আজ বিকেলের মধ্যেই জানা যাবে, ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভোটে জয়ী দল কে, আগামী পাঁচ বছর কারা সরকার গড়বে। ভোটদানের দু’টি দিন ছিল রক্তপাতহীন, কিন্তু কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভারী বুটের শব্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে নানা অশান্তি। রাজ্যের নানা কোণ থেকে হুমকি, মারধর, বাড়িতে চড়াও হয়ে শাসানির খবর আসছে। শুরু হয়েছে শাসক ও বিরোধী দলগুলির মধ্যে অভিযোগের চাপান-উতোর। শুক্রবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সতর্ক করেছেন, মানুষ যেন নিজের হাতে আইন তুলে না নেন। তিনি রাজ্যের বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী, তাঁর কাছে এমন যুক্তিসঙ্গত, ন্যায়সম্মত বার্তাই প্রত্যাশিত। কিন্তু রাজ্যের নাম যে পশ্চিমবঙ্গ, যার একটি হিংসাদীর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে দীর্ঘ দিন ধরে। মনোনয়ন জমা দিতে যাওয়া থেকে শুরু করে ভোটের ফল বেরোনোর পরও ভোটের বলি হতে থাকে নিরপরাধ মানুষ— দলের বিজয় মিছিল থেকে গুলি ছুটে গিয়ে বালিকার প্রাণ নেয়, ফেলে-রাখা বোমা নিয়ে খেলতে গিয়ে শিশুর হাত-পা উড়ে যায়। এ বারের ভোট যে-হেতু অনেক দিক থেকেই অতি বিশেষ, তৃণমূল-বিজেপি যুদ্ধ এক প্রবল বিন্দুতে পৌঁছেছে, আশঙ্কা স্বাভাবিক যে ভোটের ফল বেরোনোর পরও সেই যুদ্ধ জারি থাকবে, এবং বিভিন্ন স্থানে দলীয় সংঘাত মানবজীবনকে বিপন্ন করবে।
প্রশাসন এবং নাগরিক, দুই তরফেই বিশেষ প্রস্তুতি দরকার— এই আশঙ্কার পরিস্থিতি যাতে না উদ্ভূত হয়, তা নিশ্চিত করার। প্রধান দায়িত্ব অবশ্যই প্রশাসনের, এবং সেখানে আসল চ্যালেঞ্জ দলীয় বিভাজনের উপরে উঠে সব তরফের আইনলঙ্ঘনকারীদের প্রতি সমান তৎপরতা, কঠোরতা প্রদর্শন। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সংখ্যার আতিশয্য সমর্থনযোগ্য নয়, ভোটের দিন নানা জায়গায় সাধারণ মানুষের প্রতি বাহিনীর আচরণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবু মোটের উপরে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতি এবং রাজ্য পুলিশের তৎপরতায় এ বার ভোটদানকে ব্যাহত করার পরিচিত কৌশলগুলি অনেকটাই রুখে দেওয়া গিয়েছে। দলীয় দুষ্কৃতীদের তাণ্ডবে রাশ টেনে পুলিশ-প্রশাসনের উপর ভরসা ফেরার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দলের অঙ্গুলিহেলনে পুলিশ-প্রশাসন কাজ করে, সুবিচার পাওয়া অসম্ভব— নাগরিকের এই হতাশা নির্বাচনী হিংসার পথ খুলে দিয়েছিল। ভোটের ফল ঘোষণার পর পরাজিত নেতা-কর্মীদের ঘর-দোকান লুটপাট, ভয় দেখিয়ে ঘরছাড়া করা যেন ‘স্বাভাবিক’ হয়ে উঠেছিল। জাতীয় স্তরের একটি অসরকারি সংস্থার বিশ্লেষণ অনুসারে, ২০২০ সালের পর থেকে সারা ভারতে নির্বাচন-সম্পর্কিত যত হত্যা হয়েছে, তার ৫১ শতাংশ ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গে। নির্বাচনী হিংসার ৩৫ শতাংশ ঘটেছে এ রাজ্যে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ৫৮ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন, ঘরছাড়া হন অগুনতি মানুষ। সেই ছবিতে পরিবর্তন আনতে হলে এ বারে পুলিশ-প্রশাসনকে স্বমর্যাদায়, স্বশক্তিতে স্থিত থেকে দৃঢ় হাতে দুষ্কৃতী দমন করতে হবে। নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
শৃঙ্খলা রক্ষার দায় অবশ্যই বর্তায় নাগরিকের উপরেও। সমাজমাধ্যমে ভোট-সংক্রান্ত উত্তেজক দৃশ্য বা মন্তব্য না ছড়ানো প্রত্যেকের কর্তব্য। এ বারে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মেরুকরণ যে স্তরে পৌঁছেছে, তাতে বাক্যের হিংসা নিমেষে পরিণত হতে পারে রক্তক্ষয়ী হিংসায়। যে দলই জিতুক না কেন, বিজয়মিছিল সীমিত ও সংযত রাখা দরকার— বাস্তবিক, পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে এ বার রাজনৈতিক দলগুলির উচিত বিজয়মিছিল না করা। রাজনৈতিক পরিচয় বা ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য প্রতিবেশীকে আক্রান্ত, নিগৃহীত হতে দেখলে তৎক্ষণাৎ প্রতিরোধ ও প্রতিকার প্রয়োজন। গণতন্ত্রের শিক্ষা সহনাগরিকের সুরক্ষা। বিরুদ্ধ মত, বিরোধীদলের প্রতি সম্মান। এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে যে দলেরই জয় হোক, পরিবর্তন হোক বা প্রত্যাবর্তন, গণতন্ত্র যেন পশ্চিমবঙ্গে পরাজিত না হয়।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)