E-Paper

যেন একটি যুগের অবসান

প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও গণতান্ত্রিক সঙ্কটের এ সময়ে হাবারমাসের প্রশ্নগুলি প্রাসঙ্গিক: কী ভাবে যুক্তিনির্ভর জনআলোচনা টিকে থাকবে? কী ভাবে বৈধতা প্রতিষ্ঠিত হবে?

শিবাশিস চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:২০

ইউর্গেন হাবারমাসের প্রয়াণ এক অসাধারণ বৌদ্ধিক জীবনের অবসান, যে জীবন প্রায় এক শতাব্দী জুড়ে আধুনিক সমাজবিজ্ঞান, দর্শন ও রাজনৈতিক চিন্তাকে প্রভাবিত করেছে। খুব কম দার্শনিকই এত ধারাবাহিক ভাবে দর্শন, সমাজতত্ত্ব, রাজনৈতিক তত্ত্ব ও জনজীবনের মধ্যে সেতুবন্ধ গড়তে পেরেছেন। তাঁর সময়ের নৈতিক ও রাজনৈতিক সঙ্কটের সঙ্গে নিবিড় ভাবে যুক্ত থেকে হাবারমাস এমন এক যুগে যুক্তিনির্ভর বিতর্কের সম্ভাবনা সযত্নে লালিত করেছেন, যখন মতাদর্শগত কঠোরতা, প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রণ ও গণতান্ত্রিক অবক্ষয় ক্রমশ মনুষ্যত্বের প্রতি বিশ্বাসের অপমৃত্যু ডেকে এনেছে।

১৯২৯-এ ডুসেলডর্ফে জন্ম, নাৎসি জার্মানির ধ্বংসস্তূপ ও তার নৈতিক পুনর্মূল্যায়নের প্রেক্ষাপটে তাঁর বেড়ে ওঠা। তাঁর প্রজন্মের অনেকের মতোই তাঁর প্রশ্ন ছিল, কী ভাবে একটি আধুনিক ও সাংস্কৃতিক ভাবে উন্নত সভ্যতা বর্বরতায় পতিত হতে পারে? এই উদ্বেগ তাঁকে ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের চিন্তাবিদদের নিকটবর্তী করলেও, তিনি তাঁদের সার্বিক নৈরাশ্যবাদ অতিক্রম করেন ও আলোকায়নের যুক্তিবাদের মুক্তিকামী সম্ভাবনাকে পুনর্গঠনের প্রকল্পে আত্মনিয়োগ করেন।

দ্য স্ট্রাকচারাল ট্রান্সফর্মেশন অব দ্য পাবলিক স্ফিয়ার (১৯৬২) বইটি তাঁকে গণতান্ত্রিক তত্ত্বের এক মুখ্য তাত্ত্বিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তিনি দেখিয়েছিলেন কী ভাবে কফিহাউস, পার্লার, প্রাথমিক সংবাদমাধ্যমের মতো ক্ষেত্রগুলি নাগরিকের জন্য এমন এক পরিসর তৈরি করেছিল, যেখানে তারা রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই যুক্তিনির্ভর সমালোচনামূলক আলোচনায় যোগ দিতে পারত। পরবর্তী কালে এই পরিসরগুলির অন্তর্নিহিত বৈষম্য স্বীকার করলেও, তাঁর মূল বক্তব্য অটুট ছিল: গণতন্ত্র শুধু প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর উপর নির্ভর করে না, বরং এমন যোগাযোগমূলক প্রক্রিয়ার উপর নির্ভর করে যা নাগরিক বিতর্ক জীবন্ত রাখে। রাজনৈতিক বৈধতা জোরপ্রয়োগে নয়, বরং উন্মুক্ত যুক্তিনির্ভর আলোচনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়।

এই ধারণা আরও গভীরতা পায় তাঁর দ্য থিয়োরি অব কমিউনিকেটিভ অ্যাকশন (১৯৮১) গ্রন্থে। হাবারমাস বলেন, মানুষ কেবল স্বার্থসন্ধানী কৌশলগত সত্তার অধিকারী নয়, পারস্পরিক বোঝাপড়ায় নির্মিত এক যোগাযোগমূলক সত্তা। যোগাযোগের মধ্যে সত্য, আন্তরিকতা ও যুক্তির দাবি নিহিত, যা সামাজিক আস্থার ভিত্তি গড়ে তোলে। তিনি ‘লাইফওয়ার্ল্ড’, অর্থাৎ দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা ও ভাগাভাগি অর্থের জগৎ এবং আমলাতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো ‘তন্ত্র’-এর মধ্যে পার্থক্য দেখান। তাঁর মতে, আধুনিক সমাজে বিপদ তখনই দেখা দেয়, যখন উপকরণগত যান্ত্রিক হাতিয়ারবাদ জীবনের সেই ক্ষেত্রগুলিতে প্রবেশ করে যেগুলি মূলত যোগাযোগ, যুক্তি ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার দ্বারা পরিচালিত হওয়া উচিত।

হাবারমাস আলোকায়নের প্রকল্পকে সমালোচনা করেছেন কিন্তু পরিত্যাগ করেননি, যোগাযোগের ভিত্তিতে যুক্তিবাদ পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করেছেন। এই প্রচেষ্টা তাঁর বয়ান-নৈতিকতা (ডিসকোর্স এথিক্স)-এ পরিণত হয়, যেখানে তিনি বলেন: নৈতিক বিধান তখনই বৈধ যখন তা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের যুক্তিসম্মত সম্মতি লাভে সক্ষম হয়। নৈতিকতা ব্যক্তিগত বিশ্বাস নয়, অন্তর্ভুক্তিমূলক আলোচনার ফসল।

রাজনৈতিক তত্ত্বে এই ধারণা আলোচনামূলক গণতন্ত্রের রূপ নেয়। আইন তখনই বৈধ যখন তা মুক্ত ও সম নাগরিকদের মধ্যে জনসম্মত আলোচনার মাধ্যমে গঠিত হয়। জন রলসের সঙ্গে তুলনা করলে তাঁর বৌদ্ধিক সংলাপের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টতর হয়। রলস কাল্পনিক অজ্ঞতার পর্দার আড়ালে নৈর্ব্যক্তিক যুক্তিকে স্থাপন করেন, হাবারমাস বাস্তব রাজনৈতিক পরিসরে নাগরিক আলোচনাকে অধিক গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি, ক্ষমতার বিশ্লেষণে ফুকোর অবদান স্বীকার করেও তাঁর আশঙ্কা, জ্ঞানকে যদি কেবল ক্ষমতার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়, এবং সত্য যদি আপেক্ষিক হয়, তবে যুক্তিযুক্ত সমালোচনার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। হাবারমাসের কাছে যুক্তিনির্ভর আলোচনাই ন্যায় ও মুক্তির অপরিহার্য ভিত্তি।

ধর্মের ভূমিকা, বহুত্ববাদী সমাজ, জাতিরাষ্ট্রের সীমানা অতিক্রমকারী রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে বহু রচনা লিখেছেন তিনি। তাঁর মতে, বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থাকেও ক্রমশ আলোচনামূলক বৈধতার উপর নির্ভর করতে হবে। তবে হাবারমাস শুধু তাত্ত্বিক ছিলেন না, জনপরিসরের সক্রিয় অংশগ্রহণকারীও ছিলেন। জার্মানির ক্ষেত্রে হলোকস্টের স্মৃতিকে এক অনতিক্রম্য কেন্দ্রীয় নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে দেখেছেন, যা ইহুদি জনগণের নিরাপত্তা ও ইজ়রায়েলের সুরক্ষার প্রতি স্থায়ী অঙ্গীকার দাবি করে। ৭ অক্টোবরের হামলার পর তাঁর উত্থাপিত ‘প্রিন্সিপলস অব সলিডারিটি’ অনেকের মতে ইজ়রায়েলের সামরিক প্রতিক্রিয়াকে নৈতিক ভিত্তি দেয়। স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর এই অবস্থান বিতর্কিত। তাঁর সর্বজনীন নৈতিকতার ধারণার নিরিখেও তা অসঙ্গত, কারণ এতে প্যালেস্টাইনি জনগণের প্রতি হিংসা ও অমর্যাদা যথাযথ গুরুত্ব পায় না। এই দ্বন্দ্ব দেখায়, যোগাযোগমূলক নীতিশাস্ত্রকে অসম শক্তিসম্পন্ন বাস্তব রাজনৈতিক সংঘাতের পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করা কতটা কঠিন।

প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও গণতান্ত্রিক সঙ্কটের এ সময়ে হাবারমাসের প্রশ্নগুলি প্রাসঙ্গিক: কী ভাবে যুক্তিনির্ভর জনআলোচনা টিকে থাকবে? কী ভাবে বৈধতা প্রতিষ্ঠিত হবে? কী ভাবে সত্যকে রক্ষা করা সম্ভব? তাঁর প্রয়াণে আমরা এক অসামান্য দার্শনিক ও সমাজতাত্ত্বিককে হারালাম। গণতন্ত্র, যুক্তি ও যোগাযোগ নিয়ে যে আলোচনা তিনি শুরু করেছিলেন, তা ভবিষ্যতেও জনজীবন আলোকিত করে যাবে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

German Philosopher

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy