E-Paper

গরম যখন জীবনসঙ্কট

গত এক দশকে রাজ্য ও শহরভিত্তিক ‘তাপ নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা’ (হিট অ্যাকশন প্ল্যান) তৈরি হয়েছে— উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে তাপ-বিপর্যস্ত এলাকা চিহ্নিত করার কাজও এগিয়েছে।

প্রসেনজিৎ সরখেল

শেষ আপডেট: ২৪ জুন ২০২৬ ০৬:২৭

সূর্য সব সময়ে কোটি কোটি ফারেনহাইট ঢালছে তো ঢালছেই। আটটা বাজলেই দিগন্তরেখা ও আকাশের মাঝখানে বাতাসউত্তাপে কাঁপে, মনে হয় দিগন্ত ব্যেপে প্রেতপ্রেতিনী নাচছে।” এ বছরের গ্রীষ্মে ধুঁকতে-থাকা জনপদগুলি দেখলে মনে হয়, মহাশ্বেতা দেবী আজকের কথাই লিখেছেন ‘জল’ (১৯৭৬) গল্পে। দাবদাহে গত দু’মাসে প্রায় ৩০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। দেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পারদ এক টানা ৪৫ ডিগ্রির গণ্ডি ছাড়িয়ে যাচ্ছে। গরমের তীব্রতা সম্পর্কে সতর্ক করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে সতর্কবার্তা জারি করতে হয়েছে।

মুম্বইয়ের ভার্সোভা সমুদ্রতটে রোজ রাতে দলে দলে মানুষ চাদর-বালিশ নিয়ে চলে আসছেন, সাগর কুটির আর ইন্দিরা নগরের বস্তি থেকে। অটো চালক, অ্যাপ-ক্যাব চালক, গৃহশ্রমিক, সিকিয়োরিটি গার্ড, দিনমজুর মানুষগুলি থাকেন টিন বা অ্যাসবেস্টসের ছাদের নীচে, যা দিনভর শুষে নেওয়া তাপ, রাতে তাপ ছাড়ে। তার উপর রয়েছে লোডশেডিং। তাই ঘর ছেড়ে খোলা আকাশ বেছে নিচ্ছেন তাঁরা। আগে সন্ধ্যার পর তাপমাত্রা কমত, ইদানীং রাতেও গরম কমছে না। শহরাঞ্চলে কংক্রিট, ঘনবসতি তাপ ধরে রাখে। ফলে দিনের ক্লান্তিটুকু রাতের বিশ্রামে পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ কমছে। ভার্সোভার সৈকতে মানুষের ঘুম সেই সঙ্কটের প্রকাশ।

গত এক দশকে রাজ্য ও শহরভিত্তিক ‘তাপ নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা’ (হিট অ্যাকশন প্ল্যান) তৈরি হয়েছে— উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে তাপ-বিপর্যস্ত এলাকা চিহ্নিত করার কাজও এগিয়েছে। কিন্তু পরামর্শগুলি এখনও কেবল দিনের তাপ মোকাবিলার উপযোগী— রোদ এড়িয়ে চলুন, জল খান, বিশ্রাম নিন। অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের এই ব্যবহারবিধি মেনে চলা কঠিন। গরমে অসুস্থতার ঝুঁকির চেয়ে কাজ হারানোর ভয়টাই তাঁদের কাছে বড়। সুতরাং তাপ নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনায় স্বাস্থ্য নির্দেশিকার পাশাপাশি, রোজগার সুরক্ষার দিকগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

যেমন, তাপপ্রবাহ-সতর্কতা লাল স্তরে পৌঁছলে নির্মাণ, পরিবহণ, ডেলিভারি বা পথ-বাণিজ্যের মতো পেশাগুলির কাজের সময় ভোর ও সন্ধ্যার শীতলতর সময়ে সরিয়ে আনা যায়। অ্যাপ-ক্যাব বা ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মের শ্রমিকদের জন্য শ্রমিক কল্যাণ তহবিল তৈরির নির্দেশ দিয়েছে সামাজিক সুরক্ষা বিধি। এই তহবিলের টাকা তাপ-ক্ষতিপূরণের খাতে খরচ করা সম্ভব। কাজের সময় কমায় মজুরির ক্ষতি পুষিয়ে দিতে ই-শ্রম পোর্টালে নথিভুক্ত প্রতিটি শ্রমিকের অ্যাকাউন্টে তাপ-সতর্কতার দিনগুলির জন্য ন্যূনতম ক্ষতিপূরণ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা যায়। যে শ্রমিকদের কোনও নির্দিষ্ট নিয়োগকর্তা নেই, নানা সময়ে নানা মালিকের অধীনে কাজ করেন, তাঁদের জন্য এমন সুরক্ষা জরুরি হয়ে উঠেছে।

কাজের ঘণ্টা কমালে উৎপাদন কমবে, সে ভয়ও রয়েছে। তবে খেয়াল করা চাই, অতিরিক্ত গরমে শ্রমিকের শারীরিক সক্ষমতা, মনোযোগ এবং কাজের গতি এমনিতেই কমে যায়; দুর্ঘটনা ও অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ে। ফলে কাজের পূর্ণ সময় বজায় রাখলেও প্রকৃত উৎপাদনশীলতা প্রায়শই কমে। এ ক্ষেত্রে তাপ নিয়ন্ত্রণের খরচ কেবল কল্যাণমূলক ব্যয় নয়, দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীলতা রক্ষার বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে পারে শিল্প সংস্থাগুলি।

অনেকটা এই আদলেই স্থানীয় সংগঠনের উদ্যোগে গুজরাত, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র এবং দিল্লির কিছু অঞ্চলে তাপসূচক বিমার পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু হয়েছে। এই ব্যবস্থায় নির্দিষ্ট এলাকার তাপমাত্রা নির্ধারিত সীমা ছাড়ালেই নথিভুক্ত শ্রমিকের অ্যাকাউন্টে বিমার ক্ষতিপূরণের অর্থ পৌঁছে যায়। তবে বিমা ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে অনিশ্চিত ক্ষতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য তৈরি। তাপপ্রবাহ যদি বাৎসরিক ঘটনা হয়ে ওঠে, তাতে বাণিজ্যিক বিমা ব্যবস্থার উপর চাপ বাড়বে। তাই সকলের কাছে এই ধরনের বিমা পৌঁছে দিতে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হতে পারে। তা ছাড়া, এই সূচক এখনও দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা-নির্ভর। এখন বোঝা যাচ্ছে, রাতে ঘুমের অভাবে স্বাস্থ্যহানি, কর্মক্ষমতা হ্রাসকেও হিসাবের মধ্যে আনা দরকার।

আর্থিক ব্যবস্থার পাশাপাশি তাপ নিয়ন্ত্রণ পরিকাঠামোর দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। সম্প্রতি কিছু রাজ্যে পরীক্ষামূলক ভাবে গৃহস্থের ছাদে তাপ-প্রতিফলক রঙের প্রলেপ দেওয়া শুরু হয়েছে। কেরলের অঙ্গনওয়াড়ি স্কুলের ছাদে এই রং লাগিয়ে শ্রেণিকক্ষের তাপ কমেছে, পড়ুয়াদের লেখাপড়ার মান উন্নত হয়েছে। নগর-পরিকল্পনায় জল সংরক্ষণের মতো, তাপ নিবারণকেও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। তবে ভার্সোভার অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, বিদ্যুতের অবিচ্ছিন্ন জোগান তাপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সমান গুরুত্বপূর্ণ। বস্তি-পুনর্বিন্যাস বা আবাস প্রকল্পের অংশ হিসেবে ছোট আকারের সৌর-ব্যাটারি মাইক্রোগ্রিড বসানো যেতে পারে, যাতে লোডশেডিং হলেও অন্তত একটা ফ্যান চালু রাখা সম্ভব হয়। পাশাপাশি, ভার্সোভায় মানুষ যা নিজের তাগিদে করতে বাধ্য হয়েছেন— খোলা জায়গায় রাত কাটানো— তাকে আইন লঙ্ঘন বা বিশৃঙ্খলা হিসেবে গণ্য না করে, পুরসভাগুলি আগাম ‘রাত্রিকালীন শীতল আশ্রয়স্থল’-এর ব্যবস্থা করতে পারে। বন্যার সময়ে ত্রাণ শিবির খোলার মতো।

ষোড়শ অর্থ কমিশন তাপপ্রবাহকে জাতীয় বিপর্যয়ের মান্যতা দেওয়ার সুপারিশ করেছে। এই প্রেক্ষিতে রাষ্ট্রের প্রস্তুতি অন্তত তিনটি স্তরে গড়ে তোলা জরুরি: প্রথমত, শ্রমিকের মজুরি-সুরক্ষা এবং ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা; দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ ও নগর পরিকল্পনায় রাত-কেন্দ্রিক তাপ নিয়ন্ত্রণ পরিকাঠামো; এবং তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদে উষ্ণায়ন নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা। ভার্সোভার বালিতে যাঁরা ঘুমোচ্ছেন, তাপ আরও বাড়লে তাঁরা কোথায় যাবেন, সেই উত্তর খোঁজার সময় এসেছে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Heatwave Heatwave Alert Sixteenth Finance Commission Summer Season

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy