জন্মান্ধের জীবনই কেটে যায় প্রগাঢ় অন্ধকারের সঙ্গে লড়াই করতে করতে। তবে যে অল্পবয়সি বা প্রাপ্তবয়স্ক আলোর পৃথিবী থেকে হঠাৎ আঁধারে ডুবে যান, তাঁদের অভিজ্ঞতা মহাকাব্যে, সাহিত্যে যৎসামান্যই আলোচিত। এই ঔদাসীন্য চোখে লাগে। কারণ, বাস্তব জীবনে মানুষের সার্বিক আয়ুবৃদ্ধির পাশাপাশি রোগজনিত অন্ধত্ব বাড়ছে। ভারতীয় মহাকাব্যে অন্ধত্বের উল্লেখ বহুল না-হলেও বিরল নয়। রামায়ণ-এর শ্রবণকুমারের বাবা ও মা অন্ধ, তবে জন্মান্ধ কি? মহাভারত-এর জন্মান্ধ ধৃতরাষ্ট্র অমর চরিত্র।
সাহিত্যের দরবারে অন্ধত্বের প্রতিনিধিত্ব গৌণই, তার মধ্যেও শ্রদ্ধা, সহমর্মিতা কমই। সহমর্মিতা থাকলে ‘অন্ধের হস্তী দর্শন’ আখ্যানটি হয়তো অন্য ভাবে বর্ণিত হতে পারত। ইন্দ্রিয়গত সীমাবদ্ধতা এই নীতিকথায় এমন ভাবে ব্যবহৃত যে, মনে হতেই পারে দৃষ্টিহীন মানুষকে বিদ্রুপ করা হচ্ছে। ইংরেজি ছড়া ‘থ্রি ব্লাইন্ড মাইস’-এ তিনটি অন্ধ অসহায় প্রাণীকে নিয়ে অহেতুক কৌতুক আরও নিদারুণ নিষ্ঠুরতা। অন্ধ ইঁদুর তিনটি কৌতূহলভরে কৃষক-গৃহিণীকে অনুসরণ করায় তিনি ধারালো বাঁকা ছুরি দিয়ে লেজ কেটে দিয়েছেন। সভ্য, সাদা মানুষের বিকৃত রুচিবোধ, পরিহাসবোধকে ধিক্কার। লক্ষণীয়, ছড়াটি ব্যবহৃত হয়েছিল আগাথা ক্রিস্টির দ্য মাউসট্র্যাপ নাটকে, যেখানে শৈশবে পালক-পিতামাতার দ্বারা তিন ভাই-বোন অত্যাচারিত হয়েছিল।
১৮৭৭-এ বঙ্কিমচন্দ্রের রজনী উপন্যাসটি প্রকাশিত হয় নতুন আঙ্গিকে। নায়িকা রজনী এক জন্মান্ধ ফুলওয়ালি। বোঝা যায়, লেখক এই জটিল বিষয়গুলি নিয়ে যথেষ্ট চর্চা করেছিলেন। এক জন্মান্ধের শ্রবণ এবং স্পর্শ তার দৃষ্টিহীনতার পরিপূরক— উপন্যাসে অতি সততায় রূপায়িত। অন্ধ চোখের কটাক্ষ নিয়ে বঙ্কিমের মন্তব্য লক্ষণীয়। যেমন, অতি সুন্দর চক্ষু কিন্তু কটাক্ষ নেই। শচীন্দ্রের মতে রজনী সুন্দরী কিন্তু জন্মান্ধ, তার সৌন্দর্যের সঙ্গে ইন্দ্রিয়ের যোগ নেই। সুন্দরী কিন্তু কটাক্ষহীন রজনী অলৌকিক প্রক্রিয়ায়, সাধুবাবার ইন্দ্রজালে ‘বিদ্যুৎকটাক্ষবর্ষিণী’-তে রূপান্তরিত হয়। ষোলো কলা পূর্ণ। আবার, ১৯৩১-এ মুক্তিপ্রাপ্ত চার্লি চ্যাপলিনের সিটি লাইটস (ছবিতে একটি দৃশ্য)-এ আরও এক অন্ধ ফুলওয়ালিকে দেখি। ছবিতে অন্ধ ফুলওয়ালির কটাক্ষের অপেক্ষায় না-থেকে এক ভাঁড় হঠাৎ বিপুল বিত্ত পেয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। মেয়েটি ব্যয়বহুল শল্যচিকিৎসায় দৃষ্টি ফিরে পায়।
অনস্বীকার্য যে ক্রোধ, প্রেমের হিল্লোল, অভিমানের বিধুরতা, অনুরাগের অঞ্জন, বিষাদের গ্লানিচ্ছায়া— চোখের তারায় প্রতিফলিত। তাই দৃষ্টিহীনের ভাষারিক্ত চোখের তারায় আলো-আঁধারের আনন্দবিপ্লব সঞ্চারণের সম্ভবনা নেই। শঙ্খ ঘোষ তাঁর ‘অন্ধের স্পর্শের মতো’ নিবন্ধে চোখের বাঙ্ময়তাকে বলেছিলেন ‘সংযোগস্থাপন’ করা। শঙ্খবাবু বার বার এই ‘সংযোগ’-এর উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বাবা শেষ জীবনে দৃষ্টিহীন হয়ে যান, তিনি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসা মানুষের সঙ্গে শুধু স্পর্শের মাধ্যমে ‘সংযোগ’ করতে চাইতেন, হাত ধরে বসে থাকতেন। শঙ্খ ঘোষের দেখা রক্তকরবী নাটকের কুশীলবেরা সবাই দৃষ্টিহীন। তাঁরা অভিনয়ের শেষে একটু স্পর্শের আশায়, সংযোগের অভিলাষে হাত বাড়িয়ে দেন দর্শকদের দিকে। সিটি লাইটস-এর অন্ধ ফুলওয়ালি তার দৃষ্টি ফিরে আসার পর ভাগ্যবিপর্যয়ে সব খোয়ানো, জেল-খাটা সেই বিবর্ণ ভাঁড়কে শুধু স্পর্শের মাধ্যমে চিনে নেয়। রজনী যেমন কান পেতে থাকে প্রেমিক শচীন্দ্রের পদশব্দের জন্য, রবীন্দ্রনাথের ফাল্গুনীর অন্ধ বাউল ঠিক তেমনই ‘সব দিয়ে শোনে, শুধু কান দিয়ে নয়’। এই বাউল ‘চোখ দিয়ে দেখে না বলেই সে তা’র দেহ মন প্রাণ সমস্ত দিয়ে দেখে’। তার ‘দেখা’কে অনুভব করতে, রবীন্দ্রনাথ নিজেই সেই ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। সহমর্মিতা ও আত্মপ্রত্যয় দিয়ে সৃষ্টি করেছিলেন ফাল্গুনীর অন্ধ বাউলকে।
বাস্তবে ঠিক তেমনই ক্ষীণদৃষ্টির বিনোদবিহারীকে শান্তিনিকেতনে তিনি অঙ্গীভূত করেছিলেন। আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার এক অনন্য স্রষ্টা ও পুরোধা বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের ক্রমে পুরোপুরি অন্ধকারের রাজত্বে চলে যাওয়ার সঙ্গে আপসহীন লড়াইয়ের বিবরণ বিশেষ ভাবে সক্ষমদের জন্য এক নবজীবন-পাঠশালা। ক্ষয়িষ্ণু চোখের জ্যোতির সঙ্গে বিনোদবিহারীর মোকাবিলা ছিল জীবনভর। নিজেকে প্রতিনিয়ত পাল্টেছেন। জলরঙে, তেলরঙে, ম্যুরালে, কখনও কোলাজে নিজেকে প্রকাশ করতে, সংযোগ স্থাপনে তাঁর পথচলা থেমে থাকেনি। অন্ধত্বের সঙ্গে তাঁর এই বাঁচার লড়াই কুড়ি মিনিটের দি ইনার আই নামক তথ্যচিত্রে সত্যজিৎ রায় তুলে ধরেছেন। ছাত্র সত্যজিৎকে বিনোদবিহারী বলেছিলেন, বিস্তীর্ণ খোয়াইয়ের মধ্যে একটি একক তালগাছের মধ্যেই তাঁকে খুঁজে নিতে। বিনোদবিহারীর জীবন, তাঁর বই চিত্রকর, কর্তাবাবা প্রতিটি ক্ষীণদৃষ্টি মানুষের অবশ্যপাঠ্য।
বিনোদবিহারী ৫০ পেরিয়ে, শিল্পীজীবনের মধ্যগগনে সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে গেলেন। বিশ্ব জুড়ে মানুষের গড়-আয়ু বৃদ্ধির ফলে ৫০ এখন আর বার্ধক্যের সূচনালগ্ন নয়। কিন্তু বেড়েছে দৃষ্টিশক্তির সমস্যা যার আক্রমণ তীব্র হচ্ছে জীবনের মধ্যাহ্ন, অপরাহ্ণে। গ্লুকোমা, ডায়াবিটিস আর ম্যাকুলার ডিজেনারেশন জন্ম দিচ্ছে অন্ধত্বজনিত একাকিত্বের। ডাক্তাররা আছেন। কিন্তু অন্ধকারে একলা পথ চলাকে সহনীয় করার জন্য মানসিক পুষ্টি কে জোগাবে? দৃষ্টিহীনের জীবনে আঘাত ও আশঙ্কা বহু রূপে হানা দেয়— অন্ধত্বের ভয়, ক্ষীণদৃষ্টির অসহায়তা, অসংখ্য ওষুধ ও ইনজেকশনের নিয়ত প্রস্তুতি। তাই সাহিত্যে, চলচ্চিত্রে আঁধারে পড়ে থাকা এই মানুষদের প্রতিনিধিত্ব একটু বাড়ুক। আর, সবার আশ্রয় হোক ফাল্গুনীর অন্ধ বাউলের মন্ত্র: ‘অন্ধকারের বুকের মধ্যে আলো’। সেই আলোই পথ দেখাবে, সংযোগ স্থাপন করবে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)