E-Paper

সম্ভাবনা ও সংশয়ের দোলাচলে

ধ্রুপদী কম্পিউটার বিজ্ঞানের ভাষায়, ‘এজেন্ট’ বলতে এমন সিস্টেম, যা তার পরিবেশ থেকে তথ্য নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করতে পারে।

বিশ্বরূপ সেনশর্মা

শেষ আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬ ০৮:০৮

আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন ‘এআই এজেন্ট’। প্রশ্নের উত্তর দেওয়া, লেখা তৈরি করা বা ভিডিয়ো বানানো নয়, এজেন্টরা এখন নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ করতে পারে। ধরুন, দার্জিলিং যাবেন। এআই ট্র্যাভল এজেন্ট আপনার বাজেট, পছন্দ, সময়-সুবিধা অনুযায়ী সফরসূচি বানাবে; টিকিট কাটবে, হোটেল বুক করবে, বিকল্প প্রস্তাবও দেবে। আবার কারখানায় যন্ত্রাংশ বিকল হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে, সেই সম্ভাবনা আগে থেকে বিশ্লেষণ করে যন্ত্রাংশ আনানোর ব্যবস্থাও করতে পারে। পরিস্থিতি বুঝে ধারাবাহিক সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং তা বাস্তবায়নে সক্ষম এজেন্টিক এআই।

ধ্রুপদী কম্পিউটার বিজ্ঞানের ভাষায়, ‘এজেন্ট’ বলতে এমন সিস্টেম, যা তার পরিবেশ থেকে তথ্য নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং সেই অনুযায়ী কাজ করতে পারে। এই অর্থে বিভিন্ন সফটওয়্যার এজেন্ট বহু বছর ধরেই ব্যবহৃত। রাতে ব্যাঙ্ক থেকে টাকা তুললে সতর্কবার্তা আসে— এও সফটওয়্যার এজেন্টের মাধ্যমেই হয়। আগে ব্যাঙ্ককর্মী ফোন করতেন; এখন কাজটি সফটওয়্যার করছে। কিন্তু এআই-চালিত নতুন প্রজন্মের এজেন্টরা তুলনামূলক ভাবে অনেক বেশি নমনীয়, অভিযোজিত, বহুমুখী। নির্দিষ্ট কিছু নির্দেশ দিলেই বিভিন্ন ওয়েবসাইট, তথ্যভান্ডার বা সফটওয়্যার সিস্টেম থেকে তথ্য সংগ্রহ করে পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারে। দার্জিলিং সফরের ক্ষেত্রেই, আপনার বাজেটের মধ্যে হোটেল না পেলে এজেন্ট হয়তো টিকিট কাটবে না; বিকল্প গন্তব্য বা তারিখের প্রস্তাব দেবে।

ব্যক্তিগত জীবনে এআই-এর ব্যবহার এখনও অনেকাংশে সীমিত হলেও, সফটওয়্যার শিল্প, গ্রাহক পরিষেবা, আর্থিক বিশ্লেষণ, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, এমনকি বিনোদন শিল্পেও এই প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। এআই নিয়ে যে বিপুল কর্মহানির আশঙ্কা— তার বড় অংশই এই এজেন্টদের ঘিরে। কারণ চ্যাটবট কেবল তথ্য দেয়; কিন্তু এজেন্টিক এআই মানুষের মতো কাজের ধারাবাহিকতা তৈরি করে। একাধিক ধাপ বিশ্লেষণ করে, বিভিন্ন সফটওয়্যারের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে, নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করার ক্ষমতাই তাকে কর্মক্ষেত্রে সম্ভাব্য বিকল্প হিসাবে তুলে ধরছে।

এআই প্রযুক্তি এখনও ত্রুটিহীন নয়। চ্যাটজিপিটি বা অন্যান্য মডেল অনেক সময় ‘হ্যালুসিনেট’ করে— ভুল, কাল্পনিক তথ্য আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উপস্থাপন করে। আরও বড় সমস্যা— এআই মূলত প্রশিক্ষণের জন্য ব্যবহৃত তথ্যভান্ডারের উপর নির্ভরশীল। সেই তথ্য অসম্পূর্ণ, বৈষম্যমূলক হলে, এআই-এর সিদ্ধান্তেও পক্ষপাত থাকে। একটি অনলাইন রিটেল সংস্থার এআই-নির্ভর নিয়োগব্যবস্থায় মহিলা, সংখ্যালঘুদের কম গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছিল। কারণ ঐতিহাসিক ভাবে সেই সংস্থায় পুরুষকর্মী বেশি। প্রশিক্ষণ-তথ্য সেই পক্ষপাতই পুনরুৎপাদন করছিল।

বড় সমস্যা এআই-এর ‘রহস্যময়তা’। অনেক ক্ষেত্রেই বোঝা কঠিন, সিস্টেম কী যুক্তিতে সিদ্ধান্ত নিল। চ্যাটবট ভুল উত্তর দিলে মানুষ সংশোধন করতে পারে। কিন্তু এজেন্টিক এআই-এর ক্ষেত্রে সমস্যা বড়। কারণ এখানে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে বাস্তব পদক্ষেপ করা হয়। একটি ভুল সিদ্ধান্ত পুরো কর্মপ্রবাহে ছড়ালে তার প্রভাব গুণমান, নিরাপত্তা বা আর্থিক ক্ষেত্রেও পড়তে পারে। শিল্পকারখানায় যন্ত্রাংশের পূর্বাভাস বিশ্লেষণে ভুল হলে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। আর্থিক লেনদেনে ত্রুটি হলে বড় ক্ষতির আশঙ্কাও তৈরি হতে পারে। ফলে এজেন্টিক এআই-এর ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত ভুলের প্রভাব চ্যাটবটের ভুল উত্তরের তুলনায় অনেক গুরুতর। এই কারণেই কর্মক্ষেত্রে এজেন্টিক এআই-এর ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়নি। প্রযুক্তি সংস্থাগুলি প্রচার করলেও, বহু প্রতিষ্ঠান সতর্ক। বিভিন্ন সমীক্ষাতেও একই সতর্কতার সুর।

শেষে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— ‘এআই বাবল’-এর সম্ভাবনা। চ্যাটজিপিটির আবির্ভাবের পর থেকে ছোট-বড় অসংখ্য প্রযুক্তি সংস্থা এআই গবেষণা, তথ্যভান্ডার, চিপ নির্মাণ এবং পরিকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগ করেছে। বহু সংস্থার বাজারমূল্য অস্বাভাবিক দ্রুত বেড়েছে। ব্যক্তিগত সাবস্ক্রিপশন, কর্পোরেট পরিষেবা, এপিআই ব্যবহারের দক্ষিণা এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক অংশীদারি থেকে আয় বাড়লেও, তা এখনও বিনিয়োগের তুলনায় নগণ্য। ফলে প্রশ্ন, এত বিপুল বিনিয়োগের আর্থিক ভিত্তি কতটা টেকসই? ব্যবসায়িক সাফল্যের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে ব্যাপক এবং লাভজনক ব্যবহার দ্রুত প্রয়োজন। আপাতত ভবিষ্যতের সম্ভাবনার উপর ভর করেই বিনিয়োগ চলছে। কিন্তু প্রত্যাশিত বাণিজ্যিক সাফল্য না এলে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতেও পারে। সামান্য নেতিবাচক খবরেও শেয়ার বাজারে ধস নামতে পারে, বিনিয়োগকারীরা মুখ ফেরাতে পারেন। অনেক বিশেষজ্ঞ এই পরিস্থিতির সঙ্গে ২০০০ সালের গোড়ার ‘ডট-কম বাবল’-এর তুলনাও টানছেন।

ফলে এআই-এর ভবিষ্যৎ নিয়ে এক ধরনের দ্বৈত বাস্তব তৈরি হয়েছে। এক দিকে প্রযুক্তিগত সম্ভাবনা বিপুল; অন্য দিকে তার বাণিজ্যিক, প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা এখনও অনিশ্চিত। আপাতত তাই ২০২৬-এ বড় এআই সংস্থাগুলির আর্থিক ফলাফল এবং বাস্তব প্রয়োগের সাফল্যের দিকেই প্রযুক্তি-বিশ্বের নজর। কারণ কেবল প্রযুক্তিগত উৎকর্ষই নয়; ভবিষ্যতের এআই-দুনিয়া নির্ভর করবে সেই প্রযুক্তি বাস্তব অর্থনীতিতে কতটা কার্যকর, নির্ভরযোগ্য, লাভজনক হয়ে উঠতে পারে তার উপরও।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Artificial Intelligence

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy