E-Paper

যদি প্রতিদ্বন্দ্বী না ভাবি

স্বাগতম দাস

শেষ আপডেট: ০৩ জুন ২০২৬ ০৭:০৯

২০২৩-এর শেষ দিকে, ঢাকুরিয়ার এক ক্যাফেতে বসে কম্পিউটার সায়েন্সে সদ্য-স্নাতক রাহুল তার বন্ধুকে বলছিল, “চ্যাটজিপিটি যদি কোড লিখতে পারে, আমাদের তবে চাকরি কে দেবে?” আরও অনেক তরুণ ছিল সেখানে, তাদের মুখেও একই উদ্বেগ। এই উদ্বেগ আজ গোটা একটি প্রজন্মের। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আজ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ: ফোনে, অফিসে, হাসপাতালে। পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মাল্টি-এজেন্টিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসার, যেখানে একাধিক বুদ্ধিমান সত্তা পরস্পর সহযোগিতা করে জটিল কাজ সম্পন্ন করে। এই যন্ত্রের ভিড়ে কি মানুষের জায়গা থাকবে?

ভয়টা অমূলক নয়। ম্যাককিনজি গ্লোবাল ইনস্টিটিউট-এর প্রতিবেদন বলছে, ২০৩০-এর মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৮০ কোটি কাজ স্বয়ংক্রিয়করণের শিকার হতে পারে। ডেটা এন্ট্রি, সরল গ্রাহক সেবা, নথিপত্র যাচাই— কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অনেক দ্রুত ও নির্ভুল ভাবে করতে পারে। কলকাতার এক বিপিও সংস্থায় কাজ করতেন মিতালি, তাঁর সংস্থা গ্রাহক সেবায় একটি চ্যাটবট চালু করে। মিতালিরা যা এক দিনে করতেন, মেশিন তা করে কয়েক ঘণ্টায়। এই অভিজ্ঞতা আজ বহু মানুষের।

এই আতঙ্ক কি নতুন? ইতিহাস বলছে, না। ইংল্যান্ডে প্রথম শিল্পবিপ্লবে বাষ্পচালিত তাঁত মেশিন হস্তশিল্পীদের জীবিকায় সরাসরি আঘাত হানে। নটিংহ্যামশায়ার, ইয়র্কশায়ার ও ল্যাঙ্কাশায়ারে হাজার হাজার বয়নকর্মী কারখানার যন্ত্রপাতি ভাঙচুর করেন। অনেক সাংসদ আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, যন্ত্র শ্রমিক শ্রেণিকে ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু পরবর্তী পঞ্চাশ বছরে ব্রিটেনে কর্মসংস্থান বহুগুণ বেড়ে গেল— রেলপথ নির্মাণ, কারখানা ব্যবস্থাপনা, বাষ্পীয় জাহাজ পরিচালনা, ব্যাঙ্কিং খাতে এমন সব পেশার জন্ম হল যা আগে কল্পনাতেও ছিল না। অর্থনীতিবিদদের গবেষণায় দেখা গেছে, শিল্পবিপ্লব দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান ধ্বংস করেনি, বরং শ্রমের চাহিদাকে নতুন রূপ দিয়েছে।

দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লবে বিদ্যুৎ ও রাসায়নিক শিল্পের প্রসার ঘটলে একই আতঙ্ক ফিরে এল। আমেরিকায় ১৮৮০-র দশকে টেলিগ্রাফ অপারেটর থেকে শুরু করে কামার ও গাড়িচালকরাও ভয় পেয়েছিলেন, তাঁদের পেশা উঠে যাবে। অর্থনীতিবিদ ওয়াসিলি লেয়োন্তিফ এক প্রবন্ধে সতর্ক করেন, যন্ত্র মানুষকে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক করে দেবে, ঠিক যে ভাবে ট্রাক্টর ঘোড়াকে প্রতিস্থাপন করেছিল। বাস্তবে কী হল? বিশ শতকের প্রথম ভাগে আমেরিকায় কৃষিকাজে নিযুক্ত মানুষের সংখ্যা মোট কর্মশক্তির ৪০ শতাংশ থেকে মাত্র ২ শতাংশে নেমে এল, অথচ একই সময়ে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বিমান পরিবহণ, বিনোদন শিল্পে কোটি কোটি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হল যা আগে অস্তিত্বহীন ছিল। বিশ শতক শেষে কম্পিউটার বিপ্লবেও একই ছবি। ১৯৬৪-তে আমেরিকার এক দল অর্থনীতিবিদ ও বিজ্ঞানী প্রেসিডেন্টকে স্মারকলিপি পাঠিয়ে সতর্ক করেন, স্বয়ংক্রিয়করণ গণবেকারত্ব ডেকে আনবে। পরবর্তী তিন দশকে আমেরিকায় কর্মসংস্থান বাড়ল, মাথাপিছু আয়ও, এবং কম্পিউটার শিল্পকে কেন্দ্র করে সিলিকন ভ্যালি থেকে বেঙ্গালুরু পর্যন্ত এক নতুন অর্থনৈতিক মানচিত্র তৈরি হল। বিশেষত ভারতে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে ১৯৯০-এর দশক থেকে ২০২০ পর্যন্ত প্রায় ৫০ লক্ষ প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।

ইতিহাসের এই ধারাবাহিকতা আমাদের এক স্পষ্ট শিক্ষা দেয়: প্রতিটি প্রযুক্তিগত ঢেউ প্রথমে ভাঙচুর করে, তার পর নির্মাণ করে। প্রযুক্তি সমস্যা নয়, সমস্যা হল পরিবর্তনের গতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও এই নির্মাণপর্ব ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। যেমন ধরুন ডেটা অ্যানোটেটরের কথা: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শেখে ডেটা থেকে, কিন্তু সেই ডেটা তৈরি করতে হয় মানুষকেই। একটি ছবিতে বিড়াল চেনাতে হলে, লক্ষ লক্ষ ছবিতে ‘এটি বিড়াল’ বলে চিহ্নিত করতে হয়। ডেটা অ্যানোটেশন আজ এক বিশাল শিল্প, দেশে হাজার হাজার তরুণ ইতিমধ্যে এ কাজে যুক্ত। বিশেষত বাংলা ভাষার মডেল তৈরিতে বাঙালি অ্যানোটেটরদের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে।

‘মাল্টি-এজেন্টিক ওয়ার্কফ্লো রিভিউয়ার’ আর এক নতুন পেশা। যখন একাধিক বুদ্ধিমান সত্তা এক সঙ্গে কাজ করে, তাদের ফলাফল যাচাইয়ে দক্ষ মানুষের দরকার পড়ে; কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভুল করে— কখনও সূক্ষ্ম, কখনও গুরুতর। এই ভুল ধরতে চাই বিষয়জ্ঞান ও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি, যা এখনও একমাত্র মানুষের সম্পদ। ‘ডিজিটাল ফরেনসিক’ বিশেষজ্ঞের চাহিদাও বিরাট। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত প্রতারণা, ডিপফেক ভিডিয়ো, সাইবার অপরাধ যত বাড়ছে, তত বেশি দরকার হচ্ছে ডিজিটাল গোয়েন্দাদের। এ ছাড়াও ‘প্রম্পট এঞ্জিনিয়ারিং’ অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে সঠিক ফলাফল আদায়ের কৌশল, এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে ‘এথিক্স ও কমপ্লায়েন্স অফিসার’, এই পেশাগুলি আগামী দশকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

বাংলাভাষী অঞ্চলের তরুণদের জন্য বিশেষ সুযোগ রয়েছে। বাংলা ভাষার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মডেল এখনও অপর্যাপ্ত। বাংলা ভয়েস ডেটা, বাংলা টেক্সট অ্যানোটেশন, বাংলা ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং ও নানা আঞ্চলিক কথ্যভঙ্গি বা ডায়লেক্ট— এই ক্ষেত্রগুলিতে দক্ষ বাঙালি পেশাদারদের চাহিদা আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমবর্ধমান।

প্রস্তুতিটা কেমন হওয়া উচিত? আজ প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে, বহু স্কুলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কোর্স চালু হয়েছে। কিন্তু তা-ই কি যথেষ্ট? ভারতের প্রেক্ষাপটে এই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভারত আজ বিশ্বের সবচেয়ে বড় তরুণ কর্মশক্তির দেশ— ২০৩০-এর মধ্যে ভারতের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী ১০০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে অনুমান। এই বিশাল মানবসম্পদ যদি ঠিক ভাবে প্রশিক্ষিত হয়, তবে তা ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠবে। না হলে এটিই হবে সবচেয়ে বড় সঙ্কট।

সমস্যাটা শুরু হয় শিক্ষার কাঠামো থেকেই। ভারতের প্রচলিত উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা এখনও মূলত রৈখিক: তিন বা চার বছরের ডিগ্রি অর্জন, পরে চাকরির বাজারে নামা। বাস্তব কর্মক্ষেত্র এখন আর রৈখিক নয়। ন্যাসকম ও অ্যাস্পায়ারিং মাইন্ডস-এর সমীক্ষায় দেখা গেছে, ভারতের প্রকৌশল স্নাতকদের ৮০ শতাংশেরও বেশি সরাসরি কর্মযোগ্য নন, তাঁরা শিল্পের প্রকৃত চাহিদা মেটাতে পারছেন না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে এই ব্যবধান প্রকট হয়ে উঠছে।

তা হলে পথ কী? পাঠ্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অধ্যায় জুড়ে দেওয়াই সমাধান নয়। চিন্তার কাঠামো বদলানো চাই। প্রথমত, দক্ষতাভিত্তিক মডিউলার শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। আইআইটি মাদ্রাজের অনলাইন বিএস প্রোগ্রাম বা এনপিটিইএল-এর মুক্ত কোর্সগুলি পথ দেখাচ্ছে: শিক্ষার্থী তার গতি ও আগ্রহ অনুযায়ী নির্দিষ্ট দক্ষতা অর্জন করতে পারে, চার বছরের অনমনীয় ছাঁচে আটকে না থেকে। ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া অংশীদারিতে এই মডেল আরও শক্তিশালী হতে পারে, যেখানে এক জন কৃষিবিজ্ঞানের ছাত্র কৃষিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ শিখবে, এক জন আইনের ছাত্র আইনি নথি বিশ্লেষণে এআই টুলের ব্যবহার শিখবে।

দ্বিতীয়ত, অ্যাপ্রেন্টিসশিপ ও ইন্টার্নশিপকে ডিগ্রির অবিচ্ছেদ্য অংশ করতে হবে। জার্মানির দ্বৈত শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষ ও কারখানায় শেখে, ভারতের প্রেক্ষাপটে তা অভিযোজিত করা সম্ভব। টাটা গ্রুপ ও ইনফোসিস-এর মতো সংস্থা ইতিমধ্যে নিজস্ব প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালায়, এই ধারণাকে বিস্তৃত করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের সঙ্গেও জুড়তে হবে। তৃতীয়ত, ভারতের বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে— যেখানে আছেন কোটি কোটি ছোট ব্যবসায়ী, কারিগর, কৃষক— ডিজিটাল হাতিয়ার ব্যবহারে সক্ষম করতে হবে। লুধিয়ানার এক বয়নকর্মী যদি ফ্যাশন ডিজ়াইনে এআই টুল, মুর্শিদাবাদের মসলিন বুননকারী যদি বৈশ্বিক বাজারে নিজের পণ্য বিক্রির জন্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে পারেন, তা হলে প্রযুক্তির সুফল শুধু শহুরে প্রযুক্তিবিদদের মধ্যে আটকে থাকবে না। চতুর্থত ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ: মানবিক দক্ষতাগুলিকে পাঠ্যক্রমের কেন্দ্রে আনতে হবে। সমালোচনামূলক ভাবনা, দলগত কাজ, সমস্যা সমাধান, যোগাযোগ দক্ষতা— এগুলি কোনও যন্ত্র প্রতিস্থাপন করতে পারবে না। অথচ ভারতের পরীক্ষামুখী শিক্ষাব্যবস্থায় এগুলি এখনও উপেক্ষিত। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নব্বই শতাংশ নম্বর পাওয়া ছাত্র যদি একটি দলকে নেতৃত্ব দিতে না পারে, জটিল সমস্যার সামনে সৃজনশীল ভাবে ভাবতে না পারে, তা হলে সেই ডিগ্রির বাজারমূল্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে দ্রুত কমে আসবে।

রাহুল ভেঙে পড়েনি। অনলাইন কোর্সে ভর্তি হয়েছে, এআই ওয়ার্কফ্লো ম্যানেজমেন্ট। এক স্টার্ট-আপে সে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ফলাফল পর্যালোচনা করে, ত্রুটি চিহ্নিত করে, মডেলের উন্নতিতে সাহায্য করে। এআই তার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, হাতিয়ার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এক ঢেউ যাকে ঠেকানো যায় না, কিন্তু সাঁতার শিখলে সে ঢেউয়ে ভাসা যায়, সার্ফিংও করা যায়। তরুণ প্রজন্মের করণীয়: আতঙ্কিত না হয়ে জিজ্ঞাসু হওয়া, শেখা, পরিবর্তনকে আলিঙ্গন করা।

ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউট

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

AI Employment

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy