E-Paper

বুলেট ট্রেনের গতিতে

রায়বরেলীতে মনোনয়ন জমা দিয়ে বেরোনোর পরেই টের পেয়েছিলেন, মানুষের মধ্যে উদ্দীপনা নেই। আগের মতো সাড়া মিলছে না।

প্রেমাংশু চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬ ০৭:৩৪
পর্বান্তর: ধর্মতলায় অবস্থান বিক্ষোভের মঞ্চে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২ জুন।

পর্বান্তর: ধর্মতলায় অবস্থান বিক্ষোভের মঞ্চে তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২ জুন। ছবি: রণজিৎ নন্দী।

আমি হিমালয়ে চলে যাব। পাহাড়ে গিয়ে অবসর জীবন কাটাব। আপনাদের থেকে শুধু একটাই গ্যারান্টি চাই। সঞ্জয়ের যেন কোনও শারীরিক ক্ষতি না হয়। ইন্দিরা গান্ধীর মুখে এ কথা শুনে প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাই ও জয়প্রকাশ নারায়ণ, দু’জনেই আশ্বাস দিয়েছিলেন, নেহরু-গান্ধী পরিবারের কারও কোনও শারীরিক ক্ষতি তাঁরা হতে দেবেন না।

১৯৭৭ সালের লোকসভা নির্বাচনের পরের কথা। এগারো বছর ক্ষমতায় থাকার পরে ইন্দিরা গান্ধী সরকারের পতন হয়েছিল। টানা উনিশ মাস দেশ জুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করে রাখার মাসুল চুকিয়ে ধরাশায়ী হয়েছিল কংগ্রেস। ইন্দিরা নিজের রায়বরেলী লোকসভা কেন্দ্র থেকেও হেরে গিয়েছিলেন। রাজনীতি থেকে অবসরের কথা ভাবতে শুরু করেছিলেন। ঘনিষ্ঠদের বলেছিলেন, তাঁর জন্য হিমাচল প্রদেশের কোথাও একটা কটেজ খুঁজে দিতে। সেখানে বসে আত্মজীবনী লিখবেন। আবার মনে প্রশ্ন উঠত, তাঁর আত্মজীবনী কি কেউ পড়বে? তাঁকে তো সবাই জরুরি অবস্থার জন্য ঘৃণা করছে! পুত্র সঞ্জয় গান্ধীর প্রাণহানির ভয় পেতেন। কারণ সঞ্জয়ই ছিলেন জরুরি অবস্থার সময় যাবতীয় যথেচ্ছাচারের ‘ভিলেন’। মোরারজির নেতৃত্বে জনতা সরকার ইন্দিরা বা তাঁর পরিবারের উপরে কোনও শারীরিক আঘাত আসতে দেয়নি ঠিকই, তবে ইন্দিরা, সঞ্জয় ও কংগ্রেসের শীর্ষনেতাদের ‘কুকীর্তি’ খুঁজে বার করতে আটটি তদন্ত কমিশন বসিয়েছিল।

লোকসভা ভোটের আগে ইন্দিরা গান্ধীকে কংগ্রেস নেতারা বলেছিলেন, তিনিই ক্ষমতায় ফিরছেন। গোয়েন্দাদের রিপোর্ট ছিল, ৫৪২টি লোকসভা আসনের মধ্যে কংগ্রেস ৩৪০টি আসনে জিতবে। বাস্তবে মাত্র ১৫৪টি আসন জিতে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে ইন্দিরা বলেছিলেন, তিনি হারের পূর্বাভাস পেয়েছিলেন। রায়বরেলীতে মনোনয়ন জমা দিয়ে বেরোনোর পরেই টের পেয়েছিলেন, মানুষের মধ্যে উদ্দীপনা নেই। আগের মতো সাড়া মিলছে না।

পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ভবানীপুরে মনোনয়ন জমা দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও কি টের পেয়েছিলেন, তিনি এ বার হেরে যাবেন? গোটা রাজ্যে তৃণমূলের হারের মতো তাঁর নিজের বিধানসভা কেন্দ্র ভবানীপুরেও তাঁর পরাজয় হবে?

গত ৪ মে রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশ হয়েছিল। তার পরে ঠিক এক মাস হল। বিধানসভা নির্বাচনের আগে অনেকেই রাজনৈতিক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, তৃণমূল কংগ্রেস যদি হেরে গিয়ে ক্ষমতা থেকে সরে যায়, তা হলে দলটা ভেঙে পড়বে। কিন্তু সেই ভবিষ্যদ্বাণী যে এক মাসের মধ্যে ফলতে শুরু করবে, তা বোধ হয় কেউই ভাবেনি। তৃণমূল হেরেছে ঠিকই। আসন কমেছে। তবে ভুললে চলবে না, তৃণমূল ৪০ শতাংশের উপরে ভোট পেয়েছে। অথচ ভোটের ফলের এক মাসের মধ্যে তৃণমূলের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। জেলায় জেলায় পুরসভার কাউন্সিলররা পদত্যাগ করছেন। সাংসদ, বিধায়করা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। ক্ষমতার সুফল নিতে যাঁরা তৃণমূলে নাম লিখিয়েছিলেন, তাঁরা নিরাপদ দূরত্ব তৈরি করতে শুরু করেছেন। সাম্প্রতিক অতীতে জাতীয় স্তরে কংগ্রেস ছেড়ে বহু নেতা বিজেপি বা অন্য দলে গিয়েছেন। শিবসেনা, এনসিপি, এডিএমকে-তে ভাঙন ধরেছে। তবে সে সব ক্ষেত্রে বিজেপির বিরুদ্ধে প্রলোভন বা চাপ তৈরির অভিযোগ ছিল।

কেন এই দশা? তৃণমূলের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা-কর্মীর যে কোনও মতাদর্শ বা দলের প্রতি কোনও আনুগত্য নেই, তার প্রমাণ আগেও মিলেছে। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগেও বিজেপি ক্ষমতায় আসবে ধরে নিয়ে বহু তৃণমূল নেতা ভোটের আগে বিজেপিতে চলে গিয়েছিলেন। বিজেপি হেরে যাওয়ার পরে তাঁদের অনেকেই আবার গুটি গুটি পায়ে তৃণমূলে ফিরে আসেন।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে শাসক দলের সঙ্গে সমাজ ও মানুষের রুটিরুজি এতটাই ওতপ্রোত ভাবে জড়িত যে, রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা একে ‘পার্টি সোসাইটি’ বলে থাকেন। রাজ্যে ‘পার্টি করা’ একটা অন্যতম পেশা। সেই ‘পার্টি সোসাইটি’-তে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৈরি ক্ষমতার কাঠামোয় এক দিকে সরকারি পুলিশ-প্রশাসনকে রাজনৈতিক ভাবে কাজে লাগানো হয়েছে। অন্য দিকে আনুগত্য, দলের কোষাগারে টাকা ও ভোটের বিনিময়ে বিভিন্ন এলাকায় তৃণমূলের ‘বাহুবলী’ নেতাদের নিজেদের ইচ্ছেমতো রাজত্ব চালাতে দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তৃণমূলের এই বাহুবলী নেতারা ‘ব্র্যান্ড মমতা’-কে কাজে লাগিয়েছেন। ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে ও তা ধরে রাখতে যথেচ্ছ হিংসা, দুর্নীতি করেছেন। কিন্তু রুটিরুজির জন্য শাসক দলের উপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়া মানুষ টুঁ শব্দ করতে পারেনি।

এই শাসন ব্যবস্থায় যখনই পার্টি ক্ষমতাচ্যুত হয়, তখনই ভাঙন শুরু হয়। বাহুবলী নেতারা জনরোষের মুখে পড়েন। পুলিশ-প্রশাসনের কর্তারা আর ক্ষমতাচ্যুত নেতাদের রেয়াত করেন না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়। ক্ষমতাচ্যুত দল ও নেতাদের সম্পত্তি আটক হয়। দলের কোনও শীর্ষনেতা বিদেশে পালিয়ে যান। অন্য নেতারা বিদ্রোহ শুরু করেন। শীর্ষনেতৃত্বের বিরুদ্ধে আঙুল ওঠে। দোষারোপের পালা শুরু হয়। তার থেকেও ভয়ঙ্কর হল, ক্ষমতাচ্যুত দল গণতান্ত্রিক পরিসরে বিরোধীর ভূমিকা কী ভাবে পালন করতে হবে, সেটাই বুঝতে পারে না।

তৃণমূল কংগ্রেসের ক্ষেত্রে ঠিক এই ঘটনাগুলোই ঘটছে। সেটাও বুলেট ট্রেনের গতিতে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী রাজনীতি করেই উঠে এসেছিলেন। কিন্তু গত কয়েক বছরে তাঁর দলের সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ যাঁর হাতে চলে গিয়েছে, সেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী রাজনীতি করেননি। তার ফল হল, তৃণমূল শীর্ষনেতৃত্ব ঠিক কী ভাবে বিরোধীর ভূমিকা পালন করবেন সেটাই বুঝতে পারছে না। নতুন বিজেপি সরকার রাজ্য জুড়ে হকার উচ্ছেদ করতে নেমেছে। তাঁদের পাশে বাম, কংগ্রেসকে দেখা গেলেও তৃণমূলের কোনও নেতার টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। বোধ হয় মানুষের মধ্যে যাওয়ার সাহসই পাচ্ছেন না তাঁরা।

রাজনীতির প্রাচীন প্রবাদ হল, যখন সামনে আর কোনও রাস্তা দেখা যায় না, তখন রাস্তায় নেমে মানুষের পাশে দাঁড়ানোটাই একমাত্র রাস্তা। তবে তার আগে কিছুটা ঘর গুছিয়ে নিতে হয়। ধৈর্য ধরে সুযোগের অপেক্ষা করতে হয়।

ইন্দিরা গান্ধী তা করে দেখিয়েছিলেন। সাতাত্তরের ভোটে হারের পরে প্রথমে রাজনৈতিক সন্ন্যাস নেওয়ার কথা ভাবলেও, তিনি সে পথে হাঁটেননি। জনতা পার্টির মধ্যে অন্তঃকলহের অপেক্ষায় থেকেছেন। সুযোগ পেলেই মানুষের পাশে ছুটে গিয়েছেন। তার পরে ১৯৭৯ সালের সেপ্টেম্বরে গোটা দেশে প্রচারে নেমে পড়েছিলেন। সঙ্গে ছিল দুটো স্যুটকেস। আটটা শাড়ি। দুটো ফ্লাস্ক। তাই নিয়ে গাড়িতে, বিমানে, কপ্টারে দেশের এ মাথা থেকে ও মাথা ৪০ হাজার কিলোমিটার রাস্তা চষে ফেলেছিলেন ইন্দিরা। ১৯৮০ সালের জানুয়ারিতে আবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। এ দেশের ইতিহাসে এমন রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের উদাহরণ আর নেই।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি একই রকম ‘কামব্যাক’ করে দেখাতে পারবেন? ভুললে চলবে না, ইন্দিরা গান্ধী যখন সাতাত্তরে ক্ষমতাচ্যুত হন, তখন তাঁর বয়স ষাট বছর। রাজনীতিতে ষাট বছর বয়স কিছুই না। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই বাহাত্তরে পা দিয়ে ফেলেছেন। এমনিতেই সিপিএমের বিরুদ্ধে তাঁকে দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই করতে হয়েছে। এখন তাঁর বিপক্ষে কেন্দ্রে ও রাজ্যে ক্ষমতায় থাকা বিজেপি। যাঁরা রাজ্যের হিন্দু ভোটব্যাঙ্ককে এককাট্টা করার প্রচেষ্টা অনেকটাই সফল। মমতার মুসলমান ভোটব্যাঙ্কও অটুট নেই। সামনে ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচনের পরীক্ষা। কিন্তু পাশে হীনবল কংগ্রেস ছাড়া আর কাউকে দেখা যাচ্ছে না।

তার থেকেও চিন্তার হল, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাস। রাজ্যের মানুষ এক বার কাউকে ক্ষমতায় বসালে সহজে সরান না। আবার কাউকে ক্ষমতাচ্যুত করলে সেই দলকে পুরোপুরি বর্জন করেন। পশ্চিমবঙ্গে সাতাত্তর সালে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে কংগ্রেস এখন দু’টি জেলায় টিকে রয়েছে। পনেরো বছর আগে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া সিপিএম এখন বিধানসভায় একটি আসন পেয়েই মহা উল্লসিত। কিন্তু এদের ক্ষমতা হারানোর পরে তৃণমূল কংগ্রেসের মতো জনরোষের মুখে পড়তে হয়নি।

এই পরিস্থিতি থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রত্যাবর্তন হলে, তা সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের ক্রিকেটীয় ‘কামব্যাক’-কেও ইতিহাসের পাতায় পিছনে ফেলে দেবে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Mamata Banerjee TMC

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy