অধিকারের কি কম-বেশি বলে কিছু হয়? কোনও অপরাধ ঘটলে, বা তার সুবাদে বিচারব্যবস্থার কাছে অভিযোগ এলে তৎক্ষণাৎ যে বাদী ও বিবাদী দু’টি পক্ষ তৈরি হয়, আইনের শাসন মেনে নিলে ন্যায়বিচারের দাবি কি দু’পক্ষেরই সমান নয়? বহুচর্চিত ও বিতর্কিত এই প্রসঙ্গটিই আরও এক বার উঠে এল সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক মন্তব্যে। হরিয়ানার এক প্রাক্তন বিধায়ক তথা সম্পত্তি-ব্যবসায়ীর সংস্থা ২০১৭-য় নতুন ফ্ল্যাট তৈরি করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে বহু মানুষের কাছ থেকে মোট প্রায় ৩৬৩ কোটি টাকা নিয়েও কাজের কাজ কিছু করেনি, এ-হেন অভিযোগের ভিত্তিতে ইডি-র করা মামলার জেরে ওই ব্যবসায়ী গত প্রায় ষোলো মাস কারাবন্দি। পঞ্জাব ও হরিয়ানা হাই কোর্ট তাঁর জামিনের আবেদন নাকচ করে দেওয়ার পর, সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে তাঁর আইনজীবী অভিযুক্তের জামিনের অধিকার ও দীর্ঘ কারাবাসের কথা তোলায় শীর্ষ আদালত বলেছে— আইনশাস্ত্র দীর্ঘকাল যে অভিযুক্তের অধিকারের কথা বলেছে তা ‘সেকেলে’, নবযুগের আইনশাস্ত্র সেই মানুষদের অধিকার রক্ষা করবে যাঁরা অপরাধের শিকার— অভিযুক্ত ব্যবসায়ী বরং যে অগণিত মানুষের সঙ্গে স্পষ্টত প্রতারণা করেছেন, তাঁদের টাকা শোধের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা সামনে আনুন।
ন্যায়বিচারের অধিকার সময়-নির্বিশেষে সত্য, তর্কাতীত। ভারতের সংবিধানেও তার সুরক্ষা স্পষ্ট করে দেওয়া আছে, ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের অধিকার নিশ্চিত করেছে। কিন্তু সাংবিধানিক নিশ্চয়তা ও সামাজিক বাস্তবতা এক নয়, অন্তত ভারতের মতো দেশে। এখানে অপরাধের শিকার যাঁরা তাঁদের দুর্দশার অন্ত নেই, আর অপরাধী বা অভিযুক্ত শাস্তি এড়িয়ে বা নামমাত্র শাস্তিভোগ করে, জামিন পেয়ে নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এমন উদাহরণ ভূরি ভূরি। সমগ্র ব্যবস্থা তথা কাঠামোটি এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, অপরাধের শিকার যাঁরা, তদন্তে বা পরে বিচারপ্রক্রিয়ার নানা ধাপেও তাঁদের দিকে মনোযোগ থাকে ন্যূনতম; এঁদেরও যে আইন বা বিচারের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের এবং সংশ্লিষ্ট সব তথ্য জানার অধিকার আছে, সবচেয়ে বড় কথা রাষ্ট্রের আইন যে তাঁদের সঙ্গে ঘটা অপরাধের সত্যতা স্বীকার করছে, তার নিশ্চয়তাটুকুও সব সময় স্পষ্ট নয়। শীর্ষ আদালতের মন্তব্যে অপরাধের শিকার নাগরিকদের ন্যায়বিচারের অধিকার রক্ষা করার উচ্চারণ তাই আশা জোগায়।
এও মনে রাখার, ভারতে বিনা বিচারে বা বিচার ও জামিনের অপেক্ষায় থাকা ‘অভিযুক্ত’-এর সংখ্যাও অজস্র, এবং এঁদের অনেকেই রাষ্ট্র তথা শাসকের অসূয়ার শিকার। কারাবাস নয়, জামিনই প্রত্যাশিত নিয়ম— সংবিধান-স্বীকৃত ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকারের সুরে সুর মিলিয়ে সম্মাননীয় সুপ্রিম কোর্টই এ কথা বললেও, বিপরীত উদাহরণ আজকের ভারতে মোটেই কম নয়। দেশের আদালতগুলিতে বিচারাধীন মামলার স্তূপ, কারাগারগুলি ধারণক্ষমতার অধিক অভিযুক্ত ও অপরাধীতে পূর্ণ, এই সবই সত্য; তথ্যপ্রমাণেও স্পষ্ট, এই মানুষগুলির একটা বড় অংশ দ্রুত ও ন্যায্য বিচার, নিদেনপক্ষে জামিনের অধিকার থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। অপরাধের শিকার এবং অভিযুক্ত এই দু’পক্ষের ন্যায়বিচারের অধিকার, এবং জটিল, বহুস্বার্থদুষ্ট সমাজ-রাজনৈতিক বাস্তবতা— দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ সামলেই ভারতীয় বিচারব্যবস্থাকে পথ চলতে হবে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)