E-Paper

ব্যাঙ্কের উপরে চাপ বাড়ছে

রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ব্যাঙ্কে ঋণের বৃদ্ধির হার আমানতের বৃদ্ধির তুলনায় বেশি। ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় ঋণ-আমানত অনুপাত বহু ক্ষেত্রে বেশ চড়া। অর্থাৎ, ব্যাঙ্ক যত ঋণ দিচ্ছে, তার তুলনায় সস্তা আমানতের তহবিল ক্ষীণতর হচ্ছে।

নীলাঞ্জন দে

শেষ আপডেট: ১১ মার্চ ২০২৬ ০৫:৪৭

আজকাল পাড়ার ব্যাঙ্কে তেমন ভিড় দেখা যায় না। খুব প্রয়োজন না হলে বা একেবারে অপারগ না হলে কেউ আর শাখায় যান না। মোবাইল ফোন আর ল্যাপটপের পর্দাই এখন প্রধান ভরসা। লেনদেন, বিল পেমেন্ট, স্টেটমেন্ট— সবই হাতের মুঠোয়। তবু যদি হঠাৎ কোনও ব্যাঙ্কের শাখায় ঢোকেন, বুঝতে পারবেন যে, পরিস্থিতি এখন অন্য রকম। কর্মীরা এখন বিশেষ আগ্রহী আমানত, বিমা বা বিনিয়োগ প্রকল্প নিয়ে কথা বলতে। কারণ সরল— আমানত জোগাড় করার চাপ বেড়েছে। বহু বছর পরে এমন চাপ স্পষ্ট।

রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, ব্যাঙ্কে ঋণের বৃদ্ধির হার আমানতের বৃদ্ধির তুলনায় বেশি। ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় ঋণ-আমানত অনুপাত বহু ক্ষেত্রে বেশ চড়া। অর্থাৎ, ব্যাঙ্ক যত ঋণ দিচ্ছে, তার তুলনায় সস্তা আমানতের তহবিল ক্ষীণতর হচ্ছে। সস্তা আমানত মানে, যে আমানতের উপরে গ্রাহককে তুলনায় কম সুদ দিতে হয়— যেমন, সেভিংস অ্যাকাউন্টে আমানত। নগদের জোগান এখনও সঙ্কটের স্তরে পৌঁছয়নি, কিন্তু তহবিলের কাঠামো বদলাচ্ছে। ঋণ যদি এই গতিতে বাড়তে থাকে এবং আমানত পিছিয়ে পড়ে, তা হলে তহবিল সংগ্রহের খরচ বাড়বে— এবং, তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত ঋণ বিতরণেও পড়বে।

সারা দেশেই ঋণের চাহিদা বাড়ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে খুচরো গ্রাহক— সবাই ঋণ চাইছেন। পার্সোনাল লোন, কনজ়িউমার লোন, এবং বাড়ি কেনার জন্য ঋণ গত কয়েক বছরে ধারাবাহিক ভাবে দশ শতাংশের চেয়ে বেশি হারে বেড়েছে। সাম্প্রতিক হিসাবে গৃহস্থালি ঋণ এখন জিডিপি-র প্রায় ৪১ শতাংশের উপরে। আন্তর্জাতিক তুলনায় এই অনুপাত অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু বৃদ্ধির গতি তাৎপর্যপূর্ণ। ঋণনির্ভর ভোগ অর্থনীতিকে গতি দেয়, সন্দেহ নেই। কিন্তু সেই ঋণের জোগান যদি স্থিতিশীল আমানতের ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে না থাকে, তা হলে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

এই প্রেক্ষাপটে সুদের হার গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েকটি ত্রৈমাসিকে রেপো রেট বা রিজ়ার্ভ ব্যাঙ্কের নির্দেশক সুদের হার মোট ১২৫ বেসিস পয়েন্ট কমেছে। রেপো রেট কমে এলে আমানতের উপর সুদ কমে। অন্য দিকে, সরকারি হিসাবে দেশে মূল্যবৃদ্ধির হার এখন নিয়ন্ত্রিত। কিন্তু আমানতকারীর জন্য প্রশ্নটা অন্য: আমানতের উপর প্রকৃত সুদ কত? টাকার অঙ্কে সুদ থেকে ভোগ্যপণ্য মূল্যসূচকের নিরিখে মূল্যবৃদ্ধি বাদ দিলে হাতে কী থাকে? প্রকৃত সুদ কমে গেলে ব্যাঙ্কে টাকা রাখার প্রণোদনা কমে। আমানত বৃদ্ধির শ্লথতার মূল কারণ এটাই।

একই সঙ্গে সঞ্চয়ের চরিত্রও বদলাচ্ছে। আগে নিরাপত্তাই ছিল প্রধান বিবেচনা। এখন নিরাপত্তার সঙ্গে বৃদ্ধি— দুই-ই চাই। অ্যাসোসিয়েশন অব মিউচুয়াল ফান্ডস ইন ইন্ডিয়া-র তথ্য অনুযায়ী, এসআইপি-র মাধ্যমে লগ্নি, এবং সামগ্রিক মিউচুয়াল ফান্ড সম্পদ উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে। ইন্ডেক্স ফান্ডে অংশগ্রহণ বাড়ছে, ডিম্যাট অ্যাকাউন্টের সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে। পুঁজির বাজারের গভীরতা বাড়া অর্থনীতির পক্ষে ইতিবাচক, কারণ এতে অর্থায়নের বহুতর উৎস তৈরি হয়। কিন্তু ব্যাঙ্কের কাছে এটি প্রতিযোগিতা— সঞ্চয়কারীর সামনে বিকল্প যত বাড়বে, আমানত ধরে রাখা তত কঠিন হবে।

ব্যাঙ্কের তহবিল কাঠামোয় কারেন্ট ও সেভিংস অ্যাকাউন্ট আমানতের সবচেয়ে সস্তা উৎস। এই ভিত্তি দুর্বল হলে ব্যাঙ্ককে তুলনায় চড়া সুদে ‘বাল্ক ডিপোজ়িট’ তুলতে হয়। তাতে আমানত সংগ্রহের ব্যয় বাড়ে, এবং নেট ইন্টারেস্ট মার্জিন— অর্থাৎ, যে সুদের হারে ব্যাঙ্ক ঋণ দেয়, আর যে হারে তহবিল সঞ্চয় করে, তার ব্যবধান— চাপে পড়ে। মার্জিন কমলে ব্যাঙ্ক হয় ঋণের সুদ বাড়ায়, নয়তো ঝুঁকির মানদণ্ড শিথিল করে— দু’টিই দীর্ঘমেয়াদে বিপজ্জনক। যদি তহবিল সংগ্রহের খরচ ধারাবাহিক ভাবে বাড়ে, তা হলে ঋণ প্রদানের গতি কমবে। অর্থাৎ, আর্থিক বৃদ্ধির উপরেও প্রভাব পড়তে পারে।

ভারতের কর্পোরেট বন্ড বাজার গত এক দশকে দ্রুত বেড়েছে। ২০১৫ সালে এই বাজারের আয়তন ছিল প্রায় ১৭ লক্ষ কোটি টাকা; ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৫৪ লক্ষ কোটি টাকা। গড় বার্ষিক বৃদ্ধির হার প্রায় ১২%। তবুও সামগ্রিক আয়তন জিডিপি-র মাত্র ১৫-১৬%। অর্থাৎ ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার তুলনায় এটি এখনও সীমিত। তবু দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প অর্থায়নে স্বল্পমেয়াদি আমানতের উপরে অতিরিক্ত নির্ভরতা সম্পদ-ঋণ অসামঞ্জস্য তৈরি করে। গভীর ও নগদ-সমৃদ্ধ বন্ড বাজার সেই চাপ কমাতে পারে, এবং দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের বিকল্প পথ তৈরি করতে পারে। বন্ড বাজার ব্যাঙ্কের বিকল্প নয়, বরং প্রয়োজনীয় পরিপূরক।

নীতিনির্ধারকেরাও এই প্রবণতা লক্ষ করছেন। ঋণের চাহিদা নিয়ে উদ্বেগ কম, কিন্তু তহবিলের গুণগত মান এবং স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন আছে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার, সহজ অনবোর্ডিং, গ্রাহক পরিষেবার দক্ষতা— এ সব কেবল প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়; এগুলি তহবিল সংগ্রহের কৌশল।

ভারতের সঞ্চয় কাঠামো ধীরে ধীরে ব্যাঙ্ক-কেন্দ্রিক মডেল থেকে বাজার-নির্ভর মডেলের দিকে সরে যাচ্ছে। ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা যদি এই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত না-হয়, তবে চাপ বাড়বে। ঋণের চাহিদা কমবে না। প্রশ্ন হল, ব্যাঙ্কগুলি কি সেই চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তহবিল সংগ্রহ করতে সক্ষম হবে?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

investments Bank Employees Indian Economy Share Market Banks

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy