Advertisement
E-Paper

বিশ্বের ৯০% মানুষই কেন ডানহাতি? কাজে ডান হাত এগিয়ে দেওয়া শুরু হয় কবে থেকে? কী করত আদিম মানব

বিশ্বের ৯০ শতাংশ মানুষ ডানহাতি। এই প্রবণতা অনেক পুরনো। লক্ষ লক্ষ বছর আগে আদিম মানবও যে কোনও কাজে ডান হাত ব্যবহার করত। এ বিষয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধান হয়েছে।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০৬ মে ২০২৬ ০৮:৫৯
লক্ষ লক্ষ বছর ধরে কাজে ডান হাত ব্যবহার করে এসেছে মানুষ।

লক্ষ লক্ষ বছর ধরে কাজে ডান হাত ব্যবহার করে এসেছে মানুষ। ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।

লেখালিখি, খাওয়াদাওয়া কিংবা মোবাইল ঘাঁটা— যে কোনও কাজে ডান হাত আগে এগিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায় বিশ্বের ৯০ শতাংশ মানুষের মধ্যেই। তাঁরা সকলেই ডানহাতি। ডান হাতে কাজ করতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। কিন্তু কেন? বাঁ হাতের পরিবর্তে নির্দিষ্ট করে ডান হাতই কেন এগিয়ে দেওয়া হয়? কবে থেকেই বা শুরু হল মানুষের এই প্রবণতা? বিজ্ঞানীরা সে বিষয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধান চালিয়েছেন।

মানুষের ডানহাতি প্রবণতা অনেক পুরনো। লক্ষ লক্ষ বছর আগে আদিম মানবও যে কোনও কাজে ডান হাতই ব্যবহার করত। বিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, বিবর্তন, মস্তিষ্কের গঠন এবং জিনগত কিছু জটিলতার সঙ্গে এই প্রবণতার যোগ রয়েছে। একই ধরনের একাধিক অঙ্গের ক্ষেত্রে কোনও একটি অঙ্গকে বেছে নেওয়ার প্রবণতা শুধু মানুষের মধ্যে নয়, অনেক মেরুদণ্ডী প্রাণীর মধ্যেই রয়েছে। কিছু কিছু অমেরুদণ্ডী প্রাণীর মধ্যেও এমন প্রবণতা দেখা যায়। তবে মানুষের সঙ্গে তার ফারাক রয়েছে। মানুষের ক্ষেত্রে যেমন ৯০ শতাংশ এই প্রবণতাকে আত্মীকরণ করেছে, অন্যান্য প্রাণীর ক্ষেত্রে তা ৫০ শতাংশের বেশি দেখা যায়নি। আমেরিকার রাটগার্স বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী স্কট ট্রেভার্স মানুষের ডানহাতি প্রবণতা সংক্রান্ত গবেষণাগুলি নিয়ে একটি রিপোর্ট তৈরি করেছেন। মার্কিন ম্যাগাজ়িন ফোর্বস-এ তা প্রকাশিত হয়েছে।

আদিম মানবের কাজের বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধান করে গবেষকেরা দেখেছেন, ২৬ লক্ষ বছর আগে পাথরের তৈরি প্রাচীনতম যন্ত্রপাতিও নির্মাণ করেছিলেন ডানহাতিরা। তার একাধিক প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। প্রত্ন ও নৃতত্ত্ববিদদের কাছে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুসন্ধান। এর থেকে প্রমাণিত হয়, আধুনিক মানুষ বা হোমো স্যাপিয়েন্সের অস্তিত্বেরও আগে, হোমো ইরেক্টাস পুরোপুরি বিকশিত হওয়ার আগে হোমিনিনদের মধ্যেই ডান হাতে কাজ করার প্রবণতা দেখা দিয়েছিল।

নিয়ান়ডারথালদের ডানহাতি প্রবণতার প্রমাণ আরও স্পষ্ট। তাদের জীবাশ্মের সামনের দিকের দাঁতে যে আঘাতের দাগ পাওয়া গিয়েছে, তা পাথরের কোনও হাতিয়ার দিয়ে বাঁ দিক থেকে ডান দিকে ঘষে টানার ফলে তৈরি হয়েছে। ডানহাতিরাই এ ভাবে হাত ব্যবহার করেন। এমনকি, ছয় থেকে আট বছর বয়সি নিয়ানডারথাল শিশুর দাঁতেও এই আঘাতের চিহ্ন মিলেছে। বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত, আদিম মানুষের এই ডানহাতি প্রবণতা নির্দিষ্ট কোনও বয়সের পর বিকশিত হয়নি। বরং তা ছিল জন্মগত।

ডানহাতি প্রবণতা প্রাচীন এবং সর্বজনীন— এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার পরেও যে প্রশ্নটি থেকে যায়, তা হল কেন? কেন ডান এবং কেন বাম নয়? এ বিষয়ে চারটি সম্ভাবনার কথা অনুমান করেছেন বিজ্ঞানীরা। প্রথমত, বিজ্ঞানীদের একাংশ বিবর্তনের সঙ্গে ডানহাতি প্রবণতার সম্পর্ক চিহ্নিত করেন। তাঁদের দাবি, যে কোনও সূক্ষ্ম কাজের ক্ষেত্রে প্রধান হাতটিই ব্যবহৃত হয়। অন্য হাতটি তাতে সহায়তা করে মাত্র। বিবর্তনের সূত্রগুলি প্রকৃতিতে সেই সমস্ত প্রাণীদেরই সুবিধা করে দিয়েছে, যাদের শারীরিক ও স্নায়বিক গঠন এই ধরনের কাজের সহায়ক। মানুষের ক্ষেত্রেও লক্ষ লক্ষ বছর ধরে তাই ডান হাত জয়ী হয়ে এসেছে।

দ্বিতীয়ত, অনেকেই মানুষের শারীরিক গঠনের সঙ্গে ডান হাতে কাজের প্রবণতাকে জুড়ে থাকেন। তাঁদের ব্যাখ্যা, মানুষের কথা বলা এবং ভাষার নিয়ন্ত্রণ মস্তিষ্কের বাম গোলার্ধে থাকে। এই অংশই শরীরের ডান দিকটিকে নিয়ন্ত্রণ করে। বাকশক্তি এবং অঙ্গভঙ্গির উদ্ভব বাম গোলার্ধের প্রাধান্য এবং ডানহাতি প্রবণতাকে তাই আরও শক্তিশালী করেছে। সভ্যতার বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাম গোলার্ধই মস্তিষ্কের প্রধান নির্বাহী হয়ে উঠেছে। ডান হাত তাকে অনুসরণ করে থাকে।

আর একটি মতে, জটিল এবং পর্যায়ক্রমে সংঘঠিত কাজের জন্য নির্দিষ্ট এক ধরনের স্নায়বিক নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন হয়। এই ধরনের ক্রমভিত্তিক কাজের জন্য মস্তিষ্কের বাম গোলার্ধ বেশি উপযোগী। তাই ডান হাতও বেশি উপযোগী হয়ে উঠেছে।

চতুর্থ ধারণা অনুযায়ী, মানুষ অনুকরণপ্রিয় প্রজাতি। সংখ্যাগরিষ্ঠের সঙ্গে মানিয়ে চলার প্রবণতা সামাজিক ভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে মানুষকে ডানহাতি করে রেখেছে। সময় যত এগিয়েছে, তত তার ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়েছে। বিজ্ঞানীদের একাংশের দাবি, চারটি মতের কোনওটিই একক ভাবে ডানহাতি প্রবণতার কারণ হিসাবে যথেষ্ট নয়। তবে স্নায়ু, সমাজ, জৈব অভিব্যক্তি— সব মিলিয়ে একটি বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

ডান হাতে কাজের প্রবণতার নেপথ্যে বিবর্তনবাদের তত্ত্বটিকে অনেকে মানতে চান না। তাঁদের যুক্তি, বিবর্তনের কারণে যদি মানুষের মধ্যে ডানহাতি প্রবণতা জোরদার হত, তবে এত দিনে বাঁ-হাতিরা বিলুপ্তই হয়ে যেতেন। তাঁরা বিরল হলেও বিলুপ্ত হননি। বিশ্বের প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ বাঁ-হাতি। প্রাচীন মানবের মধ্যেও এই প্রবণতা ছিল। গুহাচিত্র, কঙ্কালের নিদর্শন বিশ্লেষণ করে তা জানা যায়। এ ছাড়া, অতি বিরল হিসাবে রয়েছেন উভহস্ত ব্যবহারকারীরা। এঁরা সব্যসাচী। দুই হাতই সমান ভাবে ব্যবহার করতে পারেন। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ০.১ শতাংশের মধ্যে এই ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বিজ্ঞানীরা জানান, এঁদের মস্তিষ্কের দুই গোলার্ধই সমান ভাবে সক্রিয়। শারীরিক নিয়ন্ত্রণে কারও একক আধিপত্য থাকে না। এতে মনঃসংযোগের সমস্যা হয় বলেও গবেষণার মাধ্যমে দেখিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

Right Hand human body Evolution Neanderthal
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy