E-Paper

নির্বাসিতের দিনলিপি

উনিশ শতকের শেষ ভাগ এবং বিশ শতকের গোড়ায় ময়মনসিংহ-সহ পূর্ববঙ্গের নানা অঞ্চল থেকে হাজার হাজার বাঙালি মুসলমান নিম্ন অসমে গিয়ে বসতি গড়েছিলেন।

জয়দীপ বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ০৬ জুন ২০২৬ ০৭:২৯

১৮৯২ সালে রুশ লেখক আন্তন চেকভ-এর প্রকাশিত বিখ্যাত গল্প ‘ইন এগজ়াইল’-এর পটভূমি জ়ার-শাসিত রাশিয়া। ধুধু বরফে ঢাকা সাইবেরিয়া, এক নদী— যার নাম ইয়েনিসেইও হতে পারে, অন্য কিছুও হতে পারে— আর দীর্ঘ নির্বাসনে ক্লান্ত, নির্বিকার, প্রত্যাশাহীন এক বৃদ্ধ। গল্পের নামমাত্র চরিত্র সে। ষাটোর্ধ্ব সেমিয়ান। বাইশ বছর ধরে নির্বাসনে আছে। তার আর কোনও আশা নেই, কোনও অভিমান নেই, কোনও প্রতীক্ষা নেই।

সাইবেরিয়ার নির্বাসিতেরা তাকে আড়ালে ‘সবজান্তা’ বলে ডাকে। এক তরুণ তাতার সহবন্দিকে সে নানা গল্প শোনায়। তার মধ্যে আছে ভ্যাসিলি সের্গেইচের গল্প। এক বনেদি রুশ অভিজাত, যিনি নথি জালিয়াতির অভিযোগে দণ্ডিত হয়ে সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত হন। প্রথম দিকে ভ্যাসিলি নির্বাসনকে ‘নির্বাসন’ বলে মনে করেননি। বরং ভেবেছিলেন, এখানেও তো জীবন গড়া যায়। জমি কিনেছিলেন, বাড়ি বানিয়েছিলেন, ঘোড়ায় চড়ে দূর দূরান্তে ঘুরে বেড়াতেন, নদীতে মাছ ধরতেন। গর্ব করে বলতেন, তিনি আর অভিজাত নন, নতুন বসতি স্থাপনকারী। নিজের শ্রমে নতুন জীবন গড়ছেন।

ভ্যাসিলির সেই আত্মপ্রত্যয়ের মধ্যে অন্য এক ইতিহাসের প্রতিধ্বনি শোনা যায়। উনিশ শতকের শেষ ভাগ এবং বিশ শতকের গোড়ায় ময়মনসিংহ-সহ পূর্ববঙ্গের নানা অঞ্চল থেকে হাজার হাজার বাঙালি মুসলমান নিম্ন অসমে গিয়ে বসতি গড়েছিলেন। ব্রহ্মপুত্রের চরকে আবাদযোগ্য জমিতে পরিণত করেছিলেন তাঁরা। বহু মানুষ জনশুমারিতে নিজেদের মাতৃভাষা বদলে অসমিয়া লিখিয়েছিলেন। কেউ পরিচয় জানতে চাইলে বলতেন, ‘আমরা অহইম্যা।’ তাঁদেরও মনে হয়েছিল, এই তো বেশ। এখানে থাকা যায়, বাঁচা যায়, ভবিষ্যৎ গড়া যায়।

কিন্তু নির্বাসনকে নিজের বাড়ি বলে বিশ্বাস করার একটা সীমা আছে। ভ্যাসিলিও শেষ পর্যন্ত পারেননি। এক সময় তাঁর ভিতরে অস্থিরতা জন্মায়। ফিরে যেতে চান। পালানোর চেষ্টা করেন। ধরা পড়েন। মার খান। ফিরিয়ে আনা হয় সাইবেরিয়ায়।

এই গল্প বলতে বলতে সেমিয়ান বার বার একটাই কথা বলে— “আমার কিছুই চাই না। আমি ঘাস খেয়ে থাকতে পারি। মুক্তিও চাই না।” তার মতে, নির্বাসিতের সবচেয়ে বড় ভুল হল আশা করা। সুখী থাকতে চাইলে আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে হবে। প্রত্যাশা ত্যাগ করতে হবে। নিজের ভাগ্যকে মেনে নিতে হবে।

চেকভের গল্প পড়ে আমাদের বরাবর বিস্ময় জেগেছে। এক জন মানুষ কী করে নিজের জীবনকে এমন ভাবে নির্বাসনের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে পারে? দুঃখ না থাক, ক্ষোভও থাকবে না? স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাও থাকবে না? কারাগারে বন্দি মানুষ কি কখনও মুক্তির স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দেয়? জেলখানা ভেঙে পালানোর গল্প আমরা শুনেছি। গুলিতে মরার গল্পও শুনেছি। কিন্তু বন্দিত্বকে ভালবেসে ফেলার গল্প শুনলে তা অস্বাভাবিকই মনে হয়। সেই কারণেই সেমিয়ানের চেয়ে ভ্যাসিলি আমাদের বেশি মানবিক বলে মনে হয়। ব্যর্থ হলেও তিনি অন্তত পালাতে চেয়েছিলেন।

কিন্তু চেকভের গল্প থেকে বর্তমান সময়ে ফিরলে সেমিয়ানকে আর ততটা অচেনা লাগে না।

রাষ্ট্র ও রাজনীতি যখন ধীরে ধীরে এমন এক বাস্তব তৈরি করে, যা প্রথমে অস্বাভাবিক বলে মনে হয়, তখন নাগরিক সমাজ তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চায়। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে যদি সেই বাস্তবই স্থায়ী হয়ে ওঠে, তখন মানুষ মানিয়ে নিতে শেখে। এক সময় সে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, এটাই স্বাভাবিক। এটাই নিয়তি। এটাই ‘নিউ নর্মাল’।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত এক বন্দি প্রথম দিকে দিন গোনে। অন্ধকার সেলের মেঝেতে খড়ি দিয়ে দাগ কাটে। আলো উঠল, আলো নামল— দিন বাড়তে থাকে। তার পর এক সময় আর দাগ কাটার জায়গা থাকে না। দিন গোনারও আগ্রহ থাকে না। ক্লান্তি তাকে গ্রাস করে। সেই ক্লান্তির ভিতরেই সে বন্দিত্বের সঙ্গে আপস করে ফেলে। কোনও এক দিন, কিংবা কোনও এক রাতে, সে আবিষ্কার করে যে, যে বাস্তবকে সে এক দিন ঘৃণা করত, আজ সেটিকেই স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে।

মেঘমালা দে মহন্তর ‘ডি-মানুষ’ গল্পের মিনারা বেগমের কথা মনে পড়ে। ডিটেনশন ক্যাম্প থেকে মুক্তি পাওয়ার পরেও সে বাড়ি ফিরতে চায় না। দীর্ঘ বন্দিত্ব তার চেতনাকে এমন ভাবে বদলে দিয়েছে যে, মুক্তিই তার কাছে অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে।

বরাক উপত্যকার বাঙালির বর্তমান অবস্থাকে অনেক সময় এই সব চরিত্রের মধ্য দিয়ে ভাবতে ইচ্ছে করে। পার্থক্য একটাই। সেমিয়ান জানত যে, সে নির্বাসিত। মিনারা জানত যে, সে বন্দি। কিন্তু বরাকের বহু মানুষ হয়তো আর তা জানেন না।

যে ভূখণ্ডে ভাষার অধিকারের জন্য মানুষ প্রাণ দিয়েছিলেন, সেখানে ভাষার প্রশ্ন আজ ক্রমশ প্রান্তে সরে যাচ্ছে। ধর্ম, পরিচয়, রাজনৈতিক আনুগত্য— সব কিছু মিলিয়ে ভাষাগত আত্মসচেতনতার জায়গা সঙ্কুচিত হচ্ছে। অথচ ১৯৬১ সালের ১৯ মে-তে যাঁরা প্রাণ দিয়েছিলেন, তাঁরা ভাষাকে ধর্মের নীচে রাখেননি। মাতৃভাষাকে তাঁরা অস্তিত্বের প্রশ্ন বলে মনে করেছিলেন।

আজ সেই ইতিহাসের দিকে তাকালে প্রশ্ন জাগে— ভাষা-শহিদদের উত্তরাধিকার আমরা কতটা ধারণ করছি?

এক সময় টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠানে এক সদ্য নির্বাচিত বিধায়ককে বলতে শোনা গিয়েছিল, তিনি প্রথমে হিন্দু, পরে বাঙালি। একই সন্ধ্যায় আবার তাঁকেই দেখা গেল ভাষা শহিদদের স্মরণসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে। সেখানে তিনি ভাষার অধিকারের প্রশ্নে আবেগপূর্ণ বক্তৃতা দিচ্ছেন। উপস্থিত শ্রোতারাও করতালিতে ফেটে পড়ছেন। এই দ্বৈততার মধ্যে কোনও অস্বস্তি আর কাজ করে না।

সম্ভবত এটাই সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। পরস্পরবিরোধী অবস্থান এখন আর বিরোধ বলে মনে হয় না। ভাষা এবং ধর্ম, অধিকার এবং আনুগত্য, স্মৃতি এবং বাস্তব— সব এক ধরনের আপসহীন মিশ্রণে গলে যাচ্ছে।

আর কে নারায়ণের ‘আ টাইগার ফর মালগুড়ি’-র রাজা নামের বাঘটির কথা মনে পড়ে। জঙ্গলের হিংস্র, স্বাধীন বাঘটি এক সময় খিদের চাপে আত্মসমর্পণ করে। বন্দিত্বকে মেনে নেয়। তারও মনে হয়— এই তো বেশ। এ ভাবেও থাকা যায়। বরাকের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনেক সময় সেই রাজার কথাই মনে করিয়ে দেয়। ভাষা-শহিদদের উপত্যকায় আজ ‘মব লিঞ্চিং’, নীতিপুলিশের হস্তক্ষেপ, বিভাজনের রাজনীতি কিংবা ভাষার চেয়ে ধর্মকে বড় করে দেখার প্রবণতা ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। যেন বন্দিশালার নিয়মাবলি মেনেই সবাই জীবনযাপন করছে।

সেমিয়ান বুড়োর মতো নিরাসক্ত, মিনারা বেগমের মতো অভ্যস্ত, কিংবা মালগুড়ির রাজার মতো আত্মসমর্পিত— এই তিনটি চরিত্র যেন এক জায়গায় এসে মিশে যায়।

আর তখন মনে হয়, নির্বাসনের ঠিকানা জেলের সেলের মেঝেতে যে খড়ির দাগ এক দিন গুনত, তা বহু আগেই মুছে গেছে।

অর্থনীতি বিভাগ, কাছাড় কলেজ, শিলচর

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Assam

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy