E-Paper

সুশাসন ও সংবেদনশীলতা

নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই পূর্বতন সরকারের তোষণের অভিযোগ-বিদ্ধ ধর্মীয় শ্রেণিবিন্যাস-ভিত্তিক সহায়তা ভাতা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তূর্য বাইন

শেষ আপডেট: ০২ জুন ২০২৬ ০৮:৪৫

পনেরো বছরের তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত সরকারকে উৎখাত করে প্রতিষ্ঠিত এই বিজেপি সরকারের কাছে পশ্চিমবঙ্গের জনগণের প্রত্যাশা বিপুল, তাতে সন্দেহ নেই। হয়তো সে কারণেই রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচন-পূর্ব দলীয় সঙ্কল্পপত্রে উল্লিখিত প্রতিশ্রুতি পূরণে অতি তৎপর। দীর্ঘদিন রাজ্যের একাধিক দফতরের মন্ত্রিত্বের অভিজ্ঞতাঋদ্ধ তিনি ইতিমধ্যেই জনকল্যাণমূলক প্রকল্প রূপায়ণ ও দুর্নীতিমুক্ত স্বচ্ছ প্রশাসন বাস্তবায়নে যে পদক্ষেপগুলি করেছেন, তা রাজ্যের জনগণের তো বটেই, বিরোধী দলের তাবড় নেতাদেরও প্রশংসা কুড়িয়েছে।

নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই পূর্বতন সরকারের তোষণের অভিযোগ-বিদ্ধ ধর্মীয় শ্রেণিবিন্যাস-ভিত্তিক সহায়তা ভাতা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সাহসী পদক্ষেপ, কোষাগারের স্বাস্থ্যের পক্ষেও হিতকর। তবে, যে অন্নপূর্ণা যোজনা চালু হতে যাচ্ছে, তার জন্য আগে পূর্বতন সরকারের লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পটির পর্যালোচনা ও যুক্তিনিষ্ঠ সংস্কারের প্রয়োজন ছিল বলে মনে করছেন অনেকেই। নতুন প্রকল্পে নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য যে ফর্ম রাজ্য সরকার তৈরি করেছে, তা নিয়ে বহুবিধ প্রশ্ন উঠেছে ইতিমধ্যেই। অন্তর্ভুক্তির শর্ত এখনও অস্পষ্ট, কিন্তু দু’টি প্রশ্ন পাশাপাশিই থাকছে— এক, পশ্চিমবঙ্গের মতো ঋণের দায়ে নাভিশ্বাস ওঠা রাজ্যে কেবল একটি প্রকল্পের জন্য এই বিপুল অর্থের সংস্থান কী ভাবে হবে; এবং দুই, অবৈধ প্রাপকদের ছাঁটার জরুরি কাজটি করতে গিয়ে বহু ন্যায্য প্রাপকের উপরেও খাঁড়া নেমে আসবে না তো? এক দিকে রাজ্যের আর্থিক উন্নয়ন, এবং অন্য দিকে সামাজিক ন্যায়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা— এই দ্বিমুখী দায়িত্ব পালন করতে হবে সরকারকে।

অভিযোগ ছিল যে, ২০২১-এ বিধানসভা নির্বাচনের আগে পূর্বতন সরকারের লক্ষ্মীর ভান্ডার চালু করার নেপথ্যে ছিল পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি থেকে জনসাধারণের দৃষ্টি ঘোরানো, এবং মহিলা-ভোট শাসকের অনুকূলে আনার তাগিদ। অন্য রাজ্যে মহিলাদের ভাতা দেওয়ার প্রকল্পে যে সব শর্ত রাখা হয়েছে, লক্ষ্মীর ভান্ডারে অন্তর্ভুক্তির জন্য তার অধিকাংশই ছিল অনুপস্থিত। উদাহরণ হিসাবে বিজেপি-শাসিত মধ্যপ্রদেশের ‘লাডলি বেহনা’র উল্লেখ করা যায়। যাঁর পারিবারিক আয় বছরে সাড়ে চার লাখ টাকার নীচে, পরিবারে কোনও সরকারি চাকুরে, নিয়মিত পেনশনভোগী বা আয়করদাতা নেই এমন ২১ থেকে ৬০ বছর বয়সি বিবাহিতা, বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা মহিলারাই শুধু এই প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত। মহারাষ্ট্রের ‘মুখ্যমন্ত্রী মাঝি লাডলি বহিন যোজনা’, ঝাড়খণ্ডের ‘মুখ্যমন্ত্রী মাইয়া সম্মান যোজনা’, হরিয়ানার ‘লাডো লক্ষ্মী যোজনা’, কর্নাটকের ‘গৃহলক্ষ্মী’-সহ পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া যত রাজ্যে এ ধরনের প্রকল্প চালু, প্রতিটিতে প্রাপকের যোগ্যতা নিরূপণের ক্ষেত্রে বেশ কিছু পূর্বশর্ত আছে। তামিলনাড়ুর ‘কালাইগনর মাগলির উরিমাথোগাই থিতম’ প্রকল্পে রয়েছে আরও কিছু শর্ত। এ রাজ্যেও অন্নপূর্ণা যোজনা দেওয়ার ক্ষেত্রে যোগ্যতার মাপকাঠি হিসাবে অন্য রাজ্যের মতো কিছু শর্ত এক দিকে যেমন সরকারি কোষাগারে চাপ কমাবে, তেমনই যাঁদের সরকারি আনুকূল্য যথার্থ প্রয়োজন, তাঁদের স্বাবলম্বী করে তুলতে দীর্ঘমেয়াদি নতুনতর প্রকল্প সূচনারও যথেষ্ট অবকাশ তৈরি করবে।

সরকারি বাসে মহিলাদের বিনামূল্যে যাতায়াতের সুবিধা নিঃসন্দেহে প্রশংসার। যে দরিদ্র ও শ্রমজীবী মহিলারা বাসে যাতায়াত করেন, তাঁরা উপকৃত হবেন। কিন্তু ভাড়া মেটাতে সমর্থ মহিলাদের কি এই সুবিধার প্রয়োজন আছে? ভারতীয় রেলে অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক ও কম আয়ের যাত্রীদের জন্য যে ‘লো ভ্যালু’ মাসিক সিজ়ন টিকিট চালু রয়েছে, সরকারি বাসের ক্ষেত্রে তেমন প্রকল্প গ্রহণে যে আর্থিক সাশ্রয় হত, তা দিয়ে হয়তো ধুঁকতে থাকা সরকারি পরিবহণ ব্যবস্থার হাল কিছুটা ফেরানো যেত, উপকৃত হতেন সকল যাত্রী। আগের সরকার যত জনকল্যাণমূলক প্রকল্প চালু করেছিল, নতুন সরকার যদি সেগুলির ক্ষেত্রেও যাঁদের সত্যিই প্রয়োজন আছে, বেছে বেছে শুধু তাঁদেরই প্রকল্পের সুবিধা দেওয়ার কথা বিবেচনা করে, তবে আর্থিক সাশ্রয়ের পাশাপাশি অপাত্রে দানও বন্ধ হবে।

যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা বেআইনি নির্মাণ ভাঙতে মুখ্যমন্ত্রী যে কঠোর মনোভাব দেখিয়েছেন, নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য ছাড়াও প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় তা নিশ্চয়ই প্রয়োজন। কিন্তু রাতারাতি বুলডোজ়ারে তা গুঁড়িয়ে দিলে যে দরিদ্র মানুষদের উপরেও শাস্তির খাঁড়া নেমে আসে, তাতে সন্দেহ নেই। সুতরাং অবৈধ নির্মাণ ভাঙতে কঠোর ব্যবস্থা করা যেমন যথার্থ প্রশাসকের দায়িত্ব, তেমনই সেখানকার আবাসিকদের পুনর্বাসনের দায় অস্বীকারও সুবিবেচনার হবে না। যাত্রী-স্বাচ্ছন্দ্য ও পথ-নিরাপত্তার স্বার্থে স্টেশন, ফুটপাত, সরকারি জমি থেকে হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের উচ্ছেদ সময়ের দাবি, কিন্তু এতে যে অগণিত মানুষের জীবন-জীবিকা বিপন্ন হল, সেই বাস্তবতার দায়ও উপেক্ষার নয়। কেবল ভাঙার কাজে নয়, গড়ার কাজেও নতুন সরকার মন দিক— এমনই প্রত্যাশা সবার।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Annapurna Bhandar Scheme

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy