করোনা সংক্রমণের গতির নিরিখে ভারত যে বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলির তুলনায় ভাল জায়গায় আছে, তাহা প্রায়শই বলা হইতেছে। সরকার তথ্যপ্রমাণ সহযোগে সেই দাবি করিতেছে, চিকিৎসকরাও সহমত হইতেছেন। ইহা আশার কথা। উদ্বেগ অন্যত্র। সমীক্ষায় স্পষ্ট, দেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যার এক বৃহৎ অংশই করোনায় কো-মর্বিডিটির শিকার। বিশেষজ্ঞরা জানাইতেছেন, বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলির তুলনায় ভারতে কর্মক্ষম জনসংখ্যা (৩০-৬৫ বৎসর) অধিক। উৎপাদনশীলতার দিক হইতে ইহা ইতিবাচক অবশ্যই। কিন্তু সেই কর্মক্ষম জনসংখ্যা যে সুস্বাস্থ্যের অধিকারী, এমন বলা চলা না। পরিসংখ্যান বলিতেছে, ইহাদের মধ্যে অনেকেই ত্রিশের কোঠা পার না করিতেই অকালবার্ধক্যের শিকার হইয়া পড়েন। শরীরে বাসা বাঁধে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবিটিস, হৃদ্যন্ত্রের নানা অসুখ। বস্তুত, এই চিত্র শুধুমাত্র ভারতে নহে। বিদেশেও দেখা গিয়াছে, কোভিডের কারণে শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় সেই দেশে বসবাসকারী দক্ষিণ এশীয়দের মৃত্যুহার প্রায় ২০ শতাংশ অধিক। কারণ হিসাবে ডায়াবিটিসকেই প্রাথমিক ভাবে দায়ী করা হইতেছে। দেখা গিয়াছে, করোনাক্রান্ত শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় তাঁহাদের গড় বয়স কম। অন্যান্য জটিল অসুখেরও উপস্থিতি নাই। কিন্তু রক্তে শর্করার পরিমাণ অত্যধিক। প্রায় ৪০ শতাংশ দক্ষিণ এশীয়ই টাইপ-ওয়ান অথবা টাইপ-টু ডায়াবিটিসের শিকার। করোনার ন্যায় অতিমারির ক্ষেত্রে এই অসুখগুলির উপস্থিতি যে মৃত্যুহার অন্তত ৫০ শতাংশ অবধি বৃদ্ধি করিতে পারে, বিশেষজ্ঞরা তাহা পূর্বেই সতর্ক করিয়াছিলেন। করোনায় ভারতে মধ্যবয়সিদের অধিক মৃত্যুহার সেই আশঙ্কাকেই সত্য প্রমাণ করিল।
অথচ, বিশেষজ্ঞদের সতর্কবাণী মানিয়া চলা খুব পরিশ্রমসাধ্য ছিল না। নিয়মিত নজরদারিতেই কো-মর্বিডিটির সম্ভাবনা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা যাইত। কিন্তু বাস্তবে বিপরীত চিত্রটিই দেখা গেল। সম্পূর্ণ চিকিৎসা পরিকাঠামোই রাতারাতি অতিমারি-কেন্দ্রিক হইয়া পড়িল। সংক্রমণ-আতঙ্কে বন্ধ হইল হাসপাতালের বহির্বিভাগ, চিকিৎসকের চেম্বার। গৃহবন্দি রোগীরাও রক্তচাপ, শর্করার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ বন্ধ করিলেন। লকডাউন চলাকালীন কিছু ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যক ঔষধের জোগানেও টান পড়িল। দীর্ঘ লকডাউনে নিম্নবিত্ত এবং মধ্যবিত্ত পরিবারগুলি খরচ বাঁচাইতে রক্তচাপ, ডায়াবিটিসের ঔষধ ক্রয় কমাইয়াছেন, এমনও ইঙ্গিত মিলিয়াছে। আত্মঘাতী পরিস্থিতি। দীর্ঘ দিন ধরিয়াই বিশেষজ্ঞরা অল্পবয়সিদের মধ্যে ‘ক্রনিক মর্বিডিটি’-র অত্যধিক বৃদ্ধি লইয়া আশঙ্কা প্রকাশ করিয়া আসিতেছেন। ইহা যে নিঃশব্দ ঘাতক, তাহাও জানা ছিল। রাষ্ট্রপুঞ্জের ইএসসিএপি-র গবেষণাপত্রেও তেমনই তথ্য প্রকাশিত হইয়াছিল। অথচ, অতিমারির সময় এই বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা লওয়া হয় নাই। আর্থিক কর্মকাণ্ড শুরু হইবার সঙ্গে সঙ্গে কর্মক্ষম মানুষদের কাজে বাহির হইতে হইবে। সংক্রমণের আশঙ্কাও তাঁহাদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পাইবে, মৃত্যুহার আরও বাড়িবে। সুতরাং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করিতে হইবে, গ্রামে ইহাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করিতে হইবে, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করিতে হইবে। কর্মক্ষম জনসংখ্যার আধিক্য এই দেশের সম্পদ। কো-মর্বিডিটি সেই সম্পদ গ্রাস করিতে চাহিলে তাহার আর্থিক-সামাজিক প্রভাব ভয়াবহ হইতে পারে।