E-Paper

মমতার হার, মেয়েদের জিত

পাটুলির রেল বস্তির মেয়েরা বলছিলেন, গত বছর ২৩ সেপ্টেম্বর প্রবল বৃষ্টির পরে তাঁদের ঘরগুলোতে গলা অবধি জল দাঁড়িয়ে যায়।

স্বাতী ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ০৫ মে ২০২৬ ০৮:৫৫

নির্বাচনের আগে পাক্কা পনেরো দিন তৃণমূলের হয়ে দেওয়াল লিখেছিলেন তপন হাজরা। দলের প্রতি সমর্থনে নয়, ভয়-বিরক্তিতে। “না গেলেই হুমকি, টোটোর লাইনে দাঁড়াতে দেবে না।” কেবল সেই ক’দিনের রোজগার হারানোর আক্ষেপ নয়, ভয় ছিল আরও— স্থানীয় থানা তাঁদের স্ট্যান্ড থেকে এত দিন মাসে দু’হাজার টাকা নিত। মাসখানেক আগে জানিয়েছে, ভোটের পরে পাঁচ হাজার টাকা করে দিতে হবে। ও দিকে নেতারা এ-ওর সঙ্গে রেষারেষি করে নতুন নতুন স্ট্যান্ড তৈরি করছে, ফলে কেটে যাচ্ছে প্যাসেঞ্জার। “ওদের যাওয়ার সময় হয়েই গেছিল,” টিভি-তে ফলাফল দেখে বললেন তপন।

টোটো-অটো চালক, ভ্যান চালক, রাস্তার বাজারের খুচরো বিক্রেতা, হকার, রাজমিস্ত্রির জোগাড়ে, পুরসভা-সহ নানা সরকারি সংস্থার নিচু স্তরের ঠিকা কর্মী, এঁরা এত দিন ছিলেন তৃণমূলের সমর্থনের ভিত্তি। এই সব বস্তিবাসী শ্রমজীবী মানুষ সরকারের সহায়তা ছাড়া যাঁদের জীবন-জীবিকা চলে না, তাঁরা তৃণমূল নেতাদের নানা ছোট-বড় দুর্নীতির সব খবরই রাখেন। পুকুর বা ভেড়ি বুজিয়ে জমি করা, বেআইনি জমি দখল, নির্মীয়মাণ বাড়ির অংশ অথবা টাকা দাবি করা, সিন্ডিকেট ব্যবসা, এবং এ সবের ফলে নেতার চার তলা বাড়ি, সত্তর লক্ষ টাকার গাড়ি, সবই তাঁরা দেখেছেন। গরু পাচার, কয়লা পাচার, বালি-পাথর খাদানে টাকা লুট তাঁরা মনে রেখেছেন, সারদার মতো ‘স্ক্যাম’-এর কথাও ভোলেননি। কিন্তু ‘আমার প্রয়োজনে পাশে কে থাকবে?’ এই প্রশ্নের উত্তরে ‘তৃণমূল’ ছাড়া কোনও বিকল্প এত দিন খুঁজে পাননি শহর, শহরতলির দরিদ্র লোক। অধিকাংশ শ্রমজীবী মানুষের নিয়োগ, ব্যবসা বা আবাস, কোনওটারই নথিপত্রে স্বীকৃতি নেই। তাই আইন এড়িয়ে পুলিশ-প্রশাসনের সঙ্গে সামূহিক সমঝোতায় যান তাঁরা। শাসক দলের পক্ষে থাকা সেই সমঝোতার প্রধান শর্ত। ভোটের বাক্সে তৃণমূলকে প্রত্যাখ্যানের অর্থ, শাসক কথা রাখেনি। তোলাবাজি এতই লাগামহীন হয়ে উঠেছে যে, খেটে-খাওয়া মানুষকে রক্ষা করার পরিবর্তে তাঁদের বিপন্ন করে তুলেছে— টোটো বেচে দিয়ে গ্রামে ফেরার কথা ভাবছিলেন তপন।

সেই সঙ্গে রয়েছে স্থানীয় বিধায়কদের উদ্ধত, সংবেদনহীন আচরণে ক্ষোভ। পাটুলির রেল বস্তির মেয়েরা বলছিলেন, গত বছর ২৩ সেপ্টেম্বর প্রবল বৃষ্টির পরে তাঁদের ঘরগুলোতে গলা অবধি জল দাঁড়িয়ে যায়। ড্রেনের জন্য স্থানীয় বিধায়কের কাছে দরবার করলে তিনি বলেন, “ওখানে বস্তি রয়েছে নাকি?” যদিও প্রতি বারই ভোটের সময়ে এসে রাস্তা, ড্রেন, শৌচাগারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে যান তিনি। রেললাইন পেরিয়ে শৌচাগারে যেতে হয়, বৃষ্টি-কুয়াশায় ট্রেন দেখতে না পেয়ে কাটা পড়েছে কারও বোনঝি, কারও স্বামী। বলতে গিয়ে চোখ থেকে স্ফুলিঙ্গ ঠিকরে আসে মেয়েদের। রাজনীতির বৃহৎ চালচিত্রে এ হয়তো ক্ষুদ্র এক রেখা, কিন্তু অজস্র এমন আঁচড় এক হলে বদলে যায় ছবিটা।

এসআইআর-এ কাটা-পড়া ভোট জুড়লে সে ছবি বদলে যেত কি? হয়তো যেত, কিন্তু এ-ও ঠিক যে, অন্তত দু’টি গোষ্ঠী এ বার ভোট দিয়েছেন, যাঁদের ভোট আগে সে ভাবে পড়েনি। এক, পরিযায়ী শ্রমিকরা। বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলিতে বাঙালি শ্রমিকের (অধিকাংশ মুসলিম) নির্যাতনের সংবাদগুলিকে মমতা প্রচারের অস্ত্র করেছিলেন। কিন্তু ভোটের গতি দেখে আন্দাজ হয়, রাজ্যে কাজ না পাওয়ার ক্ষোভ ছাড়িয়ে গিয়েছে হয়রানির ক্ষোভকে। দুই, শাসক দলের ‘ভোট করানোর’ জেরে আগের দু’তিনটি নির্বাচনে যাঁরা ভোট দিতে পারেননি, তাঁরা জবাব দিয়েছেন ভোটের বাক্সে।

আর এক মস্ত প্রশ্ন— লক্ষ্মীর ভান্ডারে টাকা বাড়িয়েও ভোটলক্ষ্মী মুখ ঘোরাল কেন? এ হয়তো আশ্চর্য নয়। বিশ্লেষকরা দেখেছেন, জনকল্যাণমূলক প্রকল্প চালু হলে ভোটের বাক্সে বার দুয়েক তার ফল পায় শাসক দল, তার পর ক্ষয়ে আসে। যেমন, গত লোকসভা ভোট-পরবর্তী সমীক্ষা দেখিয়েছে, ফ্রি রেশন, পিএম আবাস, উজ্জ্বলা থেকে উপকৃতদের প্রায় ৬০ শতাংশ কেন্দ্রকে প্রকল্পের কৃতিত্ব দিয়েছেন, কিন্তু মাত্র ৪৫ শতাংশ বিজেপিকে ভোট দিয়েছেন। সেখানে লক্ষ্মীর ভান্ডার তিনটি নির্বাচনে মমতার ঝাঁপি পূর্ণ করেছে— ২০২১ সালের বিধানসভা, ২০২৩ সালের পঞ্চায়েত, ২০২৪ সালের লোকসভা। এ বার মেয়েদের মুখে শোনা যাচ্ছিল— “দিদি কি ঘর থেকে টাকা দিচ্ছেন? ও তো আমাদেরই টাকা।” অথবা, “ও তো সরকারি প্রকল্প। যে আসবে, সে-ই দেবে।” হয়তো বিরোধীদের প্রচার, তবু মেয়েরা গ্রহণ করেছেন।

বিজেপি বেশি টাকা দেবে, এই আশাই কি করছেন মেয়েরা? সম্ভবত না। ‘অনুদান আজ অভাব মেটালেও কাল কী হবে’— এই প্রশ্নের কোনও উত্তর এ বার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে পাওয়া যায়নি। সারা জীবন লক্ষ্মীর ভান্ডার দেওয়া হবে, আরও বেশি লোক যুবসাথী পাবে, এটাই ছিল তাঁর প্রচার। মেয়েদের প্রশ্ন ছিল অন্য— অতি কষ্টে যে সন্তানকে পড়াচ্ছি, সে চাকরি পাবে তো? চাকরি পেতে গেলে ঘুষ দিতে হয়, এই ধারণা গাঢ় হয়েছে। মেয়ের নিরাপত্তার জন্য আশঙ্কাও ঘনিয়েছে সন্দেশখালি কাণ্ড, আর জি কর কাণ্ড, কসবা আইন কলেজ কাণ্ডে। ধর্ষককে উচিত শাস্তি দেবেন মমতা, এই আস্থা মেয়েরা হারিয়েছে। রাজনীতি শেষ অবধি স্বপ্ন দেখানোর খেলা। কিছু চাল, কিছু টাকার প্রতিশ্রুতিতে আটকে রইলেন মমতা, মেয়েরা এগিয়ে গেল।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Mamata Banerjee TMC

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy