E-Paper

পাল্লা কোন দিকে ঝুঁকে

যে দেশে ব্যাঙ্কব্যবস্থা মূল আর্থিক চালিকাশক্তি হিসাবে কাজ করে, সেখানে শেয়ার বাজারের উত্থান-পতন অধিকাংশ মানুষের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ নয়।

শৈবাল কর

শেষ আপডেট: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১০:১০
প্রকাশ: লোকসভায় ২০২৬-২৭ কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ করছেন অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন, ১ ফেব্রুয়ারি।

প্রকাশ: লোকসভায় ২০২৬-২৭ কেন্দ্রীয় বাজেট পেশ করছেন অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন, ১ ফেব্রুয়ারি। ছবি: পিটিআই।

শিবরাম চক্রবর্তী থাকলে হয়তো বলতেন, বাজেট শব্দটি আসলে বাজে। ছাপার ভুলে একটা অতিরিক্ত ‘ট’ অক্ষর জুড়ে গিয়েছে। বাজেট যে ভাল হয় না, তা নয়— কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সম্ভাবনা ক্রমশ কমেছে। এর প্রধান কারণ হল, বাজেট ঘোষণার খণ্ডচিত্র আর ক্ষেত্রবিশেষে বিশদ হিসাবনিকাশ দাখিল করার পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্কগুলোকে দমন করছে। এটা বলার উদ্দেশ্য এই নয় যে, বাজেট শুনতে গেলে সাধারণ মানুষকে অর্থনীতির মারপ্যাঁচ জানতেই হবে। অর্থনীতির কোন প্রয়োজনে কী পদক্ষেপ, সেটা যে কোনও মানুষই জানতে চাইতে পারেন, এবং বাজেটে যে তা পরিষ্কার করে বলা যায়, এমন উদাহরণ মনমোহন সিংহ এবং প্রণব মুখোপাধ্যায়ের বাজেটের ক্ষেত্রে নিশ্চিত ভাবে রয়েছে। রাজস্ব আদায় ক্রমশ কমতে থাকলে আবার করের হার বাড়বে কি না, এটা জানতে চাওয়া অহেতুক নয়। দেশ যদি বৈদেশিক সূত্র থেকে, বা দেশের মানুষের কাছ থেকে, ধার করতে থাকে— তা হলে মূল্যস্ফীতি হবে কি না, সেই আশঙ্কার কথা প্রকাশ্যে বলা প্রয়োজন, ইত্যাদি। জ্বালানি তেলের দাম কমছে না কেন, বা ভূ-রাজনৈতিক টানাপড়েন সামলাতে আর্থিক ক্ষেত্রে সরকার কী পদক্ষেপ করছে, তা জানতে চাওয়াও সমকালীন প্রয়োজনেই। আজ বাঁচলে তবেই তো অমৃতকালের প্রত্যাশা।

বাজেটে এইগুলো জানানোর কোনও প্রয়াস যদি না থাকে, তা হলে কর সংক্রান্ত আইন আর হিসাবতত্ত্ব জানাও নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ নয়। এ নিয়ে কিন্তু যথেষ্ট সময় ব্যয় করা হল এই বাজেটেও। অথচ, সরকার কোন খাতে কত রাজস্ব ব্যয় করলে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছবে, সেটাই যে কোনও রাষ্ট্রীয় বাজেটের মূল উপাদান হওয়া উচিত বলে মনে হয়। বাজেটের মূল নথিতে যে পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য থাকবে, তা স্বাভাবিক। কিন্তু তার পাঠোদ্ধার করে দেশ অভীষ্টে পৌঁছল কি না, সেটা বোঝা বিশেষজ্ঞদের কাজ, আমজনতার নয়। বক্তব্য শুনে যা বোঝা গেল, তাতে শেয়ার বাজারে কাঁপুনি ধরল, এবং বাজেটের দিনে বাজারের সূচকের মাপকাঠিতে গত ছ’বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পতনের সাক্ষী থাকল এই রবিবার।

এটাও অবশ্য সবাইকে তেমন স্পর্শ করে না। যে দেশে ব্যাঙ্কব্যবস্থা মূল আর্থিক চালিকাশক্তি হিসাবে কাজ করে, সেখানে শেয়ার বাজারের উত্থান-পতন অধিকাংশ মানুষের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ নয়। এও সম্ভব যে, শেয়ার বাজারে যা অনেক সময়ে ঘটে থাকে তা সাময়িক প্রতিক্রিয়া, এক-দু’দিনের বেশি স্থায়ী হয় না। কিন্তু, মনে রাখতে হবে, শেয়ার বাজারে এই প্রভাব কিছুটা হলেও বিনিয়োগকারীর অনুভূতির প্রকাশ। বিনিয়োগকারীর আস্থা অনেকটাই উপভোক্তার আস্থার সমতুল্য। বাজারের উপরে উপভোক্তার আস্থা কমে গেলে ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

সরকারের ১২ লক্ষ কোটি টাকার মূলধনি বিনিয়োগ করার ঘোষণা এই প্রভাবে প্রলেপ লাগাতে পারে না, কারণ সরকার ধার করে বিনিয়োগ করলে তার দরুন সুদের প্রচলিত হার বেড়ে যায়। সুদ বাড়লে ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়ে, ব্যয়যোগ্য আয় কমে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ কমে। এই বেসরকারি বিনিয়োগের মধ্যে দিয়েই ছোট-মাঝারি শিল্পের সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান ঘটে থাকে। সরকারের নিজের ক্ষেত্রগুলোতে অজস্র চাকরির শূন্যস্থান পূরণ হয় না দীর্ঘ দিন ধরেই। বেসরকারি ক্ষেত্র যাতে চাকরিহীন যুব-সম্প্রদায়কে সস্তায় নিতে পারে, তার পরিপূর্ণ সুযোগ করে দেওয়ার পরেও বিনিয়োগের নিশ্চয়তা সৃষ্টি করতে পারছে না। এই ঘাটতি শুধু বক্তৃতায় সামগ্রিকতার অভাবে নয় অবশ্যই, বরং আর্থিক নীতিতে সাধারণ মানুষের জীবিকা নিয়ে আগ্রহের সম্পূর্ণ অভাব থেকে সৃষ্ট।

যাঁরা আয়কর দিয়ে থাকেন, তাঁদের ব্যাপারে যথেষ্ট আগ্রহ দেখা গেল এই বাজেটে। দেশের মাত্র ২% মানুষ প্রত্যক্ষ কর দেন। সেই কারণে তাঁদের খুব খাতির করা হচ্ছে, তা নয়। যাঁরা প্রত্যক্ষ কর দেন না, তাঁদের কী করে প্রত্যক্ষ করের আওতায় আনা যায়, তা নিয়েও কোনও পরিকল্পনা নেই। তবে রোজগার অঘোষিত থাকলে জেলে না পাঠিয়ে প্রদেয় কর এবং সুদের উপর শাস্তিস্বরূপ ১০% মূল্য ধরে দিলে, সরকার সন্তুষ্ট থাকবে। মনে রাখতে হবে যে, বিভিন্ন সংস্থার উপর যে প্রত্যক্ষ কর আরোপ করা হয়েছে, তার মধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি শূন্য কর দিয়ে থাকেন। সব মিলিয়ে মোট করের ৫৫% আসে নগণ্য কিছু করদাতার কাছ থেকে। এর বিনিময়ে স্বাস্থ্যবিমা কিংবা সরকারি পেনশন প্রকল্পে টাকা জমার উপরে পুরনো কর কাঠামোয় প্রাপ্য কর ছাড় ফিরে পাওয়া খুব বেশি প্রার্থনা মনে হয়?

সরকারের যে কয়েকটি পরিকল্পনা থেকে ন্যূনতম কিছু চাকরির সম্ভাবনা রয়েছে, তার মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে সরকারি বিনিয়োগ অন্যতম। তবে এটিও শর্তবর্জিত নয়। এই শিল্পের মূল উপাদান হল রেয়ার আর্থ, যা উত্তোলনের পর্যায়ে রয়েছে কয়েকটি রাজ্য। সেই রাজ্যগুলোর ছোট-মাঝারি শহর জোড়ার জন্যে উচ্চগতির রেল প্রকল্পের কথা ঘোষিত হয়েছে। সেই রেল এবং পণ্য করিডর ধরে এই উপাদান এসে পৌঁছলে সেমিকন্ডাক্টর তৈরিতে ভারত গুরুত্ব পাবে, যদি না প্রতিযোগী দেশগুলো তার আগেই বাজার দখল করে নেয়।

তবে, যে ক্ষেত্রে আমাদের যুব সম্প্রদায় বেশ পারদর্শী, সেই তথ্যপ্রযুক্তির বিষয়ে নতুন কোনও বক্তব্য নেই। বিদেশি সংস্থার সাহায্যে দেশে তথ্য সঙ্কলন এবং বিস্তারের ঘোষণায় ভারতীয় কিছু সংস্থার উপকার হতে পারে উন্নত প্রযুক্তি পেতে চাইলে। বিদেশি সংস্থাকে ২০৪৭ পর্যন্ত কর ছাড় দেওয়া রয়েছে। তবে এও স্বাভাবিক যে, ইলন মাস্কের সংস্থা যদি ভারতে এই ব্যবসা শুরু করে, তা হলে উপভোক্তারা না পাবেন দামের সুবিধা, না আশানুরূপ চাকরি। এক যাত্রায় সকলের ভাল হতে পারে এমন বাজেট করা যায় না। কিন্তু সম্পদশালী মানুষের সম্পদ আরও বাড়ায় আর মূলস্রোতে থাকা সাধারণ মানুষকে উপেক্ষা করে, সেই বাজেট করা তেমন শক্ত নয়।

অনেকে মনে করেন যে, সমালোচকের কাজ সহজ— যথেষ্ট প্রমাণ ছাড়াও কোনও উদ্যোগকে খাটো করা যায়। কিন্তু বাজেটের ক্ষেত্রে যে দেশের ৭৫ বছরের ইতিহাস রয়েছে, সেখানে এমন ভাবার উপায় নেই। কারণ এর আগে বহু বাজেটেই প্রান্তিক মানুষকেও মূলস্রোতের অংশীদারি দিতে অসুবিধা হয়নি। এই বাজেটেও তাই প্রত্যাশা ছিল যে, শ্রমশক্তির বিকাশের মধ্যে দিয়েই অন্তর্ভুক্তি বাড়ানো হোক দেশে। ন্যূনতম মজুরি কার্যকর করার মতো প্রয়াস আর্থিক সমীক্ষায় আটকে না থেকে বাজেটের অংশ হোক।

২৮টি রাজ্য যৌথ ভাবে জাতীয় ব্যয়ের মোট ২২% পেয়েছে এই বাজেটে। এর পরে কোন রাজ্য কত পাবে, তার একটি নির্দিষ্ট ফর্মুলা আছে। কিন্তু রাজ্যগুলো সমষ্টিগত ভাবে আরও কেন পাবে না তাদেরই সংগ্রহ করা রাজস্বের মধ্যে থেকে, সে ব্যাপারে কেন্দ্রের কী বক্তব্য, তা প্রকাশিত হয়নি। এ ছাড়া, কেন্দ্রীয় প্রকল্প চালানোর খরচ ১৭%, প্রতিরক্ষা খরচ ১১% আর পেনশন বাবদ ২%। বিবিধ ক্ষেত্রে ভর্তুকি কমানো হয়েছে এই বাজেটে। তার মধ্যে সারের উপর ৮.৩% কমাটাই লক্ষণীয়। এতে কিছু ফসলের উৎপাদন খরচ এবং সম্ভবত দাম বাড়তে পারে।

সব মিলিয়ে বাজেটের চরিত্র যা দেখা যাচ্ছে তাতে এটি কারও জন্য জয়ঢাক হয়ে বাজে, আর কারও পিঠে বাজে। কার ক্ষেত্রে কোনটা ঘটছে, অনুমান করার জন্য বিশেষ কল্পনাশক্তির প্রয়োজন পড়ে না।

অর্থনীতি বিভাগ, সেন্টার ফর স্টাডিজ় ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস, কলকাতা


(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy