পাঁচ বছর আগে বিধানসভা ভোটে রাজ্য জুড়ে যখন তৃণমূলের জয়জয়কার, তখন হুগলির আরামবাগ মহকুমার চারটি কেন্দ্র (পুরশুড়া, খানাকুল, আরামবাগ, গোঘাট) ছিনিয়ে নিয়েছিল বিজেপি। এ বারের ভোটে চারটি কেন্দ্র গেরুয়া শিবির ধরেই শুধু রাখল না, জয়ের ব্যবধানও বহু গুণে বাড়িয়ে নিল। কোথাও তা দ্বিগুণ, কোথাও তিন বা চার গুণ, কোথাও ১২ গুণ!
পুরশুড়ায় বিজেপির বিমান ঘোষ গত বার জিতেছিলেন ২৭,৭৪৩ ভোটে। এ বার সেই ব্যবধান ৫৩,৪৫৩। গোঘাটে গত বারের ৪০৮৭ ভোটের ব্যবধান বেড়ে হল ৪৯,৫৮২! আরামবাগে বিজেপির জয় এসেছে ২৮,৯৫৯ ভোটে। আগের বার তা ছিল ৭,৬৩৭। খানাকুলে সুশান্ত ঘোষ জিতেছিলেন ১২,৮৮৪ ভোটে। এ বার তিনি জিতেছেন ৩৪,৪৮৩ ভোটে।
দু’বছর আগে লোকসভা ভোটের নিরিখে একমাত্র আরামবাগ বিধানসভাতেই তৃণমূল এগিয়েছিল জয় ছিল ৫৪৬ ভোটে। পুরশুড়ায় ২২,৮৯২, গোঘাটে ৫,৮৮৬ এবং খানাকুলে ১৭,১২২ ভোটে এগিয়ে ছিলেন
পদ্ম-প্রার্থী।
বিজেপির জয়ের ব্যবধান বৃদ্ধির কারণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে নদ-নদী ঘেরা মহকুমায়। খানাকুলের বাসিন্দা নাজির চৌধুরীর মতে, ‘‘শিক্ষিত সংখ্যালঘু এবং পরিযায়ী সংখ্যালঘুদের ভোট বিজেপি কার্যত পেতই না। এ বার এই ভোট প্রায় ৬-৭ শতাংশ তারা পেয়েছে। পরিযায়ী শ্রমিকেরা ভিন্ রাজ্যে দিব্যি ভাল থাকা সত্ত্বেও তৃণমূল বাঙালিদের উপরে অত্যাচারের গল্প ফাঁদায় তাঁদের কর্মস্থলে বেকায়দায় পড়তে হয়েছে।’’ আরামবাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক প্রদীপ গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, ‘‘সংখ্যালঘুদের ওয়াকফ-সহ মিথ্যা নানা প্রতিশ্রুতি ছাড়াও তৃণমূলে আঘাত হেনেছে যুবসাথী। কর্মসংস্থানের দিশার বদলে দেড় হাজার টাকার যুবসাথী প্রকল্পে উল্টো প্রভাব পড়ল। ডবল ইঞ্জিন সরকারে সুফল মিলবে বলে আশা সকলের।’’
সাধারণ বহু মানুষের বক্তব্য, মহকুমা জুড়ে তৃণমূলের আমলে সন্ত্রাস, কাটমানি, বালি চুরি থেকে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পে দুর্নীতির জবাব দিতেই মানুষ এককাট্টা হয়েছেন। আলুর বেশি ফলনে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। রাজ্য সরকার মুখে বললেও চাষিকে সুরাহা কার্যত দিতে পারেনি। সমস্ত সম্প্রদায়ের আলুচাষি বিজেপিকে ঢেলে ভোট দিয়েছেন।
তৃণমূলের পরাজিত প্রার্থীদের মধ্যে আরামবাগের মিতা বাগ, পুরশুড়ার পার্থ হাজারিরা মনে করছেন, সার্বিক ভাবে তৃণমূলের কোনও খামতি ছিল না। মানুষ পরিবর্তন চেয়েছেন বলেই এই ফল। গোঘাটের নির্মল মাজির আক্ষেপ, ‘‘মানুষ ধর্মীয় বিভাজনকেই গুরুত্ব দিয়েছেন, উন্নয়নকে নয়।’’ খানাকুলের পলাশ রায় কোনও মন্তব্য করেননি।
সিপিএম প্রার্থী আরামবাগের বীথিকা পণ্ডিত, পুরশুড়ার সন্দীপ সামন্ত, গোঘাটের ফরওয়ার্ড ব্লক প্রার্থী মুক্তারাম ধাউড়ে, খানাকুলের আইএসএফ প্রার্থী শেখ সাদ্দাম হোসেনরা জানিয়েছেন,
রায় মাথা পেতে নিয়েছেন। তাঁদের আশা, বিজয়ীরা মানুষের পাশে থেকে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখবেন। সিপিএমের হুগলি জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য পূর্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের ব্যাখ্যা, ‘‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করতে চাইছিলেন মানুষ। তাতে আমাদের থেকে
সম্ভবত বিজেপিকেই বেশি ভরসা করেছেন তাঁরা।’’
বিমান বলেন, ‘‘তৃণমূলের নানা দুর্নীতি, সন্ত্রাস, নারী নির্যাতন, চাষিদের অবহেলা নিয়ে মানুষ ফুঁসছিলেন। উন্নয়ন নিয়ে ক্রমাগত মিথ্যা বলে ওরা মানুষকে বিভ্রান্ত করছিল। সেই অসুখটা বিজেপি সারিয়ে তুলেছে। মানুষ বিজেপির উপরে আস্থা রেখেছেন।’’ বিমানের সঙ্গে সহমত সুশান্ত, আরামবাগের বিজয়ী হেমন্ত বাগ, গোঘাটের বিজয়ী প্রশান্ত দিগারেরা।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)