পঞ্চাশ বছর আগে, ১৯৭৬-এর ফেব্রুয়ারি মাসে, মুক্তি পেয়েছিল সত্যজিৎ রায়ের ‘কলকাতা ট্রিলজি’র শেষ পর্ব জনঅরণ্য। শংকরের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত এই ছবিটি— সাইট অ্যান্ড সাউন্ড পত্রিকায় প্রকাশিত প্রখ্যাত চিত্রসমালোচক পেনেলোপি হিউস্টনের আলোচনা থেকে শব্দবন্ধ ধার করে বলা যেতে পারে— মূলত ‘আয়রনিক কমেডি’। ছবিটির কেন্দ্রে রয়েছে এক চব্বিশ বছরের মধ্যবিত্ত যুবক, নাম সোমনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় (প্রদীপ মুখোপাধ্যায়)। ছাত্র হিসাবে বিশেষ উজ্জ্বল না হলেও, কলকাতার ছেলে সোমনাথ সৎ, নম্র এবং পরিশ্রমী। সম্মানজনক চাকরি পেতে ব্যর্থ হয়ে অনেকটা ভাগ্যের ফেরেই সে প্রবেশ করে অসংগঠিত ব্যবসা আর দালালির জগতে— কলার খোসায় পিছলে পড়ে জীবনের খাত বদলে যাওয়াকে ভাগ্য ছাড়া আর কী-ই বা বলা যায়!
সেই জগৎ খানিকটা ধূসর। এর মূল স্তম্ভগুলি হল খদ্দের, কমিশন, ঘুষ, মুনাফা আর ‘অর্ডার সাপ্লাই’। বিশুদা (উৎপল দত্ত) সোমনাথকে এই জগতে নিয়ে আসেন। এখানে টিকে থাকতে গেলে নীতি-আদর্শ, ভাল-মন্দ, ঠিক-বেঠিক নিয়ে ভাবলে চলে না। সোমনাথের ক্ষেত্রেও এই নিয়মের অন্যথা হয় না। অনিচ্ছা সত্ত্বেও, টিকে থাকার শর্ত মেনেই, ময়লা ঘাঁটতে হয়, আপস করতে হয় সোমনাথকে।
আপাতদৃষ্টিতে জনঅরণ্য এক যুবকের অধঃপতনের গল্প। কিন্তু, সোমনাথের আলো থেকে অন্ধকারের ব্যক্তিগত যাত্রাপথকে সত্যজিৎ পরিণত করেন বৃহত্তর সামাজিক ট্র্যাজেডিতে। আমরা বুঝি, এই যাত্রা এক প্রজন্মের সামগ্রিক অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। যে প্রজন্ম এক দিকে স্বপ্ন আর উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে আঁকড়ে ধরতে চায়, অন্য দিকে প্রতিনিয়ত অভাব, অনটন আর অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে লড়াই করে চলে। সততা বজায় রাখার ইচ্ছে আর টিকে থাকার প্রয়োজনের টানাপড়েনে তারা ক্রমাগত ক্ষতবিক্ষত হয়। এই বন্দিত্বের অনুভূতিটা ছবির আবহ জুড়ে ছড়িয়ে থাকে— বার বার লোডশেডিং, মোমবাতির ক্ষীণ আলো আর রেডিয়োতে বাজতে থাকা ‘ছায়া ঘনাইছে বনে বনে’— এমন এক জগতের ছবি গড়ে ওঠে, যেখানে অন্ধকারই যেন বাস্তব। আলো অনিশ্চিত।
ষাটের দশকের শেষ থেকেই ভারতে স্বাধীনতা-পরবর্তী আশাবাদ ফিকে হতে থাকে। অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, শিল্পায়ন, শিক্ষা আর আধুনিকতার ভিতের উপরে স্থাপিত নেহরুবাদী রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি ধীরে ধীরে একটি ন্যায়সঙ্গত, অর্থনৈতিক ভাবে সম ও উন্নত ভারত গড়ে তুলবে— সেই বিশ্বাসে চিড় ধরতে শুরু করে। স্বাধীনতার পরবর্তী প্রথম দু’দশকে যে সমস্ত ধারণা তৈরি হয়েছিল— যেমন, মেধা আর শিক্ষাই হবে সামাজিক উত্তরণের সিঁড়ি এবং রাষ্ট্রই মধ্যবিত্তের কর্মসংস্থানের পথ খুলে দেবে— সত্তরের দশকে এসে তা অনেকের কাছেই ফাঁপা বলে মনে হতে থাকে। অর্থনৈতিক স্থবিরতা, আমলাতান্ত্রিক জড়তা এবং ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এমন এক শিক্ষিত যুবসমাজ তৈরি করে, যারা কাগজে-কলমে যোগ্য, কিন্তু বাস্তবে অপ্রয়োজনীয়। সোমনাথ, এক অর্থে, সেই ভাঙা প্রতিশ্রুতিরই প্রতীক।
এই কারণেই ছবিটির অন্যতম শক্তি নিহিত তার বেকারত্বের চিত্রণে। জনঅরণ্য ছবিটিতে সোমনাথের বাবা (সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়) আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলেন এই শুনে যে, একটি শূন্যপদের জন্য এক লক্ষ আবেদনপত্র জমা পড়েছে। অথচ এই পরিসংখ্যানটি সে দিনের মতো আজও সত্য। শুধু তা-ই নয়, ইন্টারভিউয়ের নামে চাঁদের ওজন জিজ্ঞাসা করার যে প্রহসন দেখি ছবিতে, সেই ট্র্যাডিশনও ‘সমানে চলিতেছে’। শিক্ষিত অথচ বেকার যুবকযুবতীরা— যাঁরা যোগ্যতাসম্পন্ন কিন্তু দিশাহীন, উচ্চাকাঙ্ক্ষী কিন্তু অসহায়— একুশ শতকের ভারতেও অত্যন্ত চেনা চরিত্র।
ডিগ্রির মর্যাদার সঙ্গে সম্মানজনক কর্মসংস্থানের বিশেষ সম্পর্ক তৈরি হয়নি আজও। বস্তুত, ট্র্যাজেডি গভীর থেকে গভীরতর হয়েছে। সত্যজিতের সময়ে বেকারত্বের কারণ ছিল রাষ্ট্রীয় স্থবিরতা ও অর্থনৈতিক জড়তা। আজ অর্থনীতি গতিশীল হয়েছে, শহরগুলিতে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে ঝাঁ-চকচকে সব স্কাই স্ক্র্যাপার, ধনকুবেরদের সংখ্যা বাড়ছে— তবু স্থায়ী, নিরাপদ চাকরি অধরাই থেকে যাচ্ছে। অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ক্রমশ হয়ে পড়ছে ‘জবলেস’। কর্মসংস্থানহীন। দেশে সম্পদ সৃষ্টি হচ্ছে, কিন্তু পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান নয়। যার ফলে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে আসাম্য।
কিন্তু জনঅরণ্য শুধু বেকারত্বের গল্প বলে— এ কথা বললে ভুল বলা হবে। বেকারত্ব মানুষের নৈতিক বোধের উপরে কী প্রভাব ফেলে, ছবিটি পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে অনুসন্ধান করে সেটাও। সত্যজিৎ দেখিয়েছিলেন, দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা শুধু দারিদ্রের দিকে ঠেলে দেয় না মানুষকে— এর ফলে বদলে যায় মানুষের মূল্যবোধ, নীতিবোধ, ভাল-মন্দের বিচার। ছবিতে তাই দুর্নীতি কোনও ব্যতিক্রমী অপরাধ নয়, বরং তা দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক শর্ত হয়ে ওঠে, যা মেনে নিতে হয়। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি আজও। দুর্নীতির রূপ বদলেছে, চরিত্র নয়। সৎ থাকাটা, তখনকার মতো এখনও অর্থনৈতিক ভাবে অলাভজনক। সাফল্য আজও প্রায় সব সময়ই যোগাযোগ, প্রভাব, লবিইং আর অন্যায়কে মেনে নেওয়ার ফসল; মেধার নয়। যে ‘মেরিটোক্র্যাসি’ নিয়ে আজ চায়ের কাপে তুফান তুলি আমরা, সেই ‘মেরিটোক্র্যাসি’ যে আসলে একটা গল্পকথা ছাড়া কিছুই নয়, সেটা পঞ্চাশ বছর আগেই স্পষ্ট বুঝিয়েছিল জনঅরণ্য।
ছবিটি যেন অর্ধশতকের দূরত্ব থেকেও চিনে ফেলেছিল আজকের ‘ইনফরমাল’ এবং ‘গিগ ইকনমি’-কে। শিক্ষিত হয়েও সোমনাথ কোনও স্থায়ী চাকরিজীবী নয়— সে কমিশন, যোগাযোগ, দালালির উপরে নির্ভর করে বেঁচে থাকে— যাকে আজ বলা হয় অনিশ্চিত, চুক্তিভিত্তিক শ্রম। তার বন্ধু সুকুমার (গৌতম চক্রবর্তী) শিক্ষিত হয়েও ট্যাক্সি চালিয়ে জীবনধারণ করতে বাধ্য হয়। সত্যজিৎ সূক্ষ্ম ভাবে দেখান যে, এই ধরনের জীবিকা গ্রহণ করার মানসিক চাপ গভীর, কারণ এই জীবিকাগুলিতে জড়িয়ে থাকে অবিরাম দৌড়ঝাঁপ, ব্যক্তিগত সম্পর্ককে পুঁজিতে রূপান্তর করার এক কঠোর বাধ্যবাধকতা, তীব্র নিরাপত্তাহীনতা এবং আয়ের অনিশ্চয়তা। পাশাপাশি, সর্ব ক্ষণ নিজেকে বিক্রি করার এক নিরন্তর চাপও কাজ করে। সোমনাথ যেন আজকের ডেলিভারি কর্মী, ফ্রিল্যান্সার, এজেন্ট, কনসালট্যান্টদেরই পূর্বসূরি। বস্তুত জনঅরণ্য-কে ভারতীয় শিল্পে অনিশ্চিত পুঁজিবাদের প্রথম দিকের অন্যতম ‘ক্রিটিক’ বলা চলে।
ছবিটির সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রাসঙ্গিকতা সম্ভবত নারী ও নারীদেহের পণ্যকরণ নিয়ে সত্যজিতের ভাষ্যে। কেমিক্যাল ওয়াইটনারের অর্ডার পেতে সোমনাথকে এক ক্লায়েন্টের জন্য জোগাড় করতে হয় এক যৌনকর্মীকে। ছবির ক্লাইম্যাক্সে সে আবিষ্কার করে যে, সেই যৌনকর্মী তারই বন্ধু সুকুমারের বোন কণা ওরফে যূথিকা (সুদেষ্ণা দাস)। স্বীকার করতেই হয়, এই দৃশ্যটি বাঙালি মধ্যবিত্ত চেতনা ও মননের একেবারে মূলে কুঠারাঘাত করে। তার কারণ দৃশ্যটির মাধ্যমে, কোনও সূক্ষ্মতার তোয়াক্কা না করে, সত্যজিৎ সরাসরি দেখান কী ভাবে অর্থনৈতিক চাপ ও অনিশ্চয়তা নিঃশব্দে মানুষকে গভীর খাদের দিকে ঠেলে দেয়। কণা স্বেচ্ছায় এই পেশায় আসেনি, এসেছে দুঃস্থ পরিবারের ভরণপোষণের জন্য। সেও, সোমনাথের মতোই, ঘুণ ধরা পচাগলা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার এক শিকারমাত্র।
এই জায়গাটিতে ছবিটি ভয়ঙ্কর সমসাময়িক। আজও আমাদের সমাজে বহু নারীকে শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ করতে হয় অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতা থেকে। শুধু তা-ই নয়, বহু নারী আজও এমন কাজের সঙ্গে যুক্ত, যা অনিশ্চিত কিংবা যেগুলিকে ‘ডার্ক জবস’ বলা হয়— অথচ অর্থনীতিকে সচল রাখার জন্য যার গুরুত্ব অপরিসীম। এর মধ্যে পড়ে গৃহশ্রম, সেবা পরিষেবা, সৌন্দর্য পরিষেবা এবং যৌনকর্ম। সত্যজিৎ আমাদের মনে করিয়ে দেন, অর্থনৈতিক সঙ্কট সবাইকে সমান আঘাত করে না। এই সঙ্কটের সবচেয়ে ভারী বোঝা সাধারণত বহন করেন নারীরা।
জনঅরণ্য-কে যে কারণগুলি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে, তার অন্যতম হল এই যে ছবিতে সেই অর্থে নেই প্রতিরোধের কোনও তীব্র, উত্তাল মুহূর্ত কিংবা আবেগঘন পরিত্রাণের আশ্বাস। বরং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সঙ্কটগুলিকে ছবিটি অণুবীক্ষণের তলায় বিশ্লেষণ করে, তা করা হয় একেবারেই হালকা চালে— বিশুদা, নটবর মিত্র (রবি ঘোষ) আর মিসেস বিশ্বাসের (পদ্মা দেবী) মতো আপাত-কমিক চরিত্র ব্যবহার করে। এমনকি ছবির শেষে ভিতর ভিতর সোমনাথের দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়াকেও কোনও যুবকের আকস্মিক বা নাটকীয় পতন হিসাবে দেখানো হয় না। বরং দেখানো হয় ঘুণ ধরা ব্যবস্থার কাছে এক সৎ যুবকের নীরব আত্মসমর্পণ হিসাবে।
এই কারণেই ছবির শেষে যেন মেরুদণ্ড দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বয়ে যায় আমাদের। কারণ আমরা অনুভব করতে পারি, আধুনিক সমাজে আসলে কোনও বড় ট্র্যাজেডির ধাক্কা আমাদের ভেঙে টুকরো টুকরো করে দেয় না। দারিদ্র, বেকারত্ব ও অসাম্যের আবহে, দুর্নীতি আর অন্যায়ের সঙ্গে আপস করতে করতে, সেই দুর্নীতি আর আপসের ভয়ঙ্কর চোরাবালিতেই এক সময় তলিয়ে যাই আমরা।
অর্থনীতি বিভাগ, শিব নাদার বিশ্ববিদ্যালয়
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)