আমি যখন এই লেখাটি লিখতে বসেছি, ঠিক সেই সময় বিহারের মুজ়ফ্ফরপুরে কয়েকশো দরিদ্র নারী হাড়কাঁপানো ঠান্ডার মধ্যে ধর্নায় বসে আছেন। তাঁদের দাবি দু’টি: প্রথমত, তাঁরা মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইন (এমজিএনআরইজিএ বা মনরেগা) মোতাবেক কাজ চান। দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় সরকার মনরেগা-র পরিবর্তে যে কিম্ভূত নামের ভিবি-জিরামজি প্রকল্প এনেছে তা বাতিল করা।
এই মেয়েরা এই প্রথম মনরেগা প্রকল্পে কাজ চাইছেন না। প্রতি বছর তাঁরা কাজের দরখাস্ত জমা দেন এবং, প্রয়োজনে, যত ক্ষণ না কাজ পান, ধর্নায় বসেন। এই মেয়েদের অধিকাংশেরই মনরেগা ছাড়া রোজগারের আর কোনও উপায় নেই। মনরেগা থেকে তাঁদের মোটামুটি ভদ্রস্থ কিছু রোজগার হয়, এটাই প্রকল্পটির প্রতি তাঁদের টানের একটা কারণ।
তবে এর আর একটি গভীরতর কারণ রয়েছে। খুব বেশি দিন আগেও এই মেয়েদের অধিকাংশেরই স্বাধীনতা ও ক্ষমতা বলতে প্রায় কিছুই ছিল না। তাঁদের জীবন কাটত অপরের অধীনে, মূলত চার দেওয়ালের মধ্যেই। নিজেদের হক সম্পর্কে তাঁদের কোনও ধারণা ছিল না। অনেকে মিলে, সামূহিক ভাবে কাজে যোগ দেওয়ার অভিজ্ঞতাও তাঁদের ছিল না। সরকারি কর্তাব্যক্তি ও উঁচু জাতের বাবুদের তাঁরা ভয়ভক্তি করে চলতেন। আজ নিজেদের উপরে তাঁদের বিপুল আস্থা। এবং, তাঁরা এখন স্পষ্টভাষী। তাঁরা জানেন কীভাবে নিজেদের অধিকারের জন্য লড়াই করতে হয়; শুধু কাজের অধিকার নয়, তথ্যের অধিকার, ভোটের অধিকার এবং মর্যাদার অধিকারও। তাঁদের চোখ খুলে যাওয়ার মতো অর্জনটি সম্ভব হয়েছে বহু বছরের যৌথ সংগ্রামের ফলে— মনরেগা-র হাত ধরে।
আমি এ-কথা বলছি না যে, মনরেগা শ্রমিকদের সকলের অভিজ্ঞতা একই রকম। প্রায় বিশ বছর আগে, যখন মনরেগা চালু হয়, তখন আশা করা গিয়েছিল যে, এই নতুন আইনটি অসংগঠিত গ্রামীণ শ্রমিকদের সংগঠিত হতে সহায়তা করবে। এই প্রত্যাশা সর্বত্র সমান ভাবে পূর্ণ হয়নি। কিন্তু কিছু কিছু জায়গায়, যেমন মুজ়ফ্ফরপুরে, এটি সত্যই ঘটেছে। এবং যেখানে ঘটেছে, সেখানে তার প্রভাব হয়েছে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গেও এই আইনের হাত ধরে কিছু কিছু শ্রমিক সংগঠনেরও প্রসার ঘটেছে, যেমন পশ্চিমবঙ্গ খেতমজুর সমিতি। নরেগা অক্ষত থাকলে এবং এর রূপায়ণ আরও ভাল হলে সাধারণ ভাবে শ্রমিক ও তাঁদের সংগঠনগুলির এবং বিশেষত নারী শ্রমিকদের সক্ষমতা অর্জনের প্রক্রিয়াটিও অব্যাহত থাকত। মনরেগা-র একটা সুফলের কথা সকলেই জানে: মানুষের আর্থিক নিরাপত্তা ও উৎপাদনশীল সম্পদ সৃষ্টি (যেমন পুকুর, বাগিচা, বাঁধ, ইত্যাদি); কিন্তু তার পাশাপাশি সক্ষমতা অর্জনের দিকটিও ছিল এই প্রকল্পের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
আক্ষেপ, গত মাসে তড়িঘড়ি করে মনরেগা-র অন্ত্যেষ্টি সম্পন্ন হল। সংসদের উভয় কক্ষে এক দিনে পাশ করিয়ে নেওয়া হল ভিবি-জিরামজি আইন। এই আইন নরেগাকে বাতিল করল। তার জায়গায় চালু করল সম্পূর্ণ ভাবে কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি নতুন প্রকল্প। নয়া আইনে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে বিপুল ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, অথচ তাদের জন্য কার্যত কোনও আর্থিক দায়ভার নির্দিষ্ট করা হয়নি।
মোদী সরকার কৌশলে এমন একটি প্রচার চালাচ্ছে যে, ভিবি-জিরামজি আইনের মূল উদ্দেশ্য হল প্রতিটি গ্রামীণ পরিবারের জন্য বছরে ১০০ দিনের বদলে ১২৫ দিনের কাজের নিশ্চয়তা দেওয়া। এটি অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর। কাজের দিনের সীমা ১২৫ দিনে বাড়ানো মনরেগা-র মধ্যেই সম্ভব, এমনকি আইনে কোনও সংশোধন না করেও। ভিবি-জিরামজি আইনটি খুঁটিয়ে পড়লে বোঝা যায় এর আসল উদ্দেশ্য কী। সে উদ্দেশ্য হল কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা বাড়ানো নয়, বরং তাকে গুটিয়ে আনা। আইনটি অন্তত পাঁচটি উপায়ে এই সঙ্কোচন ঘটায়।
প্রথমত, আইনের ৫(১) ধারা অনুযায়ী কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রযোজ্য হবে “রাজ্যের সেই সকল গ্রামীণ অঞ্চলে, যেগুলি কেন্দ্রীয় সরকার দ্বারা বিজ্ঞাপিত হবে।” এটি কার্যত একটি ‘বোতাম-টেপা’, যার জোরে কেন্দ্রীয় সরকার যে কোনও সময় যে কোনও জায়গায় এই প্রকল্প বন্ধ করে দিতে পারে। ক্ষমতার এ-রকম অপব্যবহার কীভাবে হতে পারে, পশ্চিমবঙ্গ তা ভাল করেই জানে।
দ্বিতীয়ত, আইনটি একটি নতুন আর্থিক কাঠামো চালু করেছে। এই কাঠামোর অধীনে কেন্দ্রীয় সরকার প্রতিটি রাজ্যের জন্য একটি ‘প্রামাণিক বরাদ্দ’ নির্ধারণ করবে। সেই বরাদ্দের মধ্যে রাজ্যগুলিকে মোট ব্যয়ের ৪০ শতাংশ বহন করতে হবে। বরাদ্দের বাইরে গেলে, রাজ্যগুলিকে ১০০ শতাংশ ব্যয় বহন করেও কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশ মানতে হবে। খুব কম রাজ্যই তা করতে সক্ষম হবে। সুতরাং, এই প্রামাণিক বরাদ্দই কার্যত হয়ে দাঁড়াবে ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা। এমনকি সেই সীমার মধ্যেও রাজ্যের ভাগের ৪০ শতাংশ জোগাড় করাও কিছু কিছু রাজ্যের পক্ষে কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তৃতীয়ত, এই আইন প্রতিটি রাজ্যকে প্রতি বছর চাষের ভরা মরসুমে ৬০ দিনের একটি সময়পর্ব ঠিক করতে বলেছে, যে সময়ে কাজের নিশ্চয়তা প্রকল্পটি বন্ধ থাকবে। আপাতদৃষ্টিতে একে যুক্তিসঙ্গত মনে হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে এটি একটি বাড়তি ও অপ্রয়োজনীয় জটিলতা তৈরি করবে। চাষের ভরা মরসুমে এমনিতেই তো মনরেগা-র কাজের চাহিদা কম থাকে। তার জন্য অনর্থক আইনি ব্যবস্থা কেন? আমরা সকলেই জানি, প্রতিটি বাড়তি জটিলতাই কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
চতুর্থত, আইনের প্রথম তফসিলের ৫(৪) ধারা অনুযায়ী ভিবি-জিরামজি’র সব কাজ কেন্দ্রীয় ভাবে বিজ্ঞাপিত প্রকল্পগুলির সঙ্গে ‘সমন্বিত’ ভাবে রূপায়িত হবে। এই বিধিনিষেধ বৃহৎ পরিসরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা কঠিন করে তুলবে, কারণ সমন্বিত প্রকল্পগুলি সাধারণত শ্রম-নির্ভর না হয়ে উপকরণ-নির্ভর হয়ে থাকে।
পঞ্চমত, ভিবি-জিরামজি আইন প্রতিটি ধাপে বায়োমেট্রিক যাচাই, আধার-ভিত্তিক অর্থপ্রদান, জিও-ট্যাগিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ইত্যাদির মতো অত্যাধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করেছে। ডিজিটাল প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে সহায়ক হতে পারে, কিন্তু অপরিণত প্রযুক্তির তড়িঘড়ি প্রয়োগ অতীতে মনরেগা শ্রমিকদের জীবন বিপুল দুর্ভোগ ডেকে এনেছে। নতুন আইনটি শ্রমিকদের দুর্ভোগের সেই অভিজ্ঞতাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছে।
সংক্ষেপে বললে, কর্মসংস্থান নিশ্চয়তার ভিত্তিগুলিকে ক্রমশ দুর্বল করা হচ্ছে, যদিও নামটি বিকৃত রূপে টিকে আছে। কেন্দ্রীয় সরকারের নেতৃত্বে এই কর্মসূচির রূপান্তরের মঞ্চ বেঁধে ফেলা হয়েছে। ভিবি-জিরামজি আইনে তৈরি হওয়া কর্মদিবস ও শ্রমশক্তিকে সম্ভবত প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার মতো কেন্দ্রীয় প্রকল্পগুলির কাজে লাগানো হবে। অভিজ্ঞতা বলে, এই সব প্রকল্পের অনেক ক’টিই প্রধানমন্ত্রীর প্রচারের অন্যতম হাতিয়ার। কাজের অধিকারের সঙ্গে খুব সামান্য সম্পর্কযুক্ত কিছু সুবিধাজনক সূচকের ভিত্তিতে এগুলিকে বিরাট সাফল্য হিসাবে তুলে ধরা হবে। শিগগিরই ভিবি-জিরামজি’কে বিশ্বের বৃহত্তম জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বলে ঢাক পেটানো হবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃত কর্মসংস্থান কমবে এবং কর্মসংস্থান নিশ্চয়তার মূল নীতিটি হারিয়ে যাবে।
কাজের অধিকারের উপরে এই আক্রমণে আশ্চর্যের কিছু নেই। মুজ়ফ্ফরপুরের অভিজ্ঞতা যেমন দেখায় যে, মনরেগা শ্রমজীবী শ্রেণির দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়ায়। এটি বরাবরই সুবিধাভোগী শ্রেণির কাছে— শুধু কর্পোরেট ক্ষেত্র নয়, সস্তা শ্রমের অন্য নিয়োগকারীদের কাছেও— মুনাফা বাড়ানোর পথে একটি বাধা, অন্তত বিরক্তির কারণ হিসাবে বিবেচিত হয়েছে। মানবিক ও নৈতিক কোনও আইন না মানা এই অদ্ভুতুড়ে ভিবি-জিরামজি আইনের বলে মোদী সরকার মুনাফা কামানোর পথে সমস্ত বাধা দূর করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ!
ভিজ়িটিং প্রফেসর, অর্থনীতি বিভাগ, রাঁচী বিশ্ববিদ্যালয়
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)