E-Paper

জলই কি এই যুদ্ধের নির্ণায়ক

সম্প্রতি যুদ্ধের মাঝে ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অভিযোগ করেন যে, আমেরিকা ইরানের কেশম দ্বীপে একটি সমুদ্রের নোনা জল পরিশোধনাগার (ডিস্যালিনেশন প্লান্ট)-এ আঘাত করেছে, যার ফলে প্রভাবিত হয়েছে ৩০টি গ্রামের জল সরবরাহ। তিনি হুমকি দেন, ইরানও ছেড়ে কথা বলবে না।

সৌরজিৎ দাস

শেষ আপডেট: ২১ মার্চ ২০২৬ ০৭:০৪

পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের কারণে এ দেশে রাতের ঘুম ছুটেছে অনেকেরই। রান্নার গ্যাসের নাভিশ্বাস। বেজায় চিন্তায় গৃহস্থ থেকে রেস্তরাঁর মালিক সকলেই। নিত্যপ্রয়োজনের উপাদানে টান পড়লে যে জীবন কতখানি দুঃসহ, তার আভাস মিলতে শুরু করেছে।

ও দিকে পশ্চিম এশিয়ায় উপসাগরীয় মানুষের জীবনে নিত্যপ্রয়োজনের অন্য এক উপাদান ঘিরে শুরু হয়েছে অন্য এক গভীর সঙ্কট। ইরান যুদ্ধ যত তীব্র হচ্ছে, ততই বাড়ছে তাঁদের চিন্তা। গ্যাস বা পেট্রল-ডিজ়েল নয়, সেই সমস্যা জীবনের আরও মৌলিক উপাদানকে ঘিরে, যার নাম— জল।

সম্প্রতি যুদ্ধের মাঝে ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অভিযোগ করেন যে, আমেরিকা ইরানের কেশম দ্বীপে একটি সমুদ্রের নোনা জল পরিশোধনাগার (ডিস্যালিনেশন প্লান্ট)-এ আঘাত করেছে, যার ফলে প্রভাবিত হয়েছে ৩০টি গ্রামের জল সরবরাহ। তিনি হুমকি দেন, ইরানও ছেড়ে কথা বলবে না। এর পরেই উপসাগরীয় রাষ্ট্র বাহরাইন ঘোষণা করে তাদের একটি সমুদ্রের নোনা জল পরিশোধনাগারে ড্রোন হামলা করেছে ইরান। স্বাভাবিক ভাবেই সকলে ধরে নিয়েছিলেন এ বার উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জল পরিশোধনাগারগুলির উপর পরস্পরবিরোধী আক্রমণ হতে চলেছে। তবে, অদ্ভুত আকস্মিক ভাবেই পরিশোধনাগারগুলির উপরে এই আক্রমণ বন্ধ হয়ে যায়। কেন?

উপসাগরীয় অঞ্চলে পানীয় জল চিরকালই একটি দুর্লভ বস্তু। এমনিতেই সেখানে বৃষ্টিপাত কম হয়। তার উপর বেশির ভাগ দেশে জলের চাহিদা পূরণের জন্য বড় স্থায়ী নদী নেই। ঐতিহাসিক ভাবে, এই অঞ্চলটি কেবল পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছিল, তাদের সীমিত ভূগর্ভস্থ জল সরবরাহের উপর নির্ভর করে। কিন্তু ১৯৫০-এর দশক থেকে তেল শিল্পের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে, চাহিদা দ্রুত সরবরাহকে ছাড়িয়ে যায়। ফলে জলস্তরগুলি নষ্ট হয়ে যায় এবং এই অঞ্চলের উন্নয়নশীল দেশগুলি তাদের জলের চাহিদা মেটাতে সমুদ্রের জলকে পানীয় জলে রূপান্তরিত করার প্রক্রিয়ার উপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হয়। কুয়েতের পানীয় জলের ৯০ শতাংশ আসে পরিশোধনাগার থেকে; ওমানে ৮৬ শতাংশ, সৌদি আরবে ৭০ শতাংশ। এমনকি ইজ়রায়েল, যার যোগ রয়েছে জর্ডন নদীর সঙ্গে, সেখানেও পানীয় জলের জন্য পাঁচটি বৃহৎ উপকূলীয় ডিস্যালিনেশন প্লান্ট-এর উপরই নির্ভর করতে হয়।

উপসাগরীয় দেশগুলির নিরিখে, ইরান এই প্রক্রিয়ায় উপরে কম নির্ভরশীল হলেও, জলের সমস্যা সেখানেও রয়েছে। গত পাঁচ বছর ধরে খরার সঙ্গে লড়াই করে আসছে দেশটা। বিশেষজ্ঞরা একমত যে, মানবসৃষ্ট জলবায়ু বিপর্যয়ের ফলে এই সমস্যা দিন দিন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। ফলে জল সহবরাহ অব্যাহত রাখতে ইরানও ক্রমশ ঝুঁকছে পরিশোধন প্রক্রিয়ার দিকে। এমনিতেই গরমকাল আসছে। জলের আকাল বাড়বে। এই অবস্থায় দেশের জল পরিকাঠামোর উপর হামলা হলে তাদেরও সমস্যা বাড়বে বইকি।

বর্তমানে আরব-উপসাগরীয় কূল বরাবর বহু পরিশোধনাগার রয়েছে। তারা বিশাল বৈদ্যুতিক পাম্প এবং হিটারের সাহায্যে লবণাক্ত জলকে পানীয় জলে রূপান্তরিত করে। এই অঞ্চলের লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে, সেই পরিকাঠামো কেবল গুরুত্বপূর্ণই নয়, অপরিহার্যও। এই অবস্থায়, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলি বিলক্ষণ জানে এগুলি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য কতখানি ঝুঁকিপূর্ণ— যদি বড় পরিশোধনাগারগুলি কোনও কারণে বন্ধ হয়ে যায়, তবে কিছু শহরে কয়েক দিনের মধ্যেই পানীয় জলের আকাল দেখা দেবে। অধিকাংশ জল পরিশোধনাগারগুলিই রয়েছে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের লাগোয়া। এই অবস্থায় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিতে হামলা হলে, বন্ধ হয়ে যাবে পরিশোধনাগারগুলির পাম্প। ফলে ব্যাঘাত ঘটবে জল সরবরাহে। তা ছাড়া, পরিশোধনাগারগুলিতে হামলা হলে সোডিয়াম হাইপোক্লোরাইট, ফেরিক ক্লোরাইড এবং সালফিউরিক অ্যাসিড-এর মতো রাসায়নিক পদার্থ ছড়িয়ে পড়ার ফলে দূষিত হবে পরিবেশ।

আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে অসামরিক জলাধারের উপর আক্রমণ স্পষ্টত নিষিদ্ধ। হেগ এবং জেনিভা কনভেনশন মানুষের বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য বস্তুগুলিকে রক্ষা করে। অথচ, যা চলছে, তাকে আটকানোর কোনও উদ্যোগ নেই।

জলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করলে তা কতখানি বিপর্যয় ডেকে আনে, তার সাম্প্রতিকতম উদাহরণ ইউক্রেন এবং প্যালেস্টাইন যুদ্ধ। এখানকার বিদ্যুৎ এবং জল সরবরাহ কেন্দ্রগুলিকে নিশানা বানানোর ফলে জলের ঘাটতি, অনাহার এমনকি হিমায়িত তাপমাত্রায় গুরুতর মানবিক সঙ্কটে ভুগতে হয়েছে মানুষকে। ১৯৯০-৯১ সালে ইরাকের কুয়েত আক্রমণ এবং পরবর্তী উপসাগরীয় যুদ্ধের কথাই ধরা যাক। ওই সময় ইরাকি বাহিনী পিছু হটতে গিয়ে কুয়েতের বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং জল পরিশোধনাগারগুলিতে নাশকতা চালায়। সেই সঙ্গে লক্ষ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ইচ্ছাকৃত ভাবে পারস্য উপসাগরে ঢেলে দেওয়া হয়, যাতে গোটা অঞ্চল জুড়ে শোধনাগারগুলির সমুদ্রের জলের পাইপগুলি দূষিত হওয়ার প্রবল আশঙ্কা দেখা দেয়। সম্প্রতি, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরাও নাকি সৌদি আরবের জল পরিশোধনাগারগুলিকে নিশানা বানিয়েছিল।

ফলে সাম্প্রতিক যুদ্ধ বুঝিয়ে দিল, পরিস্থিতি কতখানি ভঙ্গুর। অদূর ভবিষ্যতেও উপসাগরীয় অঞ্চলে ‘ডিস্যালিনেশন’-এর কোনও বিকল্প তৈরি হবে বলে মনে হয় না। পর্যাপ্ত জলের সরবরাহ না-থাকলে, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, শিল্প এমনকি নগরজীবনও চাপের মুখে পড়বে। শেষ পর্যন্ত জলই কি তবে এই যুদ্ধের নির্ণায়ক হতে চলেছে?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Iran-Israel Situation US-Israel vs Iran US-Iran Conflict LPG Crisis Fuel Crisis Water crisis

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy