E-Paper

বাড়ছে স্কুলছুট, কমছে স্কুল

সমাধান হাঁটছে উল্টো পথে। গ্রামের মেয়েদের কাছে স্কুলের নাগাল আরও সহজ না-হয়ে আরও কঠিন হয়ে উঠছে, কারণ ঘরের থেকে স্কুলের দূরত্ব বাড়ছে। সরকারি নীতি, যে স্কুলগুলিতে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা পঞ্চাশের নীচে নেমে যাচ্ছে, সেগুলিকে কাছাকাছি স্কুলের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হবে।

তরুণকান্তি নস্কর

শেষ আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৪৮

এক দিকে প্রধানমন্ত্রীর সাধের ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ চলছে, অন্য দিকে একই সঙ্গে স্কুলছুট হওয়ার হার বাড়ছে। এ কেমন করে সম্ভব? নারী ও শিশু উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রীর উত্তর থেকে জানা যাচ্ছে, গত পাঁচ বছরে দেশে ৬৫.৭ লক্ষ শিশু স্কুল ছেড়েছে, যার প্রায় অর্ধেক (২৯.৮ লক্ষ) হল মেয়ে। রাজ্যভিত্তিক তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে গুজরাতে সর্বাধিক শিশু স্কুলছুট হয়েছে— প্রায় ২.৪ লক্ষ। এর মধ্যে ১.১ লক্ষ কন্যাশিশু। ২০২৪ সালে গুজরাতেই স্কুলছুট শিশুর সংখ্যা ছিল মাত্র ৫৪,৫৪১। মাত্র এক বছরে এই বিপুল বৃদ্ধি সকলকে বিস্মিত করেছে। এর পরেই রয়েছে অসম, যেখানে দেড় লক্ষেরও বেশি শিশু স্কুলছুট, যাদের মধ্যে ৫৭ হাজার মেয়ে। উত্তরপ্রদেশে স্কুলছুট শিশু ৯৯ হাজার, তাদের মধ্যে ৫৬ হাজার মেয়ে। কেন্দ্রের শাসক দল দাবি করে যে ‘ডবল ইঞ্জিন সরকার’ উন্নয়নে আরও দ্রুত গতি আনতে পারবে। বাস্তবে স্কুলছুটের হারে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয়, তিনটি স্থানেই রয়েছে বিজেপি-শাসিত তিনটি রাজ্য।

প্রধানমন্ত্রী মোদী স্বয়ং ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে হরিয়ানার পানিপথে ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’ প্রকল্পের সূচনা করে কত না স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন! কন্যাসন্তানের জন্মহার হ্রাস সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ, নারীর ক্ষমতায়নের প্রতিশ্রুতি, কিশোরীদের সচেতনতা প্রসার ও বিকাশ প্রভৃতি কত কথা উচ্চারিত হয়েছিল তাঁর ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানগুলিতে। কন্যাসন্তানের সঙ্গে নিজস্বী তোলারও আহ্বান ছিল। প্রকল্পটির ১০ বছর পরেও ‘বেটি’দের এই হাল হল কেন?

স্কুলছুট-প্রবণতার কারণ কী? কেন্দ্র সংসদে জানিয়েছে, পরিবারের স্থানান্তর, গৃহস্থালির কাজের দায়িত্ব, রোজগারে বাধ্য করা, সামাজিক চাপ, এগুলোই মেয়েদের শিক্ষায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এ সব কি নতুন কথা? এগুলোই যদি সমস্যা হয়, তা হলে সমাধানের ব্যবস্থা কী করা হচ্ছে?

সমাধান হাঁটছে উল্টো পথে। গ্রামের মেয়েদের কাছে স্কুলের নাগাল আরও সহজ না-হয়ে আরও কঠিন হয়ে উঠছে, কারণ ঘরের থেকে স্কুলের দূরত্ব বাড়ছে। সরকারি নীতি, যে স্কুলগুলিতে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা পঞ্চাশের নীচে নেমে যাচ্ছে, সেগুলিকে কাছাকাছি স্কুলের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হবে। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০২০-তে ‘ক্লোজার অ্যান্ড মার্জার’-এর কথা বলা হয়েছে, এবং দেশ জুড়ে তা শুরু হয়েছে। উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ ঘোষণা করেছেন, তাঁর সরকার ২৭ হাজার স্কুল একত্রীকরণ করবে। এই সংখ্যা রাজস্থানে ১৯,৫০০, মহারাষ্ট্রে ১৫ হাজার, গুজরাতে সাত হাজার, ছত্তীসগঢ়ে ৬,০৪০, অসমে ৫,৯৫৩, কর্নাটকে ৩,৪০০ এবং পশ্চিমবঙ্গে ৮,২০৭। যে রঙেরই সরকার হোক না কেন, তাদের মধ্যে যেন প্রতিযোগিতা চলছে, কে কত স্কুল বন্ধ করে দিতে পারে!

এই অন্যায় ঢাকতে নতুন নতুন মোড়ক তৈরি হচ্ছে। কর্নাটক সরকার সম্প্রতি একটি বিলের মাধ্যমে ‘কেপিএস ম্যাগনেট স্কুল’ প্রকল্প চালু করতে চাইছে। সারা রাজ্যে কিছু স্কুল ‘কর্নাটক পাবলিক স্কুল’ বলে চিহ্নিত হবে, যার সঙ্গে আশেপাশের স্কুলগুলি মিলে যাবে। ‘পাইলট প্রকল্প’ হিসেবে বেঙ্গালুরু দক্ষিণ জেলার হোঙ্গানুরুতে একটি ‘ম্যাগনেট’ স্কুলের সঙ্গে আশেপাশের গ্রামের সাতটি স্কুলকে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে কয়েকটি প্রাথমিক স্কুলও। এই ব্যবস্থা শিক্ষার অধিকার আইন (আরটিই)-এর সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আরটিই বলেছিল, সর্বজনীন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে গ্রামের এক কিলোমিটারের মধ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকা আবশ্যক। না হলে কাগজে-কলমে ভর্তি থাকলেও অনেকে পড়াশোনা সম্পূর্ণ করতে পারবে না।

‘ম্যাগনেট’ প্রকল্পের বিরুদ্ধে ওই রাজ্যে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। অভিভাবকদের আশঙ্কা, এই প্রকল্পের ফলে গ্রামাঞ্চলের ছাত্রছাত্রীদের এমনকি ১০-২৫ কিলোমিটার দূরে ‘ম্যাগনেট’ স্কুলে যেতে হবে। তাতে শিশুদের, বিশেষ করে কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা ও স্কুলছুট হওয়ার ঝুঁকি বাড়বে। পশ্চিমঘাট অঞ্চলে দীর্ঘ যাতায়াত শিশুদের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হবে। অনেকে মেয়েদের স্কুলে পাঠানো বন্ধ করবেন। অনেক ক্ষেত্রেই ষষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণিতে পড়া বড় মেয়েটিকেই ছোট ভাইবোনের দেখাশোনার দায়িত্ব নিতে হয়। পাড়ার কাছাকাছি স্কুল থাকলে পড়াশোনা ও পারিবারিক দায়িত্ব— দু’টিই সামলানো সম্ভব হতে পারে, স্কুল দূরে হলে মেয়েটির পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। এই আশঙ্কা প্রতিটি রাজ্যে গাঢ় হচ্ছে। এক কথায়, স্কুলছুটের সমস্যা গভীর হচ্ছে।

কন্যাসন্তানদের ক্ষেত্রে এই সমস্যা গভীরতর। হয় তারা পরিবারের চাপে বাল্যবিবাহে বাধ্য হবে, নয়তো শ্রমিকের কাজে যুক্ত হবে এবং আরও খারাপ হলে নারী পাচারকারীদের শিকারে পরিণত হবে। স্কুল মেয়েদের কাছে শুধু শিক্ষার জায়গা নয়, সুরক্ষারও উপায়।

স্কুল একত্রীকরণের পাশাপাশি আরও কিছু প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা আশঙ্কাজনক। যেমন, পশ্চিমবঙ্গে মধ্যশিক্ষা পর্ষদ সম্প্রতি নির্দেশ দিয়েছে যে নবম বা দশমে কোনও স্কুল দশ জনের বেশি নতুন পড়ুয়া ভর্তি নিতে পারবে না। ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে না দিলে কোনও কোনও স্কুলে ভর্তির চাপ বেড়ে যায়, বলেছেন এক কর্তা। কোনটা বড় সঙ্কট? স্কুলের চাপ বেড়ে যাওয়া, না কি ঊর্ধ্বসীমা বেঁধে দেওয়ার ফলে ছাত্রছাত্রীদের স্কুলে নাম লেখাতে না-পারা? স্কুলছুট প্রতিরোধ করতে হলে যা কিছু দরকার— বাড়ির কাছে স্কুল, নিয়মিত পড়াশোনা, আনন্দময় পাঠ— সরকারি নীতি যেন হাঁটছে তার উল্টো পথে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

school Students Education system

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy