E-Paper
WBState_Assembly_Elections_Lead0_04-05-26

বিপদে ভারতের নগরজীবন

মানব সভ্যতার ইতিহাসে গ্রাম থেকে নগর সভ্যতার বিকাশ এক স্বাভাবিক ঘটনা। কৃষি সভ্যতায় বাণিজ্য ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসাবে নগরের সূচনা। তার পর সমাজ বিকাশের নিয়ম মেনে শিল্পসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে নগরের বাড়বাড়ন্ত।

সুমন কল্যাণ মৌলিক

সুমন কল্যাণ মৌলিক

শেষ আপডেট: ০৪ মে ২০২৬ ০৫:১৬

ভোটের বাজারে পরিবেশের খবর খুব একটা গুরুত্ব পায় না। তবুও চোখে পড়ল, ক্যাগ (কন্ট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল অব ইন্ডিয়া)-এর এক রিপোর্টে দিল্লিতে জলসঙ্কট নিয়ে একাধিক পর্যবেক্ষণ রয়েছে। ক্যাগ দিল্লি জল বোর্ডকে মনে করিয়ে দিয়েছে, দিল্লিতে জলের সঙ্কট বেড়েই চলেছে এবং বোর্ডের যাবতীয় পরিকল্পনা কোনও ফল দিচ্ছে না। আরও উদ্বেগজনক হল— সেখানে বলা হয়েছে ২০১৭-১৮ থেকে ২০২১-২২ সালের মধ্যে ১৬,২৩৪টি পানীয় জলের নমুনা পরীক্ষা হয়েছিল, যার মধ্যে ৫৫% নমুনা পানযোগ্য নয়। জল বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, ২০৪১ সালের মধ্যে দিল্লির সম্ভাব্য জনসংখ্যা হবে ২ কোটি ৮০ লক্ষ, যাঁদের প্রতি দিন ১৬৮ কোটি গ্যালন জলের প্রয়োজন হবে। কিন্তু কেউ জানে না সে জলের জোগান কোথা থেকে আসবে। পশ্চিমবঙ্গের আধুনিক শিল্পশহর হিসাবে পরিচিত দুর্গাপুর এই মুহূর্তে বায়ুদূষণের কারণে পৃথিবীর প্রথম দশটি শহরের মধ্যে একটি। খণ্ডচিত্রগুলি জোড়া দিলে ভারতের শহরগুলির এক হতশ্রী অবস্থা ফুটে ওঠে।

মানব সভ্যতার ইতিহাসে গ্রাম থেকে নগর সভ্যতার বিকাশ এক স্বাভাবিক ঘটনা। কৃষি সভ্যতায় বাণিজ্য ও প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসাবে নগরের সূচনা। তার পর সমাজ বিকাশের নিয়ম মেনে শিল্পসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকে নগরের বাড়বাড়ন্ত। রাষ্ট্রপুঞ্জ ও বিশ্ব ব্যাঙ্কের রিপোর্ট অনুসারে, ভারতের নগরগুলিতে এই মুহূর্তে প্রায় ৫৩ কোটি মানুষের বাস। ২০৫০ সালে নগরবাসীর সম্ভাব্য সংখ্যা হবে ৭৩ কোটি। ২০২২ সালে নীতি আয়োগ ও এশিয়ান ডেভলপমেন্ট ব্যাঙ্ক যৌথ ভাবে এক রিপোর্ট পেশ করে। এতে বলা হয়, দেশের জিডিপির ষাট শতাংশ নগর থেকে আসে। তাই দেশের আর্থিক স্বাস্থ্যের বিকাশের জন্য নগরকে জানা দরকার। ‘জনাগ্রহ’ ও ‘জন আর্বান স্পেস’ নামক দু’টি সামাজিক সংস্থা ভারতের নগরগুলির হালহকিকত নিয়ে ‘শেপিং আর্বান ইন্ডিয়া: বাই ডিজ়াইন, নট বাই ডিফল্ট’ শীর্ষক এক সমীক্ষাপত্র প্রকাশ করেছে, যা গভীর পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে।

এই সমীক্ষা মনে করিয়ে দেয়, গত তিন দশকে জিডিপি বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণের হার। ২০০৫-০৬ থেকে ২০২২-২৩ সালের মধ্যে ২৫ লক্ষ হেক্টর জমি নগরের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যা ১০০টি হায়দরাবাদ শহরের সমান। ভারতের অতীত গ্রাম-নির্ভর হলেও এটা পরিষ্কার যে, আগামী দিনে গ্রাম ও শহরের যোগদান সমান হবে। গ্রামীণ জীবনের অনিশ্চয়তা ও কর্মসংস্থানের অভাব এবং ভাল জীবনের আকাঙ্ক্ষা মানুষকে শহরে আসতে প্ররোচিত করে। ২০৩০ সালের মধ্যে নতুন কাজের ৭০ শতাংশ নগর এলাকায় তৈরি হবে। সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার একটা বড় অংশ নগরের জন্য। কেন্দ্রীয় আবাসন ও নগর উন্নয়ন মন্ত্রক এবং চতুর্দশ ও পঞ্চদশ অর্থ কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ৮.৩৬ লক্ষ কোটি টাকা নগরের পরিকাঠামো খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে। ষোড়শ অর্থ কমিশনে বরাদ্দ দ্বিগুণ হওয়ার কথা।

তা সত্ত্বেও দেখা যাচ্ছে, জিডিপির অগ্রগতি, সরকারি ফান্ডের জোগান নগরবাসীকে উন্নত জীবনের সুবিধা দিতে পারছে না। সাধারণ মানুষ আবাসন পাচ্ছেন না, নিত্যযাত্রীরা খারাপ রাস্তা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতায় নাজেহাল। শহর থেকে সবুজ ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে, বাতাসে দূষণের মাত্রা ক্রমবর্ধমান। এর ফলে দেখা যাচ্ছে নিয়মিত অসুখবিসুখ, চিকিৎসা খাতে ব্যয়বৃদ্ধি, আবহাওয়ার বিপর্যয়। সরকারি প্রতিশ্রুতি সত্ত্বেও ভারতের নগরগুলি আজ বাসস্থান বা কর্মক্ষেত্র হিসাবে আকর্ষণ হারাচ্ছে, বিনিয়োগে ঘাটতি হচ্ছে। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মেট্রোপলিটান সিটির তুলনায় ভারতের নগরগুলির অধোগমনের কারণে ‘গ্লোবাল লাইভেবিলিটি ইন্ডেক্স’-এ ভারতের শহরগুলির স্থান নীচের দিকে।

জনাগ্রহ এই নগর অবক্ষয়ের সঙ্গে যুক্ত মানবিক বিপর্যয়গুলোর কথা সামনে আনে। জয়পুরে শুধু ২০২৩ সালে সড়ক-দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন ৮৪৮ জন। সাম্প্রতিক সময়ে বহু বিজ্ঞাপিত নির্মল মহানগরের তকমাধারী ইন্দোরে দূষিত জল খেয়ে মারা গিয়েছেন ২২ জন। বেঙ্গালুরু শহরে ১৯৭৩-২০২৩ পর্বে নগরায়ণ বৃদ্ধি পেয়েছে ৯৬৬%। এই সময়ে পাল্লা দিয়ে সবুজ কমেছে ৮৮% এবং জলাভূমি হারিয়ে গিয়েছে ৭৯%। আজ বেঙ্গালুরুতে যানজটের সমস্যা এত প্রবল যে, নিত্যযাত্রীরা বছরে কাজের সময়ের ১৬৮ ঘণ্টা যানজটেই আটকে থাকেন। কলকাতাতে গত দুই দশকে সবুজ কমার হার ৪০%। শহরের ‘কিডনি’ বলে পরিচিত জলাভূমির বেশির ভাগটাই ভরাট হয়ে গিয়েছে। ভারতের মহানগরগুলোর মধ্যে জনঘনত্ব সবচেয়ে বেশি মুম্বইয়ে, যেখানকার ৫০% নাগরিক সুযোগ-সুবিধাহীন বস্তিতে থাকেন। এক দিকে যানজটের সমস্যা, অন্য দিকে কলকাতা, পুণে, বেঙ্গালুরুর মতো মহানগরে পথচারী বা সাইকেল আরোহীদের জন্য পৃথক লেনের ব্যবস্থা নেই। দিল্লিতে বায়ুদূষণের কারণে মানুষের গড় আয়ু ৮.২ বছর কমে গিয়েছে। আর ‘রিয়াল এস্টেট বুম’-এর চরিত্রটা উচ্চবিত্তদের জন্য। সুপার লাক্সারি বা প্রিমিয়ার রেঞ্জের আবাসন বানানোর হার ২০১৯ সালে ছিল ২৭%, যা ২০২৪ সালে বেড়ে হয়েছে ৫৬%। মধ্যবিত্তদের কেনার মতো ফ্ল্যাট বানানোর হার এই সময়পর্বে ৪০% থেকে কমে হয়েছে ১৬%। আর নিম্নবিত্তদের কিছু সরকারি সহায়তা প্রকল্প ছাড়া কিছুই নেই।

প্রতিটি নগরের উদ্ভব ও বিকাশের ইতিহাস আলাদা। তাই কোনও একটি টোটকা দিয়ে সব নগরের সমস্যার সমাধান হয় না। কিন্তু সেটাই হচ্ছে। কলকাতা, হাওড়ার মতো প্রাচীন শহর, দুর্গাপুরের মতো শিল্পশহর বা উত্তর-পূর্বের প্রবেশদ্বার শিলিগুড়ি চরিত্রগত ভাবে আলাদা। তাই তাদের নগর পরিকল্পনা আলাদা হওয়া দরকার। সবচেয়ে বেশি দরকার, নগরপালিকা আইনের রূপায়ণ। সেটা একমাত্র সম্ভব যখন নগর উন্নয়ন পরিকল্পনায় সেই নগরের বাসিন্দাদের যুক্ত করা হবে। উপর থেকে চাপিয়ে দিলে তা ব্যর্থ হতে বাধ্য।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Delhi CAG CAG Report

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy