E-Paper

মেয়েদের অবাধ বাসযাত্রা

ভারতের বিভিন্ন শহরাঞ্চলে মহিলাদের যাতায়াতের প্রধান ভরসা আজও বাস। সম্প্রতি একটি অসরকারি সমীক্ষায় ধরা পড়েছে, কলকাতা এবং দুর্গাপুরের দশ জন মহিলার আট জনই (৮৩ শতাংশ) তাঁদের দৈনন্দিন চলাচলের জন্য বাসের উপর নির্ভর করেন।

কঙ্কণা দাস

শেষ আপডেট: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫২

পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচনের মরসুমে বরাবরের মতো এ বারও রাজনৈতিক দলগুলোর ইস্তাহারে জনকল্যাণমূলক প্রতিশ্রুতির ছড়াছড়ি— নগদ সাহায্য, সাময়িক সন্তুষ্টি দেওয়ার লড়াই। দীর্ঘমেয়াদে এমন ‘রেউড়ি’ বিতরণে ভাল হবে না মন্দ, সেই তর্কও চলছে। প্রশ্ন ওঠে, এমন কোনও প্রতিশ্রুতি কি নেই, যা ভোটারদের অনেকের কাছে আকর্ষণীয় হবে, আবার প্রচলিত ব্যবস্থায় জরুরি সংস্কারও আনতে পারে? আছে বইকি। অন্যান্য রাজ্যের দিকে তাকিয়ে মনে হয়, মহিলাদের জন্য বাসভাড়া সম্পূর্ণ মকুব করা হতে পারে এক রূপান্তরমূলক পদক্ষেপ।

ভারতের বিভিন্ন শহরাঞ্চলে মহিলাদের যাতায়াতের প্রধান ভরসা আজও বাস। সম্প্রতি একটি অসরকারি সমীক্ষায় ধরা পড়েছে, কলকাতা এবং দুর্গাপুরের দশ জন মহিলার আট জনই (৮৩ শতাংশ) তাঁদের দৈনন্দিন চলাচলের জন্য বাসের উপর নির্ভর করেন। কিন্তু যাতায়াত খরচ আজও তাঁদের কাছে ইচ্ছেমতো যাতায়াতের পথে এক মস্ত বাধা। কলকাতায় এক জন গৃহপরিচারিকাকে তাঁর মাসিক আয়ের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খরচ করতে হতে পারে স্রেফ কর্মস্থলে পৌঁছতে।

এই সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে, বাসের ভাড়া মকুব করা হলে কলকাতা ও দুর্গাপুরের যথাক্রমে ২৮ শতাংশ এবং ২৫ শতাংশ মহিলা বাসে যাতায়াত আরও বাড়িয়ে দেবেন। এটা স্রেফ শখের ভ্রমণ নয়— কলকাতার ২২ শতাংশ এবং দুর্গাপুরের ১৩ শতাংশ মহিলা জানিয়েছেন যে, যাতায়াত সস্তা হলে তাঁরা কাজে বা পড়াশোনার প্রয়োজনে আরও বেশি করে ঘর থেকে বেরোনোর কথা ভাবতে পারবেন। যাতায়াত ব্যবস্থা শ্রমবাজারের রূপরেখা নির্ধারণ করে। পরিবহণের খরচ যখন সাধ্যের মধ্যে এসে যায়, তখন মহিলাদের কেবল বাড়ির পাশে ছোটখাটো কাজে সীমাবদ্ধ থাকতে হয় না। তাঁরা দূরে গিয়ে ভাল বেতনের কাজ খোঁজার সাহস পান। সেই কাজের সঙ্গে দীর্ঘ দিন যুক্ত থাকতে পারেন।

তামিলনাড়ু ২০২১ সালের মে মাসে মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে সরকারি বাস সফরের প্রকল্প (বিডিয়াল পয়ানাম) চালু করে। এর পর থেকে রাজ্য সরকার এই প্রকল্পে বছরে গড়ে প্রায় ৩,৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করে চলেছে। প্রকল্প চালুর দু’বছর পর সে রাজ্যের ছ’টি শহরে করা এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে মহিলারা যথেষ্ট অর্থ সাশ্রয় করছেন। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মহিলা জানিয়েছেন যে তাঁরা প্রতি মাসে চারশো টাকার বেশি সাশ্রয় করছেন— যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই প্রকল্পের ৯০ শতাংশ সুবিধাভোগীর মাসিক আয় কুড়ি হাজার টাকার কম। সাশ্রয় হওয়া টাকা মেয়েরা পুষ্টিকর খাবার, চিকিৎসা এবং শিক্ষার জন্য ব্যয় করছেন।

কর্নাটকে ২০২৩ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে কংগ্রেস তার ইস্তাহারে ‘শক্তি’ প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর কর্নাটক সরকার থেকে এই প্রকল্পে বছরে প্রায় ৪,৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এর ফলে কর্মসংস্থানে উন্নতি হয়েছে চোখে পড়ার মতো— বেঙ্গালুরু এবং হুবলি-ধারওয়াড়ের প্রতি পাঁচ জন মহিলার মধ্যে এক জন জানিয়েছেন যে, তাঁদের কাজের সুযোগ বেড়েছে। টাকা বাঁচানোর জন্য মহিলারা প্রয়োজনীয় যাতায়াতে কাটছাঁট করেন না।

এগুলি স্রেফ ছোটখাটো আর্থিক সিদ্ধান্ত নয়। এ হল মহিলাদের যাতায়াত ব্যবস্থাকে রাজ্যের মূল পরিকাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারের অঙ্গীকার।

তবে কলকাতা ও দুর্গাপুরের মহিলাদের সমস্যা কেবল ভাড়ার অঙ্কে সীমাবদ্ধ নয়। নিরাপত্তার অভাব নিয়ে, এবং গন্তব্যে পৌঁছনোর প্রথম ও শেষ ধাপের মধ্যে সংযোগের অভাব নিয়েও উদ্বেগের কথা তাঁরা জানিয়েছেন। কেবল ভাড়া মকুব করলেই এই সমস্যা মিটবে না। বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি, নিয়মিত সময়ের ব্যবধানে বাস পাওয়া, খুব ভোরে এবং অনেক রাতেও বাস পাওয়া, কর্মীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ এবং মেয়েদের জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা, এ সবের জন্যেও বিনিয়োগ করতে হবে। অর্থাৎ ভাড়ার পাশাপাশি পরিষেবার মান এবং মহিলা-যাত্রীদের নিরাপত্তা উন্নত করতে হবে।

পুরুষদের তুলনায় মহিলাদের যাতায়াতের ধরনও ভিন্ন। মহিলারা বাড়ি থেকে বেরোলে প্রায়ই অনেকগুলি কাজ পর পর সেরে বাড়ি ফেরেন— সন্তানের দেখাশোনা এবং সংসারের নানা প্রয়োজনে গন্তব্যগুলি এক সঙ্গে জুড়ে নেন। প্রচলিত ভাড়া-কাঠামোয় এই ধরনের যাতায়াত অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। বিনামূল্যে বাস সফর সেই আর্থিক বোঝা অনেকটাই সরিয়ে দেয়।

পশ্চিমবঙ্গের মোট ভোটদাতার প্রায় অর্ধেকই হলেন নারী, ভোটকেন্দ্রে তাঁদের উপস্থিতির হার বরাবরই বেশি। যে নীতি মেয়েদের দৈনন্দিন খরচ সরাসরি কমাবে, পড়াশোনা বা কাজে যুক্ত হওয়ার সুযোগ প্রায় নিশ্চিত ভাবে বাড়াবে, তাঁদের শ্রম ও সময়ের মর্যাদা দেবে, তার রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। তামিলনাড়ু এবং কর্নাটকের অভিজ্ঞতা তার প্রমাণ।

মহিলাদের চলাচলের স্বাধীনতা কেবল প্রতীকী বিষয় নয়, তা কর্মক্ষেত্রে মেয়েদের যোগদানকে সহজ করে মেয়েদের রোজগার বাড়াবে, যা আর্থিক উন্নয়ন ও সামাজিক সাম্য আনার আবশ্যিক শর্ত। তাই মেয়েদের বাস ভাড়া মকুব করার প্রতিশ্রুতি কেবল ভোট জেতার তাস নয়— সমাজ ও অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bus Services Women transportation problem transportation system

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy