E-Paper

অথচ ভোটাররা ‘অবৈধ’

জ্ঞানেশ কুমার যেন বোঝাতে চেয়েছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এর কাজ এখন দেশের সর্বোচ্চ আদালত নিজের হাতে তুলে নিয়েছে।

প্রেমাংশু চৌধুরী

শেষ আপডেট: ২৩ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:০১
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

দিল্লির বিজ্ঞান ভবনে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের নির্ঘণ্ট প্রকাশের সাংবাদিক সম্মেলন হয়েছিল ১৫ মার্চ, রবিবার বিকেলে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় থাকা যে সব মানুষের ভোটার তালিকায় থাকা বা না-থাকার ফয়সালা হবে না, তাঁদের কী হবে?

জ্ঞানেশ কুমার যেন তৈরিই ছিলেন। বল ঠেলে দিলেন সুপ্রিম কোর্টের দিকে। উত্তর দিলেন, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী যে সব নামে অনুমোদন দেওয়া হবে, তাঁদের অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশ করে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় যোগ হবে।

জ্ঞানেশ কুমার যেন বোঝাতে চেয়েছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এর কাজ এখন দেশের সর্বোচ্চ আদালত নিজের হাতে তুলে নিয়েছে। প্রথমে জেলা স্তরের বিচারকদের বিবেচনাধীন ভোটারদের নথি খতিয়ে দেখার কাজে নামিয়েছে। তার পরে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নিয়ে আপিল ট্রাইবুনাল তৈরি করে দিয়েছে। সবটাই দেখাশোনা করছেন কলকাতা হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতি। নির্বাচন কমিশন এখন নিমিত্তমাত্র।

প্রশ্ন হল, যে এসআইআর-এর মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ ভোটারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, সেই এসআইআর কি সাংবিধানিক ভাবে বৈধ?

বিহারে এসআইআর বা ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন শুরুর পরেই সুপ্রিম কোর্টে এই প্রশ্ন তুলে মামলা দায়ের হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক এক্তিয়ারের বাইরে গিয়ে কাজ করছে। অর্থাৎ, গোটা এসআইআর প্রক্রিয়াটাই অসাংবিধানিক। সুপ্রিম কোর্টের সামনে এ ক্ষেত্রে একটিই দায়িত্ব থাকে। নির্বাচন কমিশন যাতে সাংবিধানিক গণ্ডির মধ্যে থেকে তার ক্ষমতা প্রয়োগ করে, তা নিশ্চিত করা। সে ক্ষেত্রে এসআইআর সাংবিধানিক না কি অসাংবিধানিক, তার বিচার করা ছিল প্রথম কাজ।

সুপ্রিম কোর্ট সে কাজ করেনি, এমন নয়। এসআইআর-এর সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে মামলায় দীর্ঘ সওয়াল-জবাব হয়েছে। শুনানির শেষে গত ২৯ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ রায় সংরক্ষিত রাখে।

তার পরে তিন মাস কাটতে চলেছে। এসআইআর প্রক্রিয়া সাংবিধানিক না অসাংবিধানিক, তার ফয়সালা এখনও ঘোষণা হয়নি। অথচ সুপ্রিম কোর্ট পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর-এর খুঁটিনাটি বিষয় শোধরানোর নির্দেশ জারি করেছে। এসআইআর যাতে সঠিক ভাবে রূপায়ণ হয়, সেই চেষ্টা করেছে।

কেন? বিচারপতিদের কথা অনুযায়ী, রাজ্য সরকার ও নির্বাচন কমিশন— দুই সাংবিধানিক সংস্থার মধ্যে ‘বিশ্বাসের অভাব’-এর ফলে সুপ্রিম কোর্টকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে।

এতৎসত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গের লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটার যে এ বার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না, তা এখন স্পষ্ট। অথচ এসআইআর-এর নিজের সাংবিধানিক বৈধতারই এখনও ফয়সালা হয়নি।

সুপ্রিম কোর্ট এসআইআর-এর কাজে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তাঁদের উপরে দায়িত্ব ছিল, পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকার ‘বিবেচনাধীন’ তালিকায় থাকা প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষের নথি খতিয়ে দেখা। তাঁরা সকলেই ২০০২-এর ভোটার তালিকায় ছিলেন। তা সত্ত্বেও তাঁদের নিজেদের ভোটার হিসেবে যোগ্যতা প্রমাণ করতে নথিপত্র জমা দিতে হয়েছে।

এসআইআর-এর সাংবিধানিক বৈধতার মামলায় ঠিক এ নিয়েই প্রশ্নটা উঠেছিল। সুপ্রিম কোর্ট ১৯৯৫ সালে ‘লাল বাবু হুসেন বনাম নির্বাচনী রেজিস্ট্রেশন অফিসার’ মামলায় স্পষ্ট নীতি তৈরি করে দিয়েছিল, আগে ভোটার তালিকায় কারও নাম থাকলে তিনি বৈধ ভোটার বলে ধরে নিতে হবে। ভোটার তালিকায় নাম থাকা কোনও ব্যক্তিকে অবৈধ ভোটার হিসেবে অভিযোগ করা হলে, তা প্রমাণের দায়ও সেই অভিযোগকারীর। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের। সুপ্রিম কোর্টেরই তৈরি এই নীতি এসআইআর-এ উল্টে গিয়েছিল বলে অভিযোগ। কারণ ভোটারদের উপরে তাঁর ভোটার হিসেবে যোগ্যতা প্রমাণের দায় চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এমন নয় যে সুপ্রিম কোর্ট এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি। বা নির্বাচন কমিশনের পরস্পর বিরোধী অবস্থান সুপ্রিম কোর্টের নজর এড়িয়ে গিয়েছে। গত ১৩ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট মন্তব্য করেছিল, বিহারের এসআইআর মামলার সময় নির্বাচন কমিশনের অবস্থান ছিল, যাঁরা ২০০২-এর ভোটার তালিকায় রয়েছেন, তাঁদের আর কোনও নথি জমা দিতে হবে না। কমিশনের বিহারের এসআইআর নির্দেশিকা ও পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর নির্দেশিকার মধ্যে কোনও ফারাক নেই। অথচ, পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর-এ এসে নির্বাচন কমিশন ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’ নামের নতুন বিবেচনা-ভিত্তি তৈরি করে। ২০০২-এর তালিকায় থাকা ভোটারদের থেকেই নথি দাবি করে। বিহারের এসআইআর মামলায় সুপ্রিম কোর্ট লিখিত ভাবে যে যুক্তি পেশ করেছিল, সেখান থেকে কমিশন সরে গিয়েছে বলে বিচারপতিদের পর্যবেক্ষণ সত্ত্বেও সুপ্রিম কোর্ট এসআইআর-এর কাজে কোনও স্থগিতাদেশ জারি করেনি।

বিবেচনাধীন ৬০ লক্ষ ভোটারের মধ্যে ২৭ লক্ষ বাদ পড়েছেন। বিপুল সংখ্যক ভোটারকে বাইরে রেখে যদি নির্বাচন হয়, তা হলে ভোটের ফলে কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সুপ্রিম কোর্ট। বিচারপতিরা প্রশ্ন করেছেন, কোথাও যদি হারজিতের ব্যবধান ২ শতাংশ হয়, এবং ১৫ শতাংশ ভোটার ভোট দিতে না পারেন, তখন কী হবে!

সত্যিই তো। কী হবে? নির্বাচনের পরে কি ভোটের ফলাফলের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে? উত্তর মেলেনি।

সুপ্রিম কোর্ট নিজেই মেনে নিয়েছে, বহু বৈধ ভোটার এ বার ভোট দিতে পারবেন না। তবে তাঁদের ভোটাধিকার যাতে পাকাপাকি ভাবে না চলে যায়, তার জন্য ট্রাইবুনাল তৈরি হয়েছে। কিন্তু সেই ট্রাইবুনালে জমা পড়া সিংহভাগ আবেদনের ভোটের আগে ফয়সালা হবে না। ৩৪ লক্ষের বেশি আবেদনের মধ্যে প্রথম দফায় ভোটের আগে মাত্র ১৩৮টির ফয়সালা হয়েছে। বাদ যাওয়া ২৭ লক্ষ মানুষের মধ্যে মাত্র ১৩৬ জন ট্রাইবুনালে ছাড়পত্র পেয়ে প্রথম দফায় ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন।

সুপ্রিম কোর্ট মেনে নিয়েছে, বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের যে স্বল্প সময়ের মধ্যে ‘বিবেচনাধীন’ ভোটারদের নথি খতিয়ে দেখতে হয়েছে, সেখানে ৭০ শতাংশ নিখুঁত সিদ্ধান্ত হলেই সেটা অনেক। অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টই মানছে, ৬০ লক্ষ নামের মধ্যে ৩০ শতাংশ ক্ষেত্রে, ১৮ লক্ষ ভোটারের যোগ্যতা নির্ণয়ে ভুল হতেই পারে। সেই ভুল শোধরাতে সাধারণ মানুষকে ট্রাইবুনালে ছুটতে হচ্ছে। এ দিকে ট্রাইবুনালের ফয়সালা হতে হতে ভোট চলে যাবে। প্রশ্ন ওঠে, এত কম সময়ের মধ্যে বিধানসভা ভোটের ঠিক আগে এসআইআর করার অনুমতি নির্বাচন কমিশনকে দেওয়া হল কেন?

নির্বাচন কমিশন পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের মাত্র চার মাস আগে এসআইআর-এর কাজ শুরু করেছিল। সুপ্রিম কোর্টে প্রথমেই অভিযোগ উঠেছিল, এসআইআর-এর কাজ এত কম সময়ের মধ্যে করা সম্ভব নয়। বিধানসভা নির্বাচন আগের ভোটার তালিকা মেনে হোক। এসআইআর-এর কাজ সময় নিয়ে হোক। সুপ্রিম কোর্ট সেই অনুরোধ শোনেনি।

হতে পারে, সুপ্রিম কোর্ট নিজেই সাংবিধানিক সংস্থা হিসেবে আর একটি সাংবিধানিক সংস্থা নির্বাচন কমিশনের কাজে বাধা দিতে চায়নি।

আবার এ-ও সত্যি, এসআইআর-এর সাংবিধানিক বৈধতার ফয়সালা হওয়ার আগেই এক ডজন রাজ্যে এসআইআর-এর কাজ শেষ করে ফেলেছে নির্বাচন কমিশন। এর পরে সুপ্রিম কোর্ট যদি এসআইআর সাংবিধানিক ভাবে অবৈধ বলে রায় দেয়, তা হলে কী হবে?

শুধু এসআইআর-এর সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্ন নয়। এর সঙ্গে সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনকে কতখানি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, সেই প্রশ্নও জড়িত। সাংবিধানিক সংস্থার স্বাধীনতা ও তার নির্দিষ্ট ভূমিকা পালনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্ন রয়েছে। নির্বাচনী বিধি তৈরির ক্ষেত্রে সংসদের এক্তিয়ারের প্রশ্ন রয়েছে। প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা বজায় থাকছে কি না, সেই প্রশ্ন রয়েছে। সর্বোপরি, নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের অধিকারের প্রশ্ন রয়েছে।

যে এসআইআর-এরই সাংবিধানিক বৈধতার সঙ্গে এত সব প্রশ্ন ঝুলে রয়েছে, তার মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ ভোটারের বৈধতা নিয়ে কী ভাবে প্রশ্ন তোলা যায়? উত্তর মেলেনি।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

SIR Gyanesh Kumar

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy