ভোটারতালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন তৈরি করেছে রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতার এক বেদনাদায়ক আখ্যান— কিন্তু, অভূতপূর্ব নয়। সাম্প্রতিক অতীতে রাষ্ট্র তার নিষ্ঠুরতার প্রমাণ দিয়েছে অন্তত আরও দু’বার— এক বার নোট বাতিলের সময়; আর এক বার লকডাউনে। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত কী ভাবে সাধারণ মানুষের জীবন লন্ডভন্ড করে দিতে পারে, তার দুই মোক্ষম উদাহরণ। এখন এসআইআর-এর মাধ্যমে তৈরি হচ্ছে সেই নিষ্ঠুরতার তৃতীয় আখ্যান।
রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতা আর খুব বিস্মিত করে না। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে, বিভিন্ন রাষ্ট্র তার ছাপ, তার উত্তরাধিকার রেখে যেতে চায়। বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা হয়তো নিষ্ঠুরতার ছাপ রেখে যেতে চায়। চার পাশের দুনিয়ার দিকে তাকালে, বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কার্যকলাপ দেখলে মনে হয় যে, এই প্রবণতা জাতীয় নয়, আন্তর্জাতিক। কিন্তু এখনও যা বিস্মিত করে, তা হল এই সব নিষ্ঠুরতা যে ভাবে নাগরিকদের থেকেই নৈতিক সমর্থন আদায় করে, সেই ঘটনাটি। সেই প্রবণতা দেখেছি নোট বাতিলের সময়, লকডাউনের সময়। আবার সেটি ফিরে এসেছে এসআইআর-এর ক্ষেত্রে।
যাঁরা এই রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতার পক্ষে যুক্তি দেন তাঁরা উচ্চশিক্ষিত, উচ্চ আয়ের শ্রেণিভুক্ত, এবং সমাজের এগিয়ে থাকা অংশের মানুষ। নির্বাচনী তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া যে নিরবচ্ছিন্ন আতঙ্কের স্রোত তৈরি করেছে, তার বিপরীতে প্রধানত দু’টি যুক্তি তাঁদের থেকে শুনতে পাই। প্রথমটি হল, এই সংশোধনী একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। এটি আগেও হয়েছে, পরেও হবে। এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আর দ্বিতীয়টি হল, এই প্রক্রিয়া সাম্যের নীতি বজায় রাখছে— হাসিম শেখ আর রামা কৈবর্ত যেমন শুনানির ডাক পাচ্ছেন, তেমনই ডাকা হচ্ছে অমর্ত্য সেনের মতো মানুষকেও। এই দু’টি যুক্তি আপাতভাবে ভুল কিছু নয়, কিন্তু যে কোনও যুক্তির বৈধতা যুক্তির নিজস্ব অন্তঃকাঠামোর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে সমসাময়িক পরিস্থিতির উপরেও।
এ কথা ঠিক যে, ২০০২ সালেও এসআইআর হয়েছিল। অথচ কেউ সে ভাবে টের পাননি, কারণ তা এত প্রবল আলোচিত বিষয় ছিল না। ছিল না, কারণ সংশোধিত তালিকায় নাম থাকা বা না-থাকা শুধুই ভোট দেওয়া বা না-দেওয়ার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল— তা নাগরিকত্বের প্রমাণ হয়ে ওঠেনি। ওঠেনি এই কারণে নয় যে, তখন সমাজমাধ্যম ছিল না এবং মানুষ কম আতঙ্কিত হত— হয়নি, কারণ তখন কোনও অন্তঃসত্ত্বা ভারতীয় নাগরিককে শুধুমাত্র বাংলায় কথা বলার অপরাধে সীমান্ত পার করে চালান করে দেওয়া হয়নি প্রতিবেশী দেশে, অথবা ভিন রাজ্যে কাজের খোঁজে যাওয়া মানুষকে বাংলা বলার ‘অপরাধ’-এ পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়নি। সুতরাং, এ বারের নির্বাচনী তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনীকে অন্য বারের সংশোধনীর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা সত্যের অপলাপ। আর তাই মানুষ যে আতঙ্কিত হচ্ছেন, তা অকারণ নয়, যুক্তিসঙ্গত ভয়।
দ্বিতীয় যুক্তি অর্থাৎ সাম্যের যুক্তি যাঁরা দিচ্ছেন, তাঁদের মনে করিয়ে দেওয়া দরকার যে, কোনও সাম্যের ধারণাই সমভাবে নৈতিক নয়। সবাইকে সমভাবে দেখার যে সাম্যের ধারণা, তা যান্ত্রিক। সাম্যের গভীরতর ধারণা ‘বিষম’কে বিষম ভাবে দেখতে শেখায়। মনে আছে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্ক্সবাদী তত্ত্বের প্রবাদপ্রতিম অধ্যাপক অজিত চৌধুরী সাম্যের গভীরতর ধারণা বোঝাতে গিয়ে দিয়েছিলেন মহাভারতের উদাহরণ— বলেছিলেন বনবাস পর্বে কুন্তির কথা, যিনি সংগৃহীত খাবারের সিংহভাগ বিশালদেহী ভীমের জন্য রেখে বাকিটা ভাগ করতেন বাকি চার ভাইয়ের মধ্যে। অজিতবাবু বলতেন, সাম্যের এই গভীরতর ধারণা যা যান্ত্রিক সাম্যের ধারণার থেকে অনেক বেশি নৈতিক, তা ভারতীয় চিন্তার জগতে বহু কাল ধরেই বিরাজমান। এই আলোচনায় যাওয়ার প্রয়োজন হল, কারণ নির্বাচন কমিশন যে এগারোটি নথিকে (আধার কার্ড ধরলে বারো, কিন্তু শুধু আধার দিয়ে নাম তোলা যাবে না) ভোটারতালিকায় নাম তোলার জন্য স্বীকৃতি দিয়েছে, তা সাম্যের এই গভীরতর নৈতিকতার পরিপন্থী। এই নথিগুলি হল— সরকারি চাকরির প্রমাণপত্র; ১৯৮৭-র আগে বিভিন্ন সরকারি দফতর দ্বারা দেওয়া পরিচয়পত্র; জন্ম শংসাপত্র; পাসপোর্ট; শিক্ষার প্রমাণপত্র; রাজ্য সরকারের দেওয়া স্থায়ী বসবাসের শংসাপত্র; অরণ্য অধিকারের শংসাপত্র; জমি বা বাড়ির নথি; পারিবারিক রেজিস্টার; এবং বিহারের ২০০২-এর বিশেষ সংশোধিত তালিকায় নাম। সবার জন্যই এই সব নথি প্রামাণ্য বলে স্বীকৃত, তাই এই আইন সমতামূলক। কিন্তু এই সমতার ধারণাটি যান্ত্রিক, কারণ সমাজের সব স্তরের মানুষের জন্য এই সব নথি পাওয়ার সম্ভাবনা সমান নয়। সমাজের উপরতলায় থাকা বড়লোকদের কাছে এই সব নথি থাকা যত সহজ, সমাজের নীচে পড়ে-থাকা গরিব মানুষের জন্য তা তত সহজ নয়।
কারা সরকারি চাকরি করে? পাসপোর্ট থাকে কাদের? জমি-বাড়ির মালিক হয় কারা? ২০১১-র জনগণনা অনুযায়ী মাধ্যমিক পাশ করেছেন মোট জনসংখ্যার মাত্র ১১%। তা হলে বাকিরা কী ভাবে শিক্ষার শংসাপত্র দেবেন? আর জন্মের শংসাপত্র এখন যত সহজে পাওয়া যায়, আগে তা ছিল না। ২০০৫-০৬ সালের তৃতীয় জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষার (ন্যাশনাল ফ্যামিলি হেলথ সার্ভে, বা এনএফএইচএস-৩) রিপোর্ট অনুযায়ী, সেই সময়ের ৬১% শিশুই জন্মেছে বাড়িতে। সেই শিশুদের বয়স এখন কুড়ির আশেপাশে, অর্থাৎ সদ্য ভোটাধিকার পেয়েছে তারা। তার আগে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি ছিল। একুশ শতকেও যে সব পরিবারে মহিলাদের বাড়িতে প্রসব করতে হয়, তার অধিকাংশই নিশ্চিত ভাবে দরিদ্র। তেমন পরিবারের পক্ষে বাড়িতে জন্মানো শিশুর জন্ম শংসাপত্র জোগাড় করা অসম্ভব না হলেও কঠিন। ভেবে দেখুন সেই ভূমিহীন খেতমজুর বা পরিযায়ী শ্রমিকের কথা, বন্যায় যাঁর ঘর ভেসে যায় বার বার, যিনি সামান্য অন্নসংস্থানের জন্য কাজ করেন অন্যের জমিতে, বা বাড়িঘর ছেড়ে ঘুরে বেড়ান এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে। কাগজ খুঁজে এনে তাঁকেই নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হবে, এমন দাবি আইনসম্মত যদি বা হয়ও, তাকে কতখানি নৈতিক বলা চলে? আর যদি তিনি তা না পারেন, কতটা নৈতিক তাঁকে অনুপ্রবেশকারী হিসাবে দেগে দেওয়া?
রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতার ইতিহাস ভারতে নতুন নয়। প্রবীণ মানুষ বা ভারতের স্বাধীনতা-উত্তর রাজনৈতিক ইতিহাসের পাঠকের মনে থাকতে পারে সঞ্জয় গান্ধীর অনুশাসন পর্ব, মনে থাকতে পারে মরিচঝাঁপি। সব ক্ষেত্রেই জটিল সমস্যার সরল সমাধানের উদ্দেশ্যে কঠোর ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হয়, আর সেই সরল সমাধানের ফাঁকফোকর ঢেকে দেওয়া হয় বলপ্রয়োগের মাধ্যমে। সঞ্জয় গান্ধীর অনুশাসন পর্বের স্লোগানকে তীব্র কষাঘাত করে শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন, ‘কঠোর বিকল্পের পরিশ্রম নেই’। রাষ্ট্র নাগরিকদের জন্য পরিশ্রম করে না কখনও, বার বার তাই রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতার মোড়কে হাজির করে কঠোর বিকল্পদের। এই প্রক্রিয়া কোনও ভ্রান্তির পরিণাম নয়। এটি শাসনের একটি সুপরিকল্পিত পদ্ধতি, যেখানে কঠিন অনুশাসনের নিগড় নাগরিককে ত্রস্ত করে রাখে। ত্রস্ত হতে হতে নাগরিক মেনে নেন এই নিষ্ঠুরতাকে, মনে করেন সুশাসনের জন্য এই নিষ্ঠুরতা অনিবার্য।
সমস্যা হল আমাদের সমাজে যে কোনও প্রতিবাদই খুব রাজনৈতিক দল-কেন্দ্রিক। কিন্তু যে কোনও দলই আসলে চায় রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নিষ্ঠুরতার এই প্রকল্পকে টিকিয়ে রাখতে। সেটাই দলকেন্দ্রিক প্রতিবাদের সীমাবদ্ধতা। রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতার বিপ্রতীপে তাই প্রয়োজন নাগরিক সমাজ-কেন্দ্রিক প্রতিবাদ, সমাজমাধ্যমের যুগে যা খুব কঠিনও নয়। কিন্তু আশঙ্কার কথা যে, সাম্প্রতিক অতীতে রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতার এই পর্যায়গুলিতে নাগরিক সমাজের প্রতিরোধ সে ভাবে দেখা যায়নি। যেটুকু যা প্রতিরোধ সেটি বিভিন্ন দলের তরফ থেকেই হয়েছে। ব্যক্তিনাগরিক শুধু নিজেরটুকু বজায় রাখতে পারলেই খুশি— নির্বাচনী তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনীর ক্ষেত্রে যেমন নিজের কাগজপত্র ঠিক থাকলেই তাঁর আর চিন্তা নেই। কোনও ভাবে তাঁরা সমষ্টির স্বর হয়ে বলছেন না যে, এই প্রক্রিয়া অনৈতিক— আমার কাগজ থাক আর না-ই থাক, আমি এর বিরোধিতা করি। এই বিপন্ন সময়ে কিন্তু সেই সমষ্টির স্বরই প্রয়োজন।
অর্থনীতি বিভাগ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)