E-Paper

সর্বত্রই দুই হুজুরের গপ্পো

আমরা অনেক কালই মুক্ত বাজারের দিকে ঝুঁকেছি, বহু ক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগ ঢালাও ভাবে করা যায় আজ। যেমন, সম্প্রতি বিমা ক্ষেত্রে ১০০% বিদেশি বিনিয়োগে সিলমোহর পড়েছে। মুক্ত বাজারে প্রতিযোগিতা থাকা স্বাভাবিক। টেলিকম বা স্টক এক্সচেঞ্জ, দুই ক্ষেত্রেই বাজার বাড়ছে।

নীলাঞ্জন দে

শেষ আপডেট: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:০৪

ভারতের জনসংখ্যা এখন দেড়শো কোটির কাছাকাছি। আর মধ্যবিত্ত? ধরা যাক, তার এক-পঞ্চমাংশ। অর্থাৎ, প্রায় ত্রিশ কোটি। এই মানুষগুলির উপার্জন ও খরচের উপরে নির্ভর করছে বাজারের অধিকাংশ ব্যবসার ভবিষ্যৎ। মধ্যবিত্তরা মোট জনসংখ্যার সেই অংশ, যাঁরা দেশের মোট পণ্য ও পরিষেবার সিংহভাগ ব্যবহার করেন। আর, বাকিটুকুর জন্য লড়ে জনসংখ্যার সিংহভাগ। এই নিরন্তর টানাটানির মধ্যে তরতরিয়ে বাড়ছে দামি ভোগ্যপণ্যের বাজার। মধ্যবিত্ত ভারতে কেউ কোনও দিন ভেবেছিল যে, আট লাখ টাকার গাড়ির বিক্রির সঙ্গে সঙ্গে চল্লিশ লাখি গাড়ির চাহিদাও বৃদ্ধি পাবে? উপার্জনের আতশকাচের নীচে দেখলে, উপরের স্তরের রোজগারের সঙ্গে নীচের স্তরের অমিল ক্রমশ বেড়ে গেলে এমন হওয়া অসম্ভব নয়।

এই সূত্রে আসে একাধিক জটিল কিন্তু প্রতিশ্রুতিময় ক্ষেত্রের মধ্যে গেঁড়ে বসে থাকা ‘ডুয়োপলি’-র কথা— এমন পরিস্থিতি, যেখানে দু’টি সংস্থা একটি নির্দিষ্ট পরিষেবা বা পণ্যের জন্য সমস্ত বা বেশির ভাগ বাজারের মালিক। আমাদের হাতের কাছেই আছে এমন পরিস্থিতির বড় উদাহরণ— টেলিকমিউনিকেশন। সেখানে দুই ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কথা আর নতুন করে বলার কিছু নেই। আর একটি উদাহরণ হল শেয়ার বাজার— যেখানে কেবল ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ (এনএসই) ও বম্বে স্টক এক্সচেঞ্জ (বিএসই)-কে ঘিরে সব সক্রিয়তা।

আমরা অনেক কালই মুক্ত বাজারের দিকে ঝুঁকেছি, বহু ক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগ ঢালাও ভাবে করা যায় আজ। যেমন, সম্প্রতি বিমা ক্ষেত্রে ১০০% বিদেশি বিনিয়োগে সিলমোহর পড়েছে। মুক্ত বাজারে প্রতিযোগিতা থাকা স্বাভাবিক। টেলিকম বা স্টক এক্সচেঞ্জ, দুই ক্ষেত্রেই বাজার বাড়ছে। অথচ, এখানে অন্যান্য সংস্থার উপস্থিতি কার্যত শূন্য। ভারতের মতো বিপুল জনসংখ্যার দেশে এমন ডুয়োপলি থাকা শুধু অর্থনৈতিক চিন্তার দৈন্য নয়, একটা নীতিগত সমস্যাও বটে। মূলধনি বাজার সংক্রান্ত আর একটা ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি। মিউচুয়াল ফান্ডের বিনিয়োগকারীমাত্রেই ‘ক্যামস’ আর ‘কেফিনটেক’ নাম দুটোর সঙ্গে পরিচিত। এ ক্ষেত্রে তৃতীয়, চতুর্থ বা তারও পরের কোনও খেলোয়াড় না-থাকায় আমাদের বিনিয়োগকারীরা দুই সংস্থার আধিপত্যের মাঝে আটকে পড়ছেন। এবং, ডুয়োপলি মানেই দু’টি সংস্থার মধ্যে আপসে সমঝোতার সম্ভাবনা আছে, যা শেষ অবধি ক্রেতাদের পক্ষে ক্ষতিকারক।

চোখ ঘোরানো যাক পুরনো দিনের টেলিকম সেক্টরে, যখন ভারতে উদার অর্থনীতির ইতিহাস রচিত হচ্ছিল। তখন বাজারে ছিল তীব্র প্রতিযোগিতা, ডজনখানেক অপারেটরের সুবাদে। নানা ধরনের প্ল্যান ছিল, আর সে সব ছাপিয়ে ছিল সাধারণ গ্রাহকের হাতে ক্ষমতা। আজকে সেই বাজার কার্যত দুই সংস্থার খেলার মাঠ। তিন আর চার নম্বরে থাকা সংস্থাগুলি কেউ বাজার নির্ধারক নয়। তৃতীয় শক্তি ভোডাফোন আইডিয়া নিজেকে বাঁচাতে ব্যস্ত— সেখানে দীর্ঘ দিন ধরে নানা আইনি প্রক্রিয়া চলছে। আর অন্য ধরনের অস্তিত্বের লড়াইয়ে জেরবার রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বিএসএনএল। ফলে, মোবাইল পরিষেবার খরচ বাড়ছে, প্ল্যানের নানা রকম কাঠামো চলে এসেছে। এক দিন হয়তো ‘আনলিমিটেড’ কথাটার অর্থও বদলে যাবে। তাতে আমজনতা যদি সন্তুষ্ট না হয়, কী করা যাবে।

ডুয়োপলির সবচেয়ে কড়া প্রভাব পড়ছে গ্রাহকের মনস্তত্ত্বে, মনের গভীরে। গ্রাহক ক্রমশ প্রশ্ন করা কমিয়ে দিচ্ছেন। নিজের পরিষেবার দাম যদি বাড়ে, তা হলে ‘ওরাও তো বাড়াচ্ছে’ বলে নিজেকে প্রবোধ দেন বেশির ভাগ মানুষ। পরিষেবার মান খারাপ মনে হলেও ‘এই তো মোটে দুটো বিকল্প, আর কোথায় সুরাহা পাব?’— এমন আত্মসমর্পণ বাজারের জন্য ভাল নয়। কারণ শুধরে দেওয়া তখনই যায়, যখন গ্রাহক নিজের প্রতিক্রিয়া দিতে পারেন। সাবেক ডুয়োপলিতে সেই প্রতিক্রিয়া দেওয়ার পদ্ধতি বদলে যায়।

উদ্ভাবনের প্রক্রিয়াও কি খানিকটা বদলায়? ডুয়োপলি বাজারে গ্রাহকের নতুন সুবিধা মেলে ঠিকই, কিন্তু তা প্রায় বাহ্যিক। ফলে মূল সমস্যার সমাধান হয় না। অভিযোগ নিষ্পত্তি নিয়ে আলাদা করে আর কিছু বলার নেই, প্রায় সব জায়গাতেই তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

একটু অন্য দিকে তাকানো যাক। স্টার্ট আপদের কথা। এই প্রজন্ম জানে ‘ডিসরাপশন’ কী— পুরনো ব্যবসার উপর আঘাত হানা আজ জলভাত। কিন্তু যেখানে দুই দানবের লড়াই, তারাই বাজার দখলের ক্ষমতা ধরে, সেখানে বিরাট মাপের পুঁজি ছাড়া নতুনরা কী ভাবে আসবে? এরা সব জায়গায় দাঁড়াতে পারে না, যদি তাদের তেমন রেস্ত না থাকে। ইদানীং কালের ব্যতিক্রম স্টক ব্রোকিং, সেখানে ‘জ়িরোধা’ এবং ‘গ্রো’ বেশ নাম করেছে। আর, নতুন প্রজন্মের গ্রাহকদের জন্য ফের ডুয়োপলির রূপ ধরছে।

সরকারি নীতির ভূমিকা কেমন হয় এই সব ক্ষেত্রে? এক ধরনের বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, নানা ক্ষেত্রে নীতি পরিবর্তন বা ‘রিফর্ম’ এমন ভাবে করা হয়েছে বা হচ্ছে, যা বড় গোষ্ঠীকে আরও বড় করে তুলছে। এ সব ক্ষেত্রে ডুয়োপলিকে ঠিক ‘দুর্ঘটনা’ বলা চলে কি? তা হয়তো কোনও নতুন নীতির ফল। আর এর জন্য গ্রাহকের ক্ষতি শুধু টাকায় হয় না।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Policy Economy

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy