E-Paper

নাগরিক অস্বস্তির আয়না

জনশুমারির সংখ্যার ইঙ্গিত, এই পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষার দিক দিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে বেশ দূরত্ব, অদৃশ্য অথচ প্রবল। আর তার মধ্যে কাজ করে একটা চেতনা— শিক্ষার কমবেশি নয়, সংস্কৃতিই শেষ কথা, আর সেই সংস্কৃতির ঠিকানা শহর।

মধুজা বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৬ মে ২০২৬ ০৭:৫৪

সংখ্যা সব কথা ঠিক বলে না, তবু সংখ্যা কি কোনও ধারার দিকে ইঙ্গিত করে। জনশুমারির সংখ্যার ইঙ্গিত, এই পশ্চিমবঙ্গে শিক্ষার দিক দিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে বেশ দূরত্ব, অদৃশ্য অথচ প্রবল। আর তার মধ্যে কাজ করে একটা চেতনা— শিক্ষার কমবেশি নয়, সংস্কৃতিই শেষ কথা, আর সেই সংস্কৃতির ঠিকানা শহর। আরও স্পষ্ট করে বললে, শহর কলকাতা। শহুরে ঠাট্টা-রসিকতা আসলে এক দীর্ঘ দিনের বিশ্বাসকে বহন করে— শহর সংস্কৃতির পথ দেখাবে আর জেলা সেই পথে হাঁটবে।

আজ এই বিশ্বাসের মুখোমুখি দাঁড়াতে দেখা যাচ্ছে এক কন্যাকে— পূজারিণী প্রধান। পূর্ব মেদিনীপুরের এক গ্রাম থেকে উঠে আসা গৃহবধূ, যিনি সমাজমাধ্যমে ইংরেজিতে বিশ্বসাহিত্য, সিনেমা, নারীবাদ বা রাজনীতি নিয়ে কথা বলেন। উচ্চারণে শহুরে ছোঁয়া নেই, পটভূমিতে রান্নাঘর, পরনে সাধারণ শাড়ি— তবু তাঁর বক্তব্য সুসংহত, আত্মবিশ্বাসী। এই অমিলই প্রথমে আকর্ষণ তৈরি করে। আর তার পর— অস্বস্তি।

অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর অনুসারীর সংখ্যা কয়েক লক্ষে পৌঁছেছে। কিন্তু জনপ্রিয়তার সঙ্গেই উঠেছে প্রশ্ন— তাঁর বক্তব্য নিয়ে নয়, তাঁকে ঘিরে। তিনি কি নিজে লিখছেন? তাঁর ভাষা কি তাঁর নিজের? সংসার সামলে এত পড়াশোনা সম্ভব কী ভাবে?

এই প্রশ্নগুলো হাওয়ায় তৈরি হয়নি। পূজারিণী প্রধান তাঁর পড়াশোনার যাত্রাপথ বা কোন অভিজ্ঞতা তাঁকে বিশ্বসাহিত্য ও সিনেমার দিকে নিয়ে এসেছে— সে বিষয়ে খুব বেশি বিশদে কথা বলেননি। কয়েক বছর আগেও যেখানে তাঁর তাকে ছিল সীমিত সংখ্যক বই, এখন তা ভরে উঠেছে দেশি-বিদেশি সাহিত্যে! তাঁর ‘কনটেন্ট’-এর (বিষয়) সম্পাদনা, সঙ্গীত নির্বাচন বা দৃশ্যমাধ্যমের ভাষাও যথেষ্ট পরিশীলিত। ফলে প্রশ্ন ওঠে, এই যাত্রা শুরু কোথা থেকে, আর এত দিন তিনি কোথায় ছিলেন?

এই প্রশ্নের কেন্দ্রে রয়েছে তাঁর বিখ্যাত হওয়ার আগের জীবন— যা আমাদের কাছে প্রায় অদৃশ্য। সেই অদৃশ্যতাই নাগরিক জল্পনাকে তীব্র করে তুলেছে। কারণ, আমরা তো অভ্যস্ত ধারাবাহিকতা দেখতে— এমন কোনও কিছুর হঠাৎ উত্থান আমাদের মনে অবিশ্বাস সৃষ্টি করে।

কিন্তু মজার কথা হল, আমরা কি একই প্রশ্ন শহুরে কোনও বিষয়স্রষ্টার ক্ষেত্রে করি? না কি পূজারিণীর ক্ষেত্রে প্রশ্নগুলো এত তীব্র হয়ে ওঠে কারণ তাঁর পটভূমি আমাদের তৈরি ধারণার সঙ্গে মেলে না?

আমরা অজানতেই ধরে নিই, নির্দিষ্ট আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট চিন্তার সীমানা নির্ধারণ করে। ফলে সেই সীমানা ভেঙে কেউ সামনে এলে তাঁকে সহজে গ্রহণ করা যায় না। বরং আমরা চাই, তাঁর কথার মধ্যে তাঁর জীবনের ছাপ স্পষ্ট থাকুক— গ্রামের হলে গ্রাম্যতা, সংগ্রাম থাকলে তার প্রকাশ থাক। পূজারিণী সেই প্রত্যাশা মানেন না। তিনি নিজের পটভূমিকে আড়ালও করেন না, প্রদর্শনও করেন না— তিনি কেবল কথা বলেন। আর এই স্বাভাবিকতাই অস্বস্তির মূলে।

সমাজমাধ্যম এই অস্বস্তিকে আরও তীব্র করছে। এখানে দ্রুত রায় দেওয়া সহজ— ‘আসল’ না ‘নকল’। কিন্তু এই তাড়াহুড়োর মধ্যেই আমরা ভুলে যাই, উত্তর-আধুনিক সমাজে বুদ্ধি, রুচি বা ভাষার উপর কোনও নির্দিষ্ট শ্রেণির একচেটিয়া অধিকার আর হয়তো নেই।

এখানেই আরও একটি বৈপরীত্য চোখে পড়ে। শহরের মানুষ যখন গ্রামে গিয়ে খামার গড়ে তোলেন বা স্থানীয় পণ্যের ব্যবসা শুরু করেন, আমরা প্রশংসার চোখে দেখি। কিন্তু গ্রামের এক সাধারণ গৃহবধূর মধ্যে শহুরে শিক্ষিত ভাবভঙ্গি দেখলেই সংশয় ঘিরে ধরে।

ফলে পূজারিণী প্রধানকে বার বার নিজের ‘যোগ্যতা’ প্রমাণ করতে হয়— তিনি পড়াশোনায় ভাল ছিলেন, বই পড়ার অভ্যাস ছিল, সময় বার করেন কী ভাবে। তবুও তাঁর বক্তব্য শোনার আগে আমরা তাঁর জীবনের প্রমাণ চাই।

তাঁর উত্থানের আর একটি দিকও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর কথা অনুযায়ী, তিনি নিজেই নিজের জায়গা তৈরি করেছেন, প্রযুক্তি শিখেছেন, বিষয় তৈরি করেছেন, সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিজেকে দৃশ্যমান করেছেন। এই স্বনির্ভরতা যেমন তাঁর শক্তি, তেমনই আমাদের সন্দেহেরও কারণ, কারণ এটি আমাদের চেনা-জানা বর্ণনার সঙ্গে মেলে না।

তাঁর জনপ্রিয়তার সঙ্গে এসেছে বাজারের উপস্থিতি। তাঁর ‘কনটেন্ট’-এ চোখে পড়ছে সূক্ষ্ম ভাবে নানাবিধ প্রসাধন, রোজকার ব্যবহারের খাদ্যসামগ্রী বা বিশ্ববিখ্যাত অনলাইন প্ল্যাটফর্মের উপস্থিতি। এই বাণিজ্যিক সংযোগ স্বাভাবিক, কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়। এই কর্পোরেট প্রবাহের মধ্যেও কি তাঁর কণ্ঠস্বর একই থাকবে?

সম্ভবত এর উত্তর সময়ই দেবে। তবে এটুকু স্পষ্ট— পূজারিণী প্রধানের কাহিনি কেবল এক জন বিষয়স্রষ্টার উত্থানের গল্প নয়। এটি আমাদের প্রতিক্রিয়ার আয়না। তিনি স্বচ্ছন্দ। তাঁকে দেখার সময় অস্বচ্ছন্দ আমরা। কারণ তাঁর উপস্থিতি আমাদের সেই বিশ্বাসকে ভেঙে দেয়, যা আমরা এত দিন মন থেকে বিশ্বাস করে এসেছি।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Social Media Abuse Social Media Post Social Media Social Influencer

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy