E-Paper

জনসংখ্যা অনুসারে উন্নয়ন

বিজেপি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার উপরে জোর দিয়েছে— ব্যবসা করার স্বাচ্ছন্দ্য ও এক জানালা অনুমোদনের মাধ্যমে। তাজপুর ও কুলপিতে গভীর সমুদ্রবন্দর, হলদিয়ায় ব্লু ইকনমি হাব, সিঙ্গুর-সহ চারটি শিল্পপার্কের প্রস্তাব রয়েছে।

তথাগত চট্টোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ ০৪:২৫

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত তৃণমূল কংগ্রেস, বিজেপি এবং বাম ফ্রন্টের ইস্তাহারগুলিতে একটি উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্য আছে— তিন পক্ষই লজিস্টিক্স-নির্ভর বৃদ্ধি এবং বন্দরভিত্তিক উন্নয়নকে ভবিষ্যৎ অর্থনীতির মূল স্তম্ভ হিসাবে তুলে ধরেছে। তৃণমূলের ইস্তাহারে এক দশকের মধ্যে বাংলাকে ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি করা এবং পাঁচ বছরের মধ্যে ৪০ লক্ষ কোটি টাকার অর্থনীতি গড়ে তোলার উচ্চাকাঙ্ক্ষী রূপরেখা রয়েছে। সেখানে দশ শতাংশের বেশি হারে বৃদ্ধির লক্ষ্য, ২০৩১ সালের মধ্যে ৩,০০০ কোটি ডলারের লজিস্টিক্স হাব, পাঁচটি মাল্টিমোডাল লজিস্টিক্স পার্ক এবং রঘুনাথপুর-তাজপুর, ডানকুনি-কল্যাণী ও খড়্গপুর-মোরগ্রাম শিল্প করিডরের প্রস্তাব রয়েছে, যার লক্ষ্য ১০ লক্ষ কর্মসংস্থান।

বিজেপি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করার উপরে জোর দিয়েছে— ব্যবসা করার স্বাচ্ছন্দ্য ও এক জানালা অনুমোদনের মাধ্যমে। তাজপুর ও কুলপিতে গভীর সমুদ্রবন্দর, হলদিয়ায় ব্লু ইকনমি হাব, সিঙ্গুর-সহ চারটি শিল্পপার্কের প্রস্তাব রয়েছে। সংযোগ প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে দার্জিলিং থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত উত্তর-দক্ষিণ মহাসড়ক, পুরুলিয়া, বালুরঘাট ও কোচবিহারে বিমানবন্দর, এবং স্থগিত রেল প্রকল্প পুনরুজ্জীবন। পাঁচ বছরে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান ও স্বনির্ভরতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যদিও খাতভিত্তিক রূপরেখা স্পষ্ট নয়। বাম ফ্রন্ট কর্মসংস্থানকে আরও স্পষ্ট ভাবে গুরুত্ব দিয়েছে— ৪০ লক্ষ স্থায়ী চাকরির প্রতিশ্রুতি, যার মধ্যে ২৫ লক্ষ শিল্প ও লজিস্টিক্স পরিষেবায় এবং ১৫ লক্ষ প্রযুক্তিনির্ভর ক্ষেত্রে। দুর্গাপুরে আন্তর্জাতিক এয়ার কার্গো ও এয়রো-লজিস্টিক্স হাব, কোল্ড স্টোরেজ ও গুদাম নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, এবং ভারী ও মাঝারি শিল্প ফিরিয়ে আনার প্রস্তাবও রয়েছে।

রাজ্য এখন নিম্ন প্রজনন হার এবং দীর্ঘমেয়াদি জনসংখ্যাগত রূপান্তরের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে, যার উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। বাংলার শহুরে প্রজনন হার দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন, গ্রামীণ হার দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। এই পরিবর্তন অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করবে। কর্মক্ষম বয়সের জনসংখ্যা ধীর গতিতে বাড়লে কৃষি, নির্মাণ ও শ্রমনির্ভর খাতে শ্রমের ঘাটতি হতে পারে। অন্য দিকে, জনসংখ্যার বার্ধক্য স্বাস্থ্যসেবা, সহায়ক বাসস্থান ও সামাজিক সহায়তার চাহিদা বাড়াবে। এর জন্য দক্ষতানির্ভর শিল্প, উচ্চ উৎপাদনশীল প্রযুক্তি, প্রবীণ জনসংখ্যার জন্য পরিষেবা, এবং নগর পরিচর্যা অবকাঠামোয় বিনিয়োগ প্রয়োজন। ইস্তাহারগুলির মধ্যে বাম ফ্রন্ট এই বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ করেছে— প্রতিটি মহকুমায় জেরিয়াট্রিক কেয়ার হোম, ২৪×৭ হেল্পলাইন, পুরসভা ও পঞ্চায়েত স্তরে পরিচর্যা কেন্দ্র এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে সহায়তা ব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছে। তৃণমূল ধীরে ধীরে বার্ধক্য ভাতা সম্প্রসারণের কথা বলেছে। বার্ধক্য, শ্রমবাজার এবং নাগরিক পরিকাঠামোকে যুক্ত করে একটি সমন্বিত কৌশল বর্তমান সময়ের চাহিদা।

রাজ্যে দ্বিতীয় বড় অর্থনৈতিক প্রবণতা নগরায়ণ। ইতিমধ্যে প্রায় ৩৭% জনসংখ্যা শহরে বাস করে— জাতীয় গড় ৩৫ শতাংশের চেয়ে বেশি। ২০৪০-এর দশকের শুরুতেই রাজ্য প্রধানত নগরায়িত হয়ে উঠতে পারে। গ্রামীণ অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন এই রূপান্তরকে ত্বরান্বিত করছে। পেশার অভিমুখ কৃষি থেকে ক্রমে সরে আসায় বড় গ্রামগুলি শহুরে বৈশিষ্ট্য অর্জন করছে এবং ‘সেন্সাস টাউন’ হিসাবে গণ্য হচ্ছে। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গে এমন ৮৩৪টি বসতি ছিল— ভারতে সর্বাধিক। কিন্তু এই রূপান্তর মূলত পরিকল্পনাহীন। উর্বর কৃষিজমি রূপান্তর, জলাশয় বিলুপ্তি এবং বিচ্ছিন্ন বৃদ্ধি পরিবেশগত চাপ বাড়াচ্ছে। প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনঘনত্ব ১,১০৬ জন— যেখানে জাতীয় গড় ৪১৫— এই সমস্যাকে আরও তীব্র করেছে।

লজিস্টিক্স ও বন্দর-কেন্দ্রিক কৌশলে নগরায়ণ এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন অঙ্গাঙ্গি ভাবে যুক্ত। বন্দর, শিল্প করিডর ও লজিস্টিক্স পার্কের জন্য কাছাকাছি শহরের শ্রম, বাসস্থান, গুদাম, পরিবহণ এবং ব্যবসায়িক পরিকাঠামো দরকার। পরিকল্পিত নগরায়ণ না হলে বিনিয়োগের ফলে অদক্ষ, যানজটপূর্ণ এবং আরও সমস্যাসঙ্কুল বসতি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তৃণমূল ভৌগোলিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে নগর স্থানীয় সংস্থা সম্প্রসারণের প্রস্তাব দিয়েছে। পাশাপাশি ‘মিশন মহানগর’-এর অধীনে ২৫টি শহর উন্নয়ন, বারুইপুরে সাংস্কৃতিক শহর, আবাসন সম্প্রসারণ এবং সব বাড়িতে পরিস্রুত জল দেওয়ার কথাও বলেছে। বিজেপি কলকাতার জন্য পরিবহণ, নিকাশি এবং দখলমুক্তির উপরে জোর দিয়ে একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে। সঙ্গে পর্যটনভিত্তিক উন্নয়ন, নদীতীর পুনরুজ্জীবন এবং চারটি আধুনিক শহরের ধারণা— যদিও স্থাপত্যগত যুক্তি স্পষ্ট নয়। বাম ফ্রন্ট পুর শাসন এবং সামাজিক অবকাঠামোয় বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে সাশ্রয়ী আবাসন, হকারদের জন্য বিজ্ঞানসম্মত ভেন্ডিং জোন, উচ্ছেদ ছাড়া বস্তি উন্নয়ন, পুর বাজেটের ২৫ শতাংশ বস্তির জন্য বরাদ্দ, সর্বজনীন পানীয় জল, উন্নত গণপরিবহণ এবং স্বচ্ছ নগর পরিচালন ব্যবস্থা।

এই প্রস্তাবগুলি নগর উন্নয়নের গুরুত্ব স্বীকার করলেও মূলত প্রচলিত ধারায় সীমাবদ্ধ। বাংলা যখন নগর ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে, তখন মূল চ্যালেঞ্জ শুধু নতুন শহর তৈরি নয়; জমি, অবকাঠামো এবং শাসনকে এমন ভাবে পরিচালনা করা, যাতে নগর বৃদ্ধি অর্থনৈতিক রূপান্তর এবং পরিবেশগত স্থায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

শুধু বিচ্ছিন্ন ঘোষণা বা পরিকাঠামোগত প্রকল্পগুচ্ছের মাধ্যমে বাংলার ভবিষ্যৎ গড়া যাবে না। শিল্প বৃদ্ধি, জনসংখ্যাগত রূপান্তর এবং নগর উন্নয়নকে যুক্ত করে একটি সমন্বিত কৌশল প্রয়োজন। লজিস্টিক্স হাবের জন্য কার্যকর শহর দরকার; কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজন দক্ষ শ্রম এবং বাসযোগ্য নগর পরিবেশ। প্রবীণসংবেদী সমাজের জন্য নগরব্যবস্থার মধ্যেই পরিচর্যা পরিকাঠামো দরকার। অর্থনৈতিক কৌশলকে জনসংখ্যাগত পরিবর্তন এবং পরিকল্পিত নগরায়ণের সঙ্গে সমন্বিত না করলে রাজ্য কাঠামোগত অগ্রগতির বদলে ধীরগতির বিচ্ছিন্ন অগ্রগতির ঝুঁকিতে পড়বে।

জ়েভিয়ার ইউনিভার্সিটি, ভুবনেশ্বর

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal Politics West Bengal government CPM TMC BJP

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy