শাস্তি ঠিক কেমন হওয়া বিধেয়? অপরাধের গুরুত্বের সহিত মানানসই, অপরাপর সম্ভাব্য অপরাধীর মনে ভীতিসঞ্চারে সক্ষম কিন্তু সংশ্লিষ্ট অপরাধীর সংশোধনের সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করিবে না— এই চরিত্রলক্ষণগুলি থাকিলে কোনও শাস্তিকে ‘ন্যায্য’ বলা চলিতে পারে। সংসদে সম্প্রতি মোটর ভেহিক্‌লস (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট পাশ হইল। গাড়ি চালাইবার সময় যে অপরাধগুলি ঘটিয়া থাকে, এই সংশোধনী আনিয়া সেগুলির ক্ষেত্রে শাস্তির পরিমাণ বিপুল রকম বাড়ানো হইয়াছে। আইনশৃঙ্খলার এই ক্ষেত্রটি যে হেতু রাজ্য সরকারের এক্তিয়ারে পড়ে, ফলে কোনও রাজ্য কেন্দ্রীয় আইনটি মানিবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত করিবার অধিকার রাজ্যের। পশ্চিমবঙ্গ তো বটেই, এমনকি একাধিক বিজেপিশাসিত রাজ্যও জানাইয়াছে, তাহারা এই নূতন আইন মানিতে অসম্মত। প্রতিটি রাজ্যের ক্ষেত্রেই আপত্তির মূল কারণ জরিমানার বর্ধিত পরিমাণ। এক্ষণে একটি প্রশ্ন থাকে বটে— সংবিধান অনুসারে যাহা রাজ্যের বিচার্য, তেমন একটি ক্ষেত্রে কেন্দ্রের কি গোটা আইন প্রণয়নের প্রয়োজন ছিল? একটি কাঠামো খাড়া করিয়া জরিমানা ইত্যাদির পরিমাণ নির্ধারণের দায়িত্বটি রাজ্য সরকারগুলির উপর ছাড়িয়া দিলেই যুক্তরাষ্ট্রীয়তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হইত না কি? এই প্রশ্নটিকে যদি সরাইয়া রাখা যায়, তবে না বলিয়া উপায় নাই যে কেন্দ্রীয় আইনে নির্দিষ্ট করা শাস্তিগুলি নিতান্ত ন্যায্য। সেগুলিকে না মানিবার কোনও নৈতিক কারণ থাকা দুষ্কর।

প্রথমত, পশ্চিমবঙ্গের ন্যায় রাজ্যে ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করিলে যে হারে জরিমানা দিতে হয়, তাহা হাস্যকর। তাহার গায়ে মূল্যস্ফীতির ছাপ পড়ে নাই। সেই যৎসামান্য জরিমানা কাহারও গায়ে লাগে না, প্রাণে লাগা তো আরও দূরের কথা। কাজেই, ভীতিসঞ্চার করিতে হইলে জরিমানার অঙ্কবৃদ্ধি আবশ্যক। দ্বিতীয়ত, যাহারা মদ্যপ অবস্থায় বা এমনিতেই বেলাগাম গাড়ি চালায়, তাহারা বহু মানুষের বিপদের কারণ। জরিমানার ধাক্কায় যদি তাহারা গাড়ি চালানো বন্ধও করিয়া দেয়, সমাজের খুব বেশি ক্ষতি হইবে না। তৃতীয়ত, জরিমানার অঙ্ক বা কারাবাসের মেয়াদ বাড়াইতে অসম্মত হইলে এই বেলাগাম, বে-আদব গাড়িচালকদের তোল্লাই দেওয়া হয়— এবং, যাঁহারা আইন মানিয়া গাড়ি চালান, তাঁহাদের প্রণোদনা নষ্ট করা হয়। দুষ্টের দমন না হইলে শিষ্টের পালনের কাজটিও অসম্পূর্ণ থাকিয়া যায়। তাহা প্রত্যক্ষ ভাবেই সুপ্রশাসনের বিরোধী। অতএব, যাঁহারা কেন্দ্রীয় আইনের বিরোধিতা করিতেছেন, তাঁহারা নৈতিকতার কোন মাপকাঠিতে আইনটিকে বিচার করিয়া তাহাকে অগ্রহণযোগ্য সাব্যস্ত করিলেন, বুঝাইয়া বলিবার দায়িত্বও তাঁহাদেরই।

কঠোরতর শাস্তির বিধান অবশ্য একটি ভিন্নতর (অসৎ) প্রণোদনার জন্ম দিতে পারে। ধরা যাউক, কোনও একটি অপরাধে জরিমানার পরিমাণ ৩০০ টাকা হইতে বাড়িয়া ৫,০০০ টাকা হইল। ৩০০ টাকা দিতে গায়ে না লাগিলেও অধিকাংশ লোকের ক্ষেত্রেই ৫,০০০ টাকা দেওয়া কষ্টের। অতএব, সংশ্লিষ্ট পুলিশকর্মীটি যদি অসৎ হন তবে অপরাধী ও আইনরক্ষক, উভয় পক্ষের নিকটই ঘুষ দেওয়া ও লওয়ার প্রণোদনা থাকিবে। ৫,০০০ টাকার কম যে কোনও অঙ্ক দিতে হইলেই অপরাধীর লাভ; আর সেই টাকা সরকারের ঘরে জমা না করিয়া পকেটে পুরিলে অসৎ পুলিশকর্মীরও লাভ। আবার, আশঙ্কা থাকিয়া যায়, এই ঘুষ আদায় করিবার জন্য বিনা অপরাধেই কাহাকে হেনস্থা করিতে পারে পুলিশ। বিশেষত বাণিজ্যিক পরিবহণের ক্ষেত্রে তেমন আশঙ্কা প্রকট। কাজেই, যে রাজ্যগুলি কঠোরতর শাস্তির ব্যবস্থা মানিতেছে, সেখানেও সতর্ক হওয়া বিধেয়। নূতন আইন যেন বর্ধিত দুর্নীতির কারণ না হইয়া দাঁড়ায়, তাহা নিশ্চিত করিবার দায়িত্ব রাজ্য প্রশাসনের।