E-Paper

কার পৌষমাস, কার সর্বনাশ

শাসক দলের তরফে ইডি-র এই অভিযানকে রাজনৈতিক অভিসন্ধি ও প্রতিহিংসামূলক বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তাকে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।

তূর্য বাইন

শেষ আপডেট: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:৩২

হাওয়ালার মাধ্যমে কয়লা পাচারের টাকা বিনিয়োগ সংক্রান্ত মামলার তদন্তে সম্প্রতি আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাসভবন ও অফিসে তল্লাশির সময় ইডি-র আধিকারিকরা যে ভাবে বাধা পেয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় তা কেন্দ্র-রাজ্য দ্বৈরথের শামিল। ভোটকুশলী পরামর্শদাতা হিসেবে আইপ্যাক শাসক দলের কাছে যত গুরুত্বপূর্ণই হোক, তা একটি অসরকারি সংস্থা, দলীয় রাজনীতির সঙ্গে আপাত-সম্পর্করহিত। তাই ইডি-র আইপ্যাক-অভিযানের বিরোধিতায় অকুস্থলে স্বয়ং তৃণমূল সুপ্রিমো তথা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর উপস্থিতি ও সক্রিয়তা ঘিরে আলোড়ন তো হয়েছেই, শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোরও।

ইডি-র তরফে কলকাতা হাই কোর্টে দায়ের হওয়া মামলায় মুখ্যমন্ত্রীকে সরাসরি দায়ী করে অভিযোগ করা হয়েছে, তিনি ও তাঁর সঙ্গে আসা পুলিশকর্তারা প্রমাণ লোপাট, সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট, তল্লাশি পণ্ড ও সরকারি কাজে বাধাদান করেছেন। মুখ্যমন্ত্রী যে কিছু ফাইল ও বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম নিয়েছেন, তা সে দিনই সর্বসমক্ষে দেখান। প্রত্যাশিত ভাবে তৃণমূল ও আইপ্যাক-এর তরফেও কলকাতা হাই কোর্টে ইডি-র বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ জানিয়ে একাধিক মামলা হয়েছে। কলকাতায় তৃণমূলের বিক্ষোভ মিছিলে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেছেন, সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের চেয়ারপার্সন হিসেবে তিনি সেখানে গিয়েছিলেন এবং কোনও অন্যায় করেননি। তবে দলীয় ওই কর্মসূচিতে কেন বাহিনী-সহ বেশ ক’জন পুলিশকর্তা ও আমলা তাঁর সঙ্গে ছিলেন— বিরোধীদের এই প্রশ্নের ব্যাখ্যা অবশ্য অধরা।

তবে শুরু থেকেই শাসক দলের তরফে ইডি-র এই অভিযানকে রাজনৈতিক অভিসন্ধি ও প্রতিহিংসামূলক বলে যে দাবি করা হচ্ছে, তাকে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। যে কোনও নির্বাচনের আগে বিরোধী দলগুলির বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির অতিসক্রিয়তা সর্বজন বিদিত। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন সরকার এই তদন্তকারী সংস্থাগুলিকে নিয়ন্ত্রিত ও চালিত করে, এই অভিযোগ যেমন নতুন নয়, তেমনই বিরোধীদের কণ্ঠরোধের অস্ত্র হিসেবে এদের অপব্যবহারের অভিযোগও বার বার উঠেছে। সারদা, নারদা, রোজ় ভ্যালি ও আর জি কর কাণ্ডের মতো বেশ কিছু মামলায় এই সংস্থাগুলির দীর্ঘ নিদ্রা ও নির্বাচনী তিথিনক্ষত্র মেনে হঠাৎ হঠাৎ জেগে ওঠা দেখতে অভ্যস্ত এ রাজ্যের মানুষের কাছে এদের বিশ্বাসযোগ্যতা যেমন তলানিতে, তেমনই তাদের গাণিতিক দীর্ঘসূত্রতা ও হঠাৎ তৎপরতার প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে জনমনে স্থায়ী সন্দেহের জন্ম হয়েছে।

গত ৮ জানুয়ারি ইডি-র অভিযান পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, এ ক্ষেত্রেও অবৈধ কয়লা পাচার সংক্রান্ত আর্থিক দুর্নীতি এবং নানা সংস্থার মাধ্যমে প্রভাবশালীদের কালো টাকা বিনিয়োগের অভিযোগ প্রকাশ্যে এসেছিল ২০২০ সালে। তদন্তভার হাতে পাওয়ার পর এ বিষয়ে ইডি ২০২২-এ শেষ বারের মতো জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। তার পর কেটে গেছে তিনটি বছর। এখন, পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে ইডি-র এই তৎপরতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। একই সঙ্গে এই অভিযোগের রাজনৈতিক অভিঘাতও উপেক্ষণীয় নয়। ইডি-র এই অভিযান যে আদতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও প্রতিহিংসামূলক, রাজ্যবাসীর বৃহদংশের কাছে সেই সত্য প্রতীয়মান হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। আসন্ন নির্বাচনে এতে যে রাজ্যের শাসক দলই রাজনৈতিক ভাবে লাভবান হবে, সেও বোঝা সহজ।

পাশাপাশি প্রশাসনিক ও সামাজিক পরিসরেও এই ঘটনা সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। ইডি-র তল্লাশিকালে যে পরিচয়েই মুখ্যমন্ত্রী সেখানে গিয়ে থাকুন, সরাসরি সরকারি কাজে হস্তক্ষেপ ও তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগ যে আদতে আইন লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়ে, তা নিয়ে শুধু বিরোধীরা নয়, আইনি বিষয়ে ওয়াকিবহাল অনেকেই একমত। একই সঙ্গে সে দিন ইডি-র ভূমিকাও সন্দেহজনক। যথেষ্ট কেন্দ্রীয় বাহিনী থাকা সত্ত্বেও তল্লাশিকালে এক জন তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি এবং কিছু ফাইল, ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন ইত্যাদি নিয়ে বেরিয়ে আসার সময় তদন্তকারী সংস্থার আধিকারিকদের নীরব দর্শকের ভূমিকাটি কি গ্রহণযোগ্য? বিরোধী দলনেতা যতই তাঁদের এই নিশ্চেষ্টতাকে সরাসরি সংঘাত এড়ানোর কৌশল বলে সাফাই দিন, শেষাবধি তা যে কেন্দ্র-রাজ্য ‘বোঝাপড়া তত্ত্ব’-এই নতুন হাওয়া জোগাবে, বলার অপেক্ষা রাখে না।

ইডি, তৃণমূল ও প্রতীক জৈনের তরফে করা মামলাগুলির গুরুত্ব বিবেচনায় গত ৯ জানুয়ারি সবগুলির এক সঙ্গে শুনানির দিন ধার্য হয়েছিল, যথাসময়ে শুরুও। কিন্তু আদালতকক্ষে অতিরিক্ত ভিড় ও আইনজীবীদের একাংশের চিৎকার চেঁচামেচিতে কার্যত তা ভেস্তে যায়। প্রশ্ন উঠছে, এ-হেন আচরণ কি আদালত অবমাননার পর্যায়ে পড়ে না? আরও বড় প্রশ্ন উঠছে ইডি-র দায়ের করা মামলা নিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোয় এক জন মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে কতটা পদক্ষেপ করা সম্ভব তা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান। এ যেন শাঁখের করাত: এক দিকে আইনি ও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা,অন্য দিকে প্রকাশ্যে আইন লঙ্ঘনের পরেও পার পেয়ে যাওয়ার শঙ্কা। দ্বিতীয়টি ঘটলে ভবিষ্যতে অনেকেই অনুরূপ আইনভঙ্গে উৎসাহিত হবেন। প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা কি আরও কমবে না?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Enforcement Directorate I-Pac Mamata Banerjee

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy