E-Paper

জলবায়ু পরিবর্তনে খাদ্যসঙ্কট

সঙ্কট মোকাবিলায় রাষ্ট্রপুঞ্জের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা আগাম পদক্ষেপের দর্শনে বিশ্বাসী। এর প্রধান উপায় হল ‘ক্লাইমেট-স্মার্ট এগ্রিকালচার’, যেখানে খরা বা অতিবৃষ্টি সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন এবং উন্নত সেচ ও জল সংরক্ষণ প্রযুক্তির ব্যবহার করা হয়।

দেবাশিস মিথিয়া

শেষ আপডেট: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:২৭

জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে বিশ্ব জুড়ে খাদ্যশস্য উৎপাদন যখন গভীর সঙ্কটে, লা নিনা-র আগমন বৈশ্বিক খাদ্য সুরক্ষাকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। আমেরিকার ‘ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টার’ (সিপিসি) এবং ভারতের আবহাওয়া বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-এর শেষার্ধে শুরু হওয়া এই লা নিনা পরিস্থিতি ২০২৬-এর প্রথম কয়েক মাস পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। এটি শুধু ধান, গম বা ভুট্টার মতো প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদনই ব্যাহত করবে না, পশুখাদ্যের অভাব তৈরি করে প্রাণিজ প্রোটিনের বাজারেও মূল্যবৃদ্ধি ঘটাবে। বিশ্বব্যাঙ্কের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের প্রায় ৭০ কোটি মানুষ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। লা নিনা সেই সংখ্যাকে বাড়িয়ে অসংখ্য মানুষের জীবনযাত্রাকে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিতে পারে।

এল নিনোর সময় প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব ও মধ্য ভাগে উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ভারত ও আফ্রিকায় তীব্র খরা দেখা দেয়। এর ঠিক বিপরীত অবস্থা হল লা নিনা, যখন সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যায়। লা নিনার প্রভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকায় মৌসুমি বায়ু অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে, যার ফলে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত ও বিধ্বংসী বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। অন্য দিকে, দক্ষিণ আমেরিকায় বৃষ্টিপাত কমে গিয়ে দীর্ঘস্থায়ী খরা সৃষ্টি হয়। জার্নাল নেচার-এ প্রকাশিত ‘গ্লোবাল এগ্রিকালচারাল ইমপ্যাক্টস অব এল নিনো অ্যান্ড লা নিনা’-য় দেখানো হয়েছে, এল নিনো প্রধানত খরা ও অতিরিক্ত তাপমাত্রার মাধ্যমে এবং লা নিনা অতিরিক্ত বৃষ্টি ও বন্যার মাধ্যমে ফসল নষ্ট করে। দ্য জার্নাল অব এনভায়রনমেন্টাল ইকনমিক্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট-এ প্রকাশিত আর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এল নিনোর প্রভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়ায় খরার কারণে কৃষিপণ্যের ফলন উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস পেয়েছে। নেচার-এ একই গবেষণায় দেখা গেছে, লা নিনা ভুট্টা ও সয়াবিনের বৈশ্বিক ফলন গড়ে ১% থেকে ১.২% কমিয়ে দেয়, মূলত দক্ষিণ আমেরিকায় দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে। যে-হেতু দক্ষিণ আমেরিকা বিশ্বের প্রধান সয়াবিন ও ভুট্টা রফতানিকারক অঞ্চল, তাই এখানকার উৎপাদন ঘাটতি বিশ্বব্যাপী ভোজ্য তেল ও পশুখাদ্যের বাজারে চরম সঙ্কট তৈরি করবে।

লা নিনা কেবল উৎপাদন কমায় না, বরং চরম আবহাওয়ার কারণে সরবরাহ শৃঙ্খলেও বিঘ্ন ঘটায়। এই অনিশ্চয়তার কারণে কৃষিপণ্যের আগাম বাজারে এক ধরনের কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি ঘটে; যেখানে ভবিষ্যতে জোগান কমার আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা পণ্যের আগাম দাম বাড়িয়ে দেন। ভারতের মতো কৃষিনির্ভর অর্থনীতির জন্য লা নিনার প্রভাব অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এটি মৌসুমি বায়ুকে শক্তিশালী করে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত দিলেও, এর চরম রূপ প্রায়ই ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করে। অতিবৃষ্টির ফলে এক দিকে যেমন খরিফ শস্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়, তেমনই অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও অসময়ের বৃষ্টির কারণে গম বা সর্ষের মতো রবি শস্যের ফলনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শস্যের এই ক্ষয়ক্ষতি কৃষি খাতের জিডিপিকে সঙ্কুচিত করে, বাজারে খাদ্যের জোগান কমিয়ে দিয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। অভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখতে ভারত সরকার চাল বা গম রফতানি নিষিদ্ধ করতে বাধ্য হয়। বিশ্ববাজারে ভারত চালের প্রধান জোগানদাতা হওয়ায় এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে পুরো পৃথিবীতে।

এই সঙ্কট মোকাবিলায় রাষ্ট্রপুঞ্জের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা আগাম পদক্ষেপের দর্শনে বিশ্বাসী। এর প্রধান উপায় হল ‘ক্লাইমেট-স্মার্ট এগ্রিকালচার’, যেখানে খরা বা অতিবৃষ্টি সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন এবং উন্নত সেচ ও জল সংরক্ষণ প্রযুক্তির ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এই আধুনিক কৃষিব্যবস্থার প্রসারে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক অর্থায়নের অনিশ্চয়তা। ‘সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভলপমেন্ট’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, আমেরিকার উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডি তাদের বৈদেশিক সহায়তায় বড় ধরনের কাটছাঁট করায় কৃষি খাতে বরাদ্দকৃত তহবিলের প্রায় ৮১ শতাংশ কমে গেছে। সংস্থাটির অর্থে পরিচালিত প্রায় ৯৮ শতাংশেরও বেশি জলবায়ু-সম্পর্কিত প্রকল্প বাতিলের মুখে পড়েছে। ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা উন্নত জল ব্যবস্থাপনা বা বাঁধ নির্মাণের মতো জরুরি প্রযুক্তিগত সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়ে আবারও প্রকৃতির দয়ার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।

বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে বৈশ্বিক নীতি নির্ধারকদের অবিলম্বে কয়েকটি পদক্ষেপ করা জরুরি। প্রথমত, ‘ফাও’-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে জলবায়ু-সহনশীল বীজের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত, আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে আবহাওয়ার আগাম তথ্য বিনিময়ের একটি স্বচ্ছ কাঠামো তৈরি করা যাতে কৃষকরা প্রস্তুতির সময় পান। তৃতীয়ত, উন্নয়নশীল দেশগুলিতে জলসেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ পরিকাঠামো নির্মাণে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করতে হবে।

লা নিনা বা এল নিনোর মতো চরম আবহাওয়ার মোকাবিলা কোনও দেশের পক্ষে একা করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন বৈশ্বিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, যা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য দুর্ভিক্ষ থেকে বিশ্বকে রক্ষা করতে পারে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Climate Crisis

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy