাবি তুলল অসম। প্রসঙ্গত, ব্রিটিশ আমলে তৈরি হওয়া অসমের স্থানীয় সময় মেনে এখনও উজানি অসমের কয়েকটি চা বাগানে কাজ চলে।

এই দাবির সমর্থনে অসম পাশে চায় পশ্চিমবঙ্গকেও। অসমের এই দাবি বাস্তবসম্মতও বটে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ সরকার তা মনে করে না। তারা মনে করে, বহু দিন ধরেই সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রাজ্যবাসীর জীবনযাত্রা তৈরি হয়েছে। সেটা হঠাত্ পালটে দিলে কর্মক্ষমতা আহামরি কিছু বাড়বে না, বরং গোটা ব্যবস্থাটা তালগোল পাকিয়ে যেতে পারে। তা ছাড়া, পৃথক সময় চালু করে এ রাজ্যে আদৌ কতটা বিদ্যুত্ সাশ্রয় হবে, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে রাজ্য সরকারের।

পৃথক টাইম জোনের বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করে আসছেন বেঙ্গালুরুর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যাডভান্সড স্টাডিজের ন্যাচারাল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক দেবীপ্রসাদ সেনগুপ্ত। তিনি এবং তাঁর সহ গবেষকেরা মনে করেন, দুটি পৃথক টাইম জোনের ঝামেলায় না গিয়ে ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ড টাইম আধ ঘণ্টা এগিয়ে আনলেই সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে।

বিষয়টি নিয়ে অনেকটা এগিয়েছিল কেন্দ্র। ২০১২ সালে জাতীয় বিদ্যুত্ গ্রিডের বিপর্যয়ের পর আঞ্চলিক সময় চালু করে বিদ্যুত্ খরচ বাঁচানোর জন্য কেন্দ্রীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রকের ব্যুরো অব এনার্জি অডিট-এর সচিবকে মাথায় রেখে একটি কমিটিও করা হয়েছিল। কিন্তু কী ভাবে বিদ্যুত্ বাঁচানো সম্ভব, তা নিয়ে ধোঁয়াশা পুরোপুরি কাটেনি। তা ছাড়া, প্রশাসনের একাংশ মনে করছেন, দেশে পূর্ব থেকে পশ্চিমের সময়ের পার্থক্য দু’ঘণ্টার। আমেরিকা বা সাবেক সোভিয়েত দেশের তুলনায় এটা তেমন বেশি নয়। বরং ভারতীয় সময়কে ভাগ করলে তা প্রশাসনিক ও পরিবহণ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করবে।” গত ৮ জুন এ ব্যাপারে দিল্লিতে বৈঠক ডেকেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। শেষ মুহূর্তে বৈঠক বাতিল হয়ে যায়। কেন্দ্রীয় শক্তি মন্ত্রক সূত্রের খবর, প্রতিটি রাজ্য সরকারের মতামত নিয়েই এ বার এগোতে চাইছে কেন্দ্র।

জানু বরুয়ার মতে, দ্রুত এগোনো দরকার। তিনি অঙ্ক কষে দেখালেন, বিভিন্ন সরকারি অফিসে এক ঘণ্টা অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে গড়ে ২০ ইউনিট বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এই ধরনের অফিস, সংস্থার সংখ্যা ৫ লক্ষ ধরলে এবং ৪৫ বছর ধরে সারা বছর ওই অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহৃত না হলে ৫৭ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা (প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য সা়ড়ে তিন টাকা ধরে) বাঁচত। আর দিনে অতিরিক্ত দুই তিন ঘণ্টা কাজের সুযোগ নষ্ট হওয়ায় স্বাধীনতার পর থেকে গত ৬৭ বছরে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ২৭ বছর ১১ দিন কাজের সময় নষ্ট হয়েছে। তাঁর রসিকতা: ‘‘আমি যেখানে যাই সেখানেই এই দাবি তুলি। হয়তো সেই জন্যই সরকার আমাকে পদ্মভূষণ দিয়ে চুপ করিয়ে রাখতে চাইছে।’’

উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে জাতীয় স্তরে আরও উন্নত করার ওই জাতীয় আলোচনাচক্রে অধিকাংশ শ্রোতারই সারা দিনের আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে থাকল অসমের চলচ্চিত্র নির্মাতার ওই দাবি। দিল্লি-কলকাতা থেকে যাওয়া অধিকাংশ সাংবাদিকেরই মনে হয়েছে, ‘‘ঠিক বলেছেন জানু বরুয়া।’’

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:
Advertisement

Share this article

CLOSE