Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০৯ ডিসেম্বর ২০২১ ই-পেপার

সুশাসন বনাম দমনপীড়ন

পাইকারি স্বৈরাচারের অস্ত্র হয় খুচরো স্বৈরাচার

সুকান্ত চৌধুরী
১২ এপ্রিল ২০২১ ০৪:৫৪
সংগ্রাম: কাফিল খানের মুক্তির দাবিতে কলকাতায় প্রতিবাদ মিছিল। ৬ মার্চ, ২০২০

সংগ্রাম: কাফিল খানের মুক্তির দাবিতে কলকাতায় প্রতিবাদ মিছিল। ৬ মার্চ, ২০২০

একটি ইংরেজি দৈনিকে এক হাড়-হিম-করা সমীক্ষা প্রকাশ হয়েছে। গত তিন বছরে উত্তরপ্রদেশে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আওতায় ১২০টি গ্রেফতারের মধ্যে ৯৪টিকে ইলাহাবাদ হাই কোর্ট কেবল নাকচ করেনি, প্রশাসকদের তুলো ধুনেছে ‘মনঃসংযোগের অভাবের’ জন্য। বহু গ্রেফতারের বিশদ কারণ দর্শানো নেই। অনেক এফআইআর-এর বয়ান হুবহু এক, যেন ‘কাট অ্যান্ড পেস্ট’ করা। গোহত্যায় অভিযুক্ত ৪১ জনের মধ্যে মুক্তি পেয়েছেন ৩০ জন (আরও ১০ জন পেয়েছেন জামিন); সাম্প্রদায়িক অশান্তিতে অভিযুক্ত ২০ জনের প্রত্যেকে (উল্লেখ্য, তাঁরা সকলেই মুসলিম)। এমন অভিযোগে জাতীয় নিরাপত্তা আইনের আদৌ প্রয়োগ কেন, তা-ও রহস্য।

এ দিকে বেআইনি কার্যকলাপ নিরোধ আইন (ইউএপিএ)-তে ২০১৫-র তুলনায় ২০১৯-এ গ্রেফতার বেড়েছে ৭২%; অথচ ২০১৬ থেকে ২০১৯ অবধি আদালতে দোষী সাব্যস্ত মাত্র ২.২%! ২০২০-র দিল্লিতে সাম্প্রদায়িক অশান্তির পর বহু ছাত্রকে এই আইনে আটক করা হয়েছে।

দু’টি আইনই মারাত্মক। এতে জামিনের সুযোগ নগণ্য; বিনা বিচারে, এমনকি বিনা চার্জশিটে, আটক রাখা সহজ। জাতীয় নিরাপত্তা আইনে পুলিশ বা আদালতের দরকার নেই, জেলাশাসকের নির্দেশই যথেষ্ট— এবং, তাঁর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে না। সরকার তথা শাসক দল কোনও অপছন্দের লোককে বিনা ব্যাখ্যায় অনির্দিষ্টকাল বন্দি রাখতে চাইলে আইনগুলি তার অবাধ অবকাশ দিচ্ছে। আইনি প্রক্রিয়াটাই কার্যত শাস্তিদান— আদালত শেষমেশ বেকসুর খালাস দিলেও। প্রসঙ্গত, ভারতে ৭০% কারাবন্দি দণ্ডিত অপরাধী নন, বিচারাধীন।

Advertisement

শাসককুল এই সুবর্ণসুযোগের কেমন সদ্ব্যবহার করছে, উপরের পরিসংখ্যান তার প্রমাণ। ভাবা যাক ডাক্তার কাফিল খানের কথা। তিনি ২০২০ সালে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার হন। পরে ইলাহাবাদ হাই কোর্ট তাঁকে মুক্তি দেয় প্রশাসনের তীব্রতম সমালোচনা-সহ। একই বছরে প্রস্তাবিত পরিবেশ বিধির বিরুদ্ধে ইন্টারনেটে প্রতিবাদ স্তব্ধ করতে ইউএপিএ-র আবাহন হয়েছিল; শোরগোল ওঠায় কবুল হল, হয়েছে ‘ভুলবশত’। ভয়ঙ্কর আইনগুলি কত হেলায় প্রয়োগ হয়, এটা তার দৃষ্টান্ত।

এ সব কিছু আমরা জানি, কিন্তু ভুলে থাকি। এই মুহূর্তে কিন্তু পশ্চিমবঙ্গবাসীর ভুললে চলবে না। কারণ, এক গোষ্ঠীর ভোটপ্রার্থী এই ছবিটা তুলে ধরছেন পরম আদর্শের রূপে: এ ভাবেই তাঁরা বাংলায় সুখ-শান্তি-আইনের শাসন ফিরিয়ে আনবেন। কেউ ইঙ্গিত করছেন শান্তিস্থাপনের আরও মারাত্মক এক পদ্ধতি, সাজানো ‘এনকাউন্টার কিলিং’।

আইনি প্রক্রিয়ার জট ও বিলম্বে লোকে বীতশ্রদ্ধ। তারা চায় হাতে-হাতে বিচার, হাতে-হাতে শাস্তি। পুলিশের সাজানো এনকাউন্টার তাই কেবল জনপ্রিয় নয়, কার্যত এক ঘোষিত নীতি, বুক বাজিয়ে বড়াই করা যায়। আর আইন মেনেই যদি চটজলদি কাউকে হাজতে পোরা যায়, তবে তো সোনায় সোহাগা। এমন অভিমত শিক্ষিত উচ্চবর্গীয় সমাজে বিপুল ভাবে শোনা যাবে; বরং সাধারণ মানুষের মধ্যে কিছু কম— সরাসরি মারপিট, ভাঙচুর, গণপিটুনির প্রবণতা তাঁদের একাংশের মধ্যে যা-ই থাক।

তফাতটার কারণ আছে। গরিব মানুষ জানেন, ধরপাকড় দমন-পীড়ন হলে তাঁদেরই দুর্দিন, তা আইনের আওতার ভিতরে হোক, বা বাইরে। প্রশ্ন একটাই— এমন জমানার স্বরূপ তাঁরা আগাম আন্দাজ করতে পারবেন কি না; বুঝবেন কি না, বর্তমানে তাঁরা যে নানা অবিচার অত্যাচার সহ্য করেন, তা থেকে এর প্রকৃতি আলাদা। সচ্ছল সম্ভ্রান্ত মানুষ কিন্তু ভাববেন, বরাবরই যেমন ভাবেন, তাঁরা অবধ্য; মার খাবে ‘অপর’-এর দল— সেটাই তো চাই, মওকা বুঝে তাঁরাও দু’ঘা বসিয়ে দেবেন। নেহাত ঝামেলায় পড়লে ‘সেজদা পুলিশে আছে, ম্যানেজ করে দেবে’। নিরাপত্তা আর শান্তি স্থাপনের এই তেতো-কড়া ফর্মুলা একান্ত তাঁদেরই সুরক্ষার জন্য।

স্বর্গের অনেক মহল আছে, মূর্খের স্বর্গেরও— এই মনোভাব তার একটা। উৎকট ভাবে আইনবিরুদ্ধ উপায়ে আইন-শৃঙ্খলা ফিরতে পারে না। উপায়টা যদি আইন মোতাবেকও হয়, কিন্তু এমন আইন যা সাধারণ ন্যায়বিচারের বিপ্রতীপ, তবেও নয়। রেলগাড়ি থমকে থমকে চলে, কিন্তু বেলাইন হয়ে শর্টকাট করতে গেলে দুর্ঘটনাই সার।

জরুরি অবস্থার সময় জেলবন্দিদের মধ্যে সত্যিকারের অপরাধী হাতেগোনা, অধিকাংশ স্রেফ সরকারের বিরাগভাজন। শুধু নামী লোক নয়, আরও অসহায় অবস্থায় উৎপীড়িত হয়েছিলেন অগণিত অনামী নিরপরাধ নাগরিক। নকশাল যুগে সাধারণ মানুষ নকশালদের চেয়ে পুলিশের আতঙ্কে বেশি থাকত। এটা মানবধর্ম: কারও হাতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা তুলে দিলে কর্তব্যের আতিশয্যেই হোক আর হাতের সুখ মেটাতেই হোক, বাড়াবাড়ি সে করবেই— পাইকারি স্বৈরাচারের অস্ত্র হবে খুচরো স্বৈরাচার।

বহু রাজ্যে আজ শাসনের পরিসর আরও বেড়েছে: নতুন আইন বা হুকুমনামা জারি করে, পাশাপাশি সাবেক আইনে নতুন শান দিয়ে। রাজনৈতিক নজরদারির পাশাপাশি অজস্র সামাজিক ও ব্যক্তিগত বিষয় আইনের আওতায় চলে এসেছে: খাওয়া-পরা, চালচলন, মেলামেশা— কী নয়? এমন ‘অপরাধ’ দেশবিরোধী হওয়ার প্রশ্নই নেই, সরকারবিরোধীও নয়; অসামাজিক তো নয়ই, বরং স্বাভাবিক সমাজজীবনের অনুষঙ্গ। অথচ আজ নানা অভিনব আইনে কঠোর ভাবে দণ্ডনীয়। আরও ভয়ের কথা, আইনগুলোকে শিখণ্ডী করে দানা বাঁধছে অজস্র বেআইনি অনাচার উৎপীড়ন।

এমন আবহে কার ভরসা যে, সে রাজরোষে পড়বে না, বা রাজরোষের ওজর তুলে কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থ বা আক্রোশ চরিতার্থ করবে না? তরুণরা কি তাঁদের স্বাভাবিক স্ফূর্তি বিসর্জন দেবেন, বয়স্করা দেবেন তাঁদের জীবনভর নির্দোষ অভ্যাসগুলি, বিশেষত তাঁদের সমাজের প্রচলন শাসকের কড়ারের সঙ্গে না মিললে? বাংলার সহাবস্থান ও সংমিশ্রণের ঐতিহ্য ব্রিটিশ আমলে চুরমার হয়ে গত কয় দশকের চেষ্টায় অনেকটা জোড়া লেগেছিল। আজ যদি এক কৃত্রিম একতার ডাক আসে যার ভিত্তি আসলে বিভেদ ও বর্জন, জাতিধর্ম নির্বিশেষে বাংলার এক জন মানুষও কি বলতে পারবেন যে, “আমার কিছু যায় আসে না, আমার জীবন ঠিক এই তালে বাঁধা, এ জন্য কোনও গুরুতর নীতি বা অভ্যাসের সঙ্গে আমায় আপস করতে হবে না?”

রাজ্যে তথা দেশে অনাচারের একশেষ; তবু আমরা কি সত্যিই চাই যে, বাংলায় এই সর্বগ্রাসী আইনগুলি সাধারণ সমাজজীবনে বলবৎ হোক? তাতে কি অবস্থার উন্নতি ঘটবে, না কায়েম হবে এক নতুন ব্যাপকতর অরাজকতা? যে সব রাজ্যে এই মহৌষধি প্রয়োগ হয়েছে, সেখানে নিত্য নতুন বীভৎস অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। মানুষে দিন কাটাচ্ছেন নিরন্তর সতর্কতা, এমনকি চাপা ভীতির মধ্যে— পাছে দুর্দৈবে সেই অরাজকতার কবলে পড়েন। কেবল সংখ্যালঘু বা ব্যতিক্রমী মানুষের কথা বলছি না, বলছি সুশীল সনাতনপন্থী নির্বিরোধ নাগরিকের কথা। নানা অশুভ কারণে বাংলার বহু মানুষের একই দশা, কিন্তু সাধারণ ভাবে সকলের এখনও নয়, শহরের সম্ভ্রান্ত শ্রেণির অবশ্যই নয়।

‘দু’দিনে সব ঠান্ডা করে দেব’— এমন উক্তি ‘এক ডোজ়ে ক্যানসার সারিয়ে দেব’ কিংবা ‘প্রত্যেকের পকেটে লাখ টাকা ভরে দেব’র সমগোত্রীয়। কথাটার মধ্যেই গা-জোয়ারির আমেজ, ভক্ষককে রক্ষকে পরিণত করার ফন্দি— হয়তো একই ব্যক্তিদের নতুন শিরোপা দিয়ে, অবশ্যই এক শ্রেণির, এক মতির ব্যক্তিদের জড় করে। অন্যায় অরাজকতা দূর করার যে সিরিয়াস দীর্ঘমেয়াদি পন্থা, কোনও দল ভুলেও তার প্রস্তাব করে না। কোনও নির্বাচনী ইস্তাহারে নেই যে, পুলিশি ব্যবস্থা সংস্কারের জন্য তারা চল্লিশ বছর আগের পুলিশ কমিশন বা সুপ্রিম কোর্টের তেরো বছর আগের সুপারিশ বলবৎ করবে, সেইমতো স্থাপন করবে পুলিশ নিয়ে অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য স্বাধীন সংস্থা; নিম্ন আদালতের সব শূন্য পদ পূরণ করবে, ফাস্টট্র্যাক কোর্টগুলিকে করবে সার্থকনামা।

আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার এটাই একমাত্র উপায়। এ সব পানসে কথায় ভোটের আসর জমবে না, ক্ষমতায় এলে রূপায়ণ করাও আপদ। রাজনীতিকদের অত ভাবার দরকার নেই, ভোটের শিকে ছিঁড়লেই তাঁদের সিদ্ধিলাভ। আমাদের চিন্তা কিন্তু তখন থেকেই শুরু। ম্যাজিক দেখানোর গল্পে আমাদের মজলে চলবে না।

ইমেরিটাস অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ,

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

Advertisement