E-Paper

নীরবতার সংস্কৃতির দিকে?

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলিতে এই প্রশ্নের কোনও সরল উত্তর নেই। কারণ রাষ্ট্র এক দিকে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা চায়, অন্য দিকে গণতন্ত্রের ভিত্তিই দাঁড়িয়ে থাকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর।

সৌম্য শাহীন

শেষ আপডেট: ০৮ জুন ২০২৬ ০৮:৫০

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকারি কর্মচারীর ভূমিকা নিয়ে একটি পুরনো কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক রয়েছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, অধ্যাপক, আমলা কি কেবল সরকারের প্রশাসনিক যন্ত্রের অংশ, না কি একই সঙ্গে সংবিধানপ্রদত্ত অধিকারসম্পন্ন এক জন স্বাধীন নাগরিকও? রাষ্ট্রের প্রতি তাঁর আনুগত্যের সীমা কোথায় শেষ, আর নাগরিক স্বাধীনতার পরিসর কোথায় শুরু?

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলিতে এই প্রশ্নের কোনও সরল উত্তর নেই। কারণ রাষ্ট্র এক দিকে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা চায়, অন্য দিকে গণতন্ত্রের ভিত্তিই দাঁড়িয়ে থাকে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর। ফলে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও নাগরিক স্বাধীনতার মধ্যে এক ধরনের অন্তর্নিহিত টানাপড়েন সর্বদাই কাজ করে। কিন্তু ইতিহাস দেখায়, যখনই কোনও রাষ্ট্র শৃঙ্খলা বা জাতীয় স্বার্থের নামে মতপ্রকাশের ক্ষেত্র সঙ্কুচিত করতে শুরু করে, তখন বিষয়টি আর নিছক প্রশাসনিক থাকে না; তা দ্রুত রাজনৈতিক চরিত্র ধারণ করে।

পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই পুরনো বিতর্কই নতুন ভাবে সামনে এসেছে। সরকারি কর্মচারী, শিক্ষক, অধ্যাপক এবং রাষ্ট্রপোষিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের মতপ্রকাশ নিয়ে প্রশাসনিক সতর্কবার্তা, সংবাদমাধ্যমে কথা বলা নিয়ে নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত, সমাজমাধ্যমে রাজনৈতিক মন্তব্য নিয়ে অস্বস্তি— এই সব মিলিয়ে রাজ্যে এক নতুন রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। সরকার আনুষ্ঠানিক ভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করার কথা অস্বীকার করলেও, বিরোধী মহল এবং নাগরিক সমাজের একাংশ মনে করছে প্রশাসনিক ভাষার আড়ালে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে ‘নীরবতার সংস্কৃতি’।

এই আশঙ্কাকে হালকা ভাবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ মতপ্রকাশের উপর নিয়ন্ত্রণ সব সময় সরাসরি নিষেধাজ্ঞা হিসেবে আসে না। অনেক সময় রাষ্ট্র এমন এক আবহ তৈরি করে, যেখানে মানুষ নিজেই নিজের কণ্ঠস্বরকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখে। রাজনৈতিক তত্ত্বে একে বলা হয় ‘সেল্ফ সেন্সরশিপ’ বা আত্ম-নিয়ন্ত্রিত নীরবতা। এই নীরবতা দৃশ্যমান নয়, কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর। এক জন শিক্ষক তখন ক্লাসে কোনও রাজনৈতিক উদাহরণ দেওয়ার আগে ভাবেন। এক জন অধ্যাপক প্রবন্ধ লেখার আগে দ্বিধায় পড়েন। সরকারি কর্মচারী সমাজমাধ্যমে মতামত প্রকাশের আগে নিজের চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা করেন। রাষ্ট্রের সবচেয়ে সফল নিয়ন্ত্রণ সেখানেই— যেখানে আর কাউকে চুপ করাতে হয় না, মানুষ নিজেই চুপ হয়ে যায়।

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট কিন্তু বহু বার বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে এসেছে। ১৯৬২ সালের কামেশ্বর প্রসাদ বনাম স্টেট অব বিহার মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল— সরকারি কর্মচারীরা চাকরিতে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে মোটেই তাঁদের মৌলিক অধিকার হারান না। বিহার সরকার সরকারি কর্মচারীদের সব ধরনের বিক্ষোভ কর্মসূচি নিষিদ্ধ করে দিলে বিচারপতিরা স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, শান্তিপূর্ণ মতপ্রকাশ গণতন্ত্রের অংশ।

একই বছরে ও কে ঘোষ বনাম ই এক্স জোসেফ মামলায় আদালত আরও এক ধাপ এগিয়ে বলে— শৃঙ্খলা ও স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অর্থাৎ রাষ্ট্র প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারে, কিন্তু সেই অজুহাতে নাগরিক স্বাধীনতাকে সম্পূর্ণ খর্ব করতে পারে না।

সর্বোচ্চ আদালতের পর্যবেক্ষণগুলি আজ বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা বর্তমান ভারতে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, যেখানে রাষ্ট্রের সমালোচনাকে সহজেই জাতিবিরোধিতা বা দেশদ্রোহিতা-র সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়। বিজেপির বৃহত্তর রাজনৈতিক দর্শনের মধ্যেও এই প্রবণতা স্পষ্ট। জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্র করে একটি সাংস্কৃতিক ঐক্য নির্মাণের প্রচেষ্টা দীর্ঘ দিন ধরেই চলছে। সেই প্রক্রিয়ায় ভিন্ন মতকে গণতন্ত্রের স্বাভাবিক উপাদান হিসেবে না দেখে, অনেক সময় ‘সমস্যা’ হিসেবে দেখানো হয়।

বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে ঘিরে উদ্বেগ আরও গভীর। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় কেবল চাকরি করার জায়গা নয়; বিশ্ববিদ্যালয় মূলত প্রশ্ন তোলার জায়গা। ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্ক রয়েছে। ঔপনিবেশিকবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে শ্রমিক আন্দোলন, নারীবাদ, দলিত রাজনীতি, ভাষা আন্দোলন— সর্বত্র ছাত্র-শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ফলে ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি সব সময় বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে। দেশের নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিমধ্যেই দেখা গেছে— অধ্যাপকদের বিরুদ্ধে শো-কজ়, ছাত্র আন্দোলনের উপর কড়াকড়ি, সোশ্যাল মিডিয়ায় নজরদারি, সেমিনারের বিষয়বস্তু নিয়ে হস্তক্ষেপ, এমনকি পাঠ্যক্রম পুনর্লিখনের প্রচেষ্টা।

এই পরিস্থিতিতে ২০১৫ সালের শ্রেয়া সিঙ্ঘল বনাম ইউনিয়ন অব ইন্ডিয়া মামলার পর্যবেক্ষণ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৬৬এ ধারা বাতিল করতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল— অপ্রিয় বা সরকারের অপছন্দের মতামতও গণতন্ত্রে সুরক্ষিত। সরকারি ভাষার মারপ্যাঁচে মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণ গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। এই রায় আজ আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।

১৯৮৯ সালের এস রঙ্গরাজন বনাম পি জগজীবন রাম মামলায় সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ প্রণিধানযোগ্য। কোর্ট এখানে বলে শুধুমাত্র সরকারের অস্বস্তি বা সংখ্যাগরিষ্ঠের অপছন্দ কোনও মতপ্রকাশ দমনের কারণ হতে পারে না। গণতন্ত্রে প্রতিবাদ কোনও ব্যতিক্রম নয়; বরং প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরই গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি।

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে, বাম আমলে দলীয় প্রভাব, তৃণমূল আমলে বিরোধী কণ্ঠস্বরের উপর চাপ— এই সব অভিযোগ অতিপরিচিত। কিন্তু সেই অতীত বর্তমানের জন্য বৈধতা হতে পারে না। গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি শাসকের প্রশংসায় নয়, বরং বিরোধিতার নিরাপত্তায়। যে সমাজে মানুষ ভয় ছাড়া কথা বলতে পারে না, সেখানে নির্বাচন থাকলেও গণতন্ত্র আসলে ফাঁপা ও ফাঁকা। আর যে রাষ্ট্র তার শিক্ষক, অধ্যাপক বা সরকারি কর্মচারীর কণ্ঠস্বরকে সন্দেহ করতে শুরু করে, সে রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত সমগ্র সমাজকেই সন্দেহ করতে শেখে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Government Employees

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy