E-Paper

ভাল থাকার জন্য ভোট

আর্থ-সামাজিক পট একটি কাঠামোগত বিষয়। কাঠামোর ভাঙা-গড়া দীর্ঘকালীন ঘাত-প্রতিঘাত এবং সরকারের পরিকল্পনার উপরে নির্ভর করে। সাধারণ মানুষ কাঠামোয় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের আশায় কত দিন ধৈর্য ধরতে পারে?

শেখর মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ০৭:১৪

পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক ঘটনা-পরম্পরায় দু’টি প্রবণতা চোখ এড়ায় না। এ রাজ্যের মানুষ চট করে শাসক বদলায় না। কিন্তু যখন বদলায়, ক্ষমতায় আর ফিরিয়েও আনতে চায় না— কংগ্রেস থেকে বাম ফ্রন্ট, অভিজ্ঞতা একই। প্রশ্ন হল, নির্বাচকদের এই আচরণে রাজ্যের আর্থ-সামাজিক পটপরিবর্তন কতটা হয়? তেমন পটপরিবর্তনের তাগিদ কি নির্বাচকদের থাকে? তাঁদের পক্ষে এমন পরিবর্তন আনার ঝুঁকি নেওয়া কি আদৌ সম্ভব?

আর্থ-সামাজিক পট একটি কাঠামোগত বিষয়। কাঠামোর ভাঙা-গড়া দীর্ঘকালীন ঘাত-প্রতিঘাত এবং সরকারের পরিকল্পনার উপরে নির্ভর করে। সাধারণ মানুষ কাঠামোয় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের আশায় কত দিন ধৈর্য ধরতে পারে? ফলে নির্বাচনে জয়ী দল কাঠামোগত পরিবর্তনের লক্ষ্যে কত দূর প্রয়াসী হতে সাহস করবে? এ ক্ষেত্রে নৈতিকতা, সদিচ্ছা ইত্যাদি ধারণাগুলি অনেক সময় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। নিয়মিত নির্বাচনে সংখ্যাগুরুর মতের ভিত্তিতে মেয়াদি সরকার গঠনের সংসদীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতি এমন মূল্যবোধের পরিসর কতটা দেয়?

এ যদি সওয়াল হয়, তবে ভারতে স্বাধীনতা-আন্দোলনের ধারণার সঙ্গে প্রায় একীভূত কংগ্রেস দলটির পশ্চিমবঙ্গ শাসনের ইতিবৃত্ত মোটা দাগে এক জবাবি আলেখ্য। গ্রামীণ রাজনীতি-রথের চালকের আসনে ছিলেন সাবেক জমিদার-জোতদারেরা। স্বাধীনতার পর নির্বাচনগুলিতে কংগ্রেসের জয় তাঁদের স্বার্থরক্ষার জন্য জরুরি ছিল। ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা গ্রামীণ শাসনতন্ত্রের কাঠামোয় তাঁরাই ছিলেন কর্তার আসনে।

তুলনায়, নতুন করে খানিকটা মাপজোখ করা চিত্রপটের আভাস হয়তো মেলে বাম জমানায়— সেও শুধু চিত্রণের উদ্যোগে। সেই চিত্রণের উল্লেখযোগ্য আঁচড়টি ছিল ভূমিসংস্কার, বিশেষ করে অপারেশন বর্গা। রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে অপারেশন বর্গা এ রাজ্যে তুমুল সফল হয়েছিল। কিন্তু ক্রমশ প্রমাণ হয়ে যায়, দীর্ঘকালীন লক্ষ্যে গ্রামীণ আর্থ-সামাজিক কাঠামো বদলের উদ্যোগ এটি ছিল না; ছিল বরং গ্রামসমাজের নেতৃত্ব দখল এবং নির্বাচনে জেতার কৌশল মাত্র। বাম ফ্রন্টের ভূমিসংস্কারের পর প্রথম দিকে কৃষিজমির উৎপাদনশীলতা এবং কৃষকের আয় বাড়লেও সেই গতি পরে বজায় থাকেনি। মূলত পারিবারিক কারণে জমির অতি-বিভাজন ঘটতে থাকে। সে সব জমিতে চাষাবাদ অর্থনৈতিক মানদণ্ডে লোকসানজনক হয়ে ওঠে এবং বহু কৃষককে আবার হতদরিদ্র হওয়ার পথে ঠেলে দেয়। সরকারি নথিপত্রেই প্রমাণ, রাজ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি জোতের সংখ্যা কমেছে, প্রান্তিক জোতের সংখ্যা বেড়েছে। পাশাপাশি গ্রামীণ পুঁজি গড়ে উঠে শিল্পায়নের পুঁজিতে পরিণত হতে পারেনি। কৃষির পাশে কর্মসংস্থানের বিকল্প ক্ষেত্রও তৈরি হয়নি।

যদিও সময়ের পথে গ্রামীণ জনতার তুলনামূলক আয়বৃদ্ধি, যোগাযোগের প্রসার, সমাজমাধ্যমের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং ফলত জীবনযাপনের স্বাভাবিক ঊর্ধ্বমুখী গতিমানতার ধারায় গ্রামসমাজে চাহিদার বৈচিত্র এবং ব্যক্তি-বিচ্ছিন্নতার সূত্রপাত ঘটে। যে মেহনতি কৃষক-মজুর জনতা এক সময় চিহ্নিত শ্রেণিশত্রু গ্রামীণ জোতদার ও মহাজনদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, তাদের মধ্যে জোট বাঁধার অনুঘটক ক্রমে অমিল হতে থাকে। বিভ্রান্তি জাগে— তারা কার বিরুদ্ধে জোট বাঁধবে, কে তাদের ‘শত্রু’?

ক্রমশ দেখা যায়, নতুন করে কিছু ‘জমিদার’ গজিয়ে উঠেছে। তারাও নানা ভাবে ‘খাজনা’ আদায় করে চলেছে। গড়ে উঠেছে এক সমান্তরাল অর্থনীতি। বিস্তৃত নির্মাণ সামগ্রীর সিন্ডিকেট, অবৈধ বালি খাদান, পাথর খাদান, কয়লা খনি, গরু পাচার— এই সব কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্র জুড়ে সেই পরিসর ছড়িয়ে আছে। বাড়তে বাড়তে তা সমাজ ও অর্থনীতির এক বড় অংশ আচ্ছন্ন করেছে। কারবারের অস্তিত্ব সরকারি ভাবে স্বীকৃত না হলেও একে আর ‘চোরা’ বলা যায় না। সাধারণ মানুষের চোখের সামনেই এ সব ঘটে চলেছে। সাম্প্রতিক কালের এই ‘জমিদার’রা হয় স্বয়ং শাসক দলের নেতা, নয়তো তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় পুষ্ট প্রভাবশালী। এও দেখা যায়, এই নেতৃবৃন্দের রাজনৈতিক পূর্বসূরিদের অনেকেই এক সময় জমিদার-জোতদার বিরোধী কৃষক-মজুর জনতার আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। জনগণের নেতারাই হয়ে উঠেছেন সমান্তরাল অর্থনৈতিক পরিসরে ‘খাজনা’ আদায়কারী ‘জমিদার’।

বাকি ভারতের মতোই পশ্চিমবঙ্গের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অসংগঠিত ক্ষেত্রের বিস্তৃতি বিপুল। অসংগঠিতের চরিত্র অনুসারেই এই ক্ষেত্রের প্রকৃতি বিচিত্র এবং ধূসর। এর কতটা বৈধ, কতটা অবৈধ, তা-ও নির্ধারিত নয়। জমি খণ্ডীকৃত হওয়া, প্রান্তিক জোতের সংখ্যা বৃদ্ধি, চাষের কাজে যন্ত্রের ব্যবহার ইত্যাদি কারণে গত দেড় দশকে কৃষিক্ষেত্রে কাজের সুযোগ কমেছে। সরকারি নথিপত্র ও সাম্প্রতিক একাধিক গবেষণায় এমনই ছবি ধরা পড়ে। গ্রামীণ অদক্ষ, অশিক্ষিত শ্রমিকেরা তা হলে কাজ পাচ্ছেন কোথায়? রাজ্যে ম্যানুফ্যাকচারিং অর্থাৎ কারখানা-ভিত্তিক উৎপাদন ক্ষেত্রে কর্মনিযুক্তির হার গত প্রায় দেড় দশকে ১৫ থেকে ১৯ শতাংশের মধ্যে উঠেছে-নেমেছে, ধারাবাহিক বৃদ্ধি ঘটেনি। রাজ্যের গ্রামাঞ্চলে কর্মনিযুক্তির অনুপাত তুলনায় বরং বেড়েছে নির্মাণশিল্প এবং পরিষেবা ক্ষেত্রে। দু’টি ক্ষেত্রেই অবৈধ অর্থনীতির প্রশাখা বহু দূর বিস্তৃত, যদিও তাকে চিহ্নিত করা মুশকিল।

সাম্প্রতিক কালে রাজ্যের কলেজগুলিতে ভর্তির হার কমেছে। প্রায় প্রতি কলেজেই বহু আসন ফাঁকা থাকছে। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বলে, যারা ভর্তি হচ্ছে তাদের মধ্যে ছাত্রীর সংখ্যা বেশি। অর্থাৎ ছেলেরা বেশি করে কলেজ-বিমুখ হয়ে পড়ছে। এর শুরু স্কুলেই। স্কুল স্তরে গেলে দেখা যায়, সরকারি নথি অনুযায়ী (ইউ-ডাইস), রাজ্যে নবম থেকে দ্বাদশ স্তরে পড়ুয়াদের স্কুলছুট হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে— ছেলেদের মধ্যে এই অনুপাত বেশি। ২০২৪-২৫’এর পরিসংখ্যান বলছে, এই স্তরে ২০% পড়ুয়া স্কুল ছেড়েছে— ছাত্রদের মধ্যে স্কুলছুটের হার ২৩%, ছাত্রীদের মধ্যে ১৭%। এরা যায় কোথায়?

পরিযায়ী শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে ভারতের রাজ্যগুলির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ উপরের দিকেই আছে। কিন্তু এই প্রবণতা গত সিকি শতকের। তার আগে বরং প্রতিবেশী রাজ্যগুলি থেকে মানুষ কাজের খোঁজে বাংলায় আসত। ১৯৯১ সালের জনশুমারির পরিসংখ্যানেও তার প্রমাণ মেলে। কিন্তু তার পর থেকে এই লেনদেনের স্রোত বদলাতে থাকে। তার সাক্ষ্য দেয় ২০০১ সালের জনশুমারি। সেই নথি অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গ ভিন রাজ্যগুলি থেকে যত পরিযায়ী শ্রমিক গ্রহণ করে, তার চেয়ে বেশি রাজ্যের বাইরে পাঠাতে শুরু করেছে। বহির্মুখী এই শ্রমশক্তির মধ্যে যেমন দক্ষ শ্রমিকেরা আছেন, তেমনই আছেন অদক্ষ শ্রমিকেরাও। এঁরা রাজ্যের শ্রমশক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ— আনুমানিক কুড়ি থেকে পঁচিশ লক্ষ। বাকিরা কোথায় কাজ পান? সাম্প্রতিক হিসাব বলছে, রাজ্যে প্রায় পনেরো লক্ষ কর্মপ্রার্থী কর্মহীন হয়ে রয়েছেন। এ ছাড়া সরকারি হিসাব মোতাবেক, রাজ্যে কর্মক্ষম (১৫-৫৯ বছর বয়সি) জনতার ৪০-৪৫ শতাংশ কাজের বাজারে অনুপস্থিত। এঁরা কোথায় যান?

রাজ্যের সমান্তরাল অর্থনৈতিক কর্মক্ষেত্রটি অসংগঠিত এবং সর্বোপরি অবৈধ হওয়ায় এর ব্যাপ্তি এবং সেখানে কর্মরত মানুষের সংখ্যার নির্ভরযোগ্য তথ্য নথিবদ্ধ নেই। তবে গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতা, সংবাদমাধ্যমে বালি, কয়লা, পাথর, গরু প্রভৃতি পাচারের খবর, কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির সময়ে সময়ে তদন্তে তৎপর হয়ে ওঠা, বিভিন্ন প্রভাবশালীর ডেরা থেকে কোটি কোটি টাকা বাজেয়াপ্ত হওয়া— এ সব থেকে ধারণা হয়, রাজ্যের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অবৈধ ক্ষেত্রটির পরিধি এবং সেখানে কর্মনিযুক্ত মানুষের সংখ্যা অগ্রাহ্য করার মতো নয়। স্বভাবতই এই শ্রমিকেরা সপরিবার সেই দলকেই ভোট দেবেন, যারা তাঁদের জীবিকার উৎস সমান্তরাল অর্থনীতির ক্ষেত্রটিকে বাঁচিয়ে রাখবে। খেটে-খাওয়া গরিব মানুষ, প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, প্রশাসনের একাংশ— সব মিলেমিশে এ এক বিচিত্র বাস্তুতন্ত্র, যাকে ভাঙা সহজ নয়। আপাতদৃষ্টিতে নির্বাচনে জিতে যে-ই ক্ষমতায় আসুক, তাকে এই তন্ত্রের মধ্যেই, বলা ভাল এই তন্ত্র আশ্রয় করেই ক্ষমতায় টিকে থাকতে হবে।

এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে কাঠামোগত পরিবর্তনের দীর্ঘকালীন পরিকল্পনা এবং পাশাপাশি অবৈধ অর্থনৈতিক প্রবাহের উপরে নির্ভরশীল নিরুপায় দরিদ্র জনতার পুনর্বাসনের বন্দোবস্ত করতে হবে। এই কঠিন কাজটি কে করবে?

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal Politics West Bengal government Economy

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy