অদ্ভুত এক সময়। আনাজ বাজার থেকে ফলের বাজার, মাছ-মাংসের দোকান থেকে ডিমপট্টিতে যেন আগুন লেগে গেছে! প্রত্যেক দিন এই সব আহার্যের দাম ঊর্ধ্বগামী হতে হতে ক্রমশ মধ্যবিত্তের ধরা-ছোঁয়ার বাইরে! অথচ না পেট্রল না ডিজ়েল, কোনও জ্বালানিরই দাম বাড়েনি, বলার উপায় নেই যে ট্রাকের খরচ বেড়েছে বলেই দামের বৃদ্ধি। এ এক অদ্ভুত সময় যখন, ‘জলেরও গায়ে হাত দিলে টের পাওয়া যায়/হুহু করা একশো তিন জ্বর।’
হ্যাঁ, এ-কথা সত্যি যে বাণিজ্যিক গ্যাসের দাম বেড়েছে। গত পরশু এক অটোচালক বললেন, কখনও দু’টাকা, কখনও পাঁচ টাকা করতে করতে অটোর জ্বালানি গ্যাসের দাম কেজি প্রতি প্রায় পঁচিশ টাকা বেড়ে গেছে। এ-কথাও সত্যি, বাড়ানোর তেমন কোনও যুক্তি না থাকা সত্ত্বেও বাণিজ্যিক রান্নার গ্যাসের দামও প্রচুর বেড়েছে, কিন্তু তার জন্য আনাজপত্রের বাজারে দাম বাড়ে কেন? ক’দিন আগেই তো প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ইরান-যুদ্ধে ভারতের গ্যাস পেতে সমস্যা হবে না। তা হলে? সিলিন্ডার পেতেই বা কেন এত সমস্যা? এর ফলে রাস্তার যে-সব নিম্ন-মধ্যবিত্ত খাবারের দোকান, তাদের অবস্থা খুব খারাপ। বিবাদী বাগ থেকে সল্ট লেকের বিভিন্ন ভবনের কর্মচারী আর সেক্টর ফাইভের আইটি কর্মীদের বড় ভরসার জায়গা ফুটপাতের এই সব অসংগঠিত ‘ঝুপস’, তাদের অনেকগুলিই ধুঁকছে। কেউ-কেউ একবেলা দোকান খুলে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তাঁদের কাছে ‘টিফিন’ খেতে আসেন যাঁরা, তাঁদের অধিকাংশই নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। উপায় না দেখে দাম বাড়াতে হচ্ছে ঝুপড়ি দোকান মালিকদের, ভাবছেন, কী করে গ্যাসের জোগান অক্ষুণ্ণ রাখা যায়। যে সব রেস্তরাঁ ধাক্কা খেয়েছে, তাদের কর্মচারীর মুখ শুকনো, এই ভাবে কত দিন?
অটোচালক বললেন, জানেন দাদা, যুদ্ধের হিড়িক তুলে দাম বাড়ানোর খেলা শুরু হয়ে গেছে! কথাটা মিথ্যে নয়। আনাজপত্র-ফলের বাজারের নিয়ন্ত্রণ এই মুহূর্তে নিয়ে নিয়েছে পাইকার-দালাল-ফড়েরা; যে কৃষক ফসল ফলাচ্ছেন, তাঁদের হাতে যে এই টাকা যাচ্ছে, তা নয়, যুদ্ধের ধোঁয়াশা ছড়িয়ে বিপুল-বিসদৃশ লাভ কামাচ্ছে কৃষক আর উপভোক্তার মধ্যে থাকা দালাল-ফড়ের দল। অথচ কলকাতার কোনও বাজারে দাম নিয়ন্ত্রণে আনার খবর এখনও কানে আসেনি।
এও জানা গেল, অটোচালকরা মিলিত ভাবে অসন্তোষ জানানোর পরেই নাকি অটোর গ্যাসের জোগান অনেক স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। দাদা, সব মিডলম্যানদের খেলা! বললেন, সেই অটোচালক। জানতে ইচ্ছে করে, তিনি কাকে ভোট দেবেন?
মনে পড়ে গেল, কলকাতা ১৯৬৫-৬৬’র কথা। খাদ্যের জন্য আন্দোলন; আন্দোলনকারীদের উপর পুলিশের গুলি— বসিরহাট, বারাসত, কৃষ্ণনগর। খাদ্য চাই, সেই চাওয়া আদায় করে নেবে আন্দোলনকারীরা, এমনই প্রতিজ্ঞা! ৪৫ জন শহিদ।
এখনকার তরুণ বামপন্থীরা কি এই ইতিহাস ভুলে গেছেন? ভুলে গেছেন ওই সময়ে ঘটা দমদম বাজারের ঘটনা? যখন রেশন দোকানের মালিককে চাল মজুত করার জন্য, কালোবাজারে বিক্রি করার অপরাধে ঠেঙিয়েছিল ক্ষুব্ধ জনতা? যার থেকে এল সেই শব্দবন্ধ ‘দমদম দাওয়াই’? যার ফলে দমদম তো বটেই, অন্যান্য বাজারেও কালোবাজারিরা একটু হলেও ভয় পেয়ে গেল?
মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা ধরে অগ্রসর হলে, মানুষের উপর প্রতিনিয়ত বর্ষিত হচ্ছে যে অনাচার, অসাম্য এবং মিথ্যাচারের প্রবাহ, তার স্বরূপ সহজেই উন্মোচন করা যায়, এ কথা কি ভুলে গেছেন আজকের বামপন্থীরা? এ দেশে বামপন্থী তথা কমিউনিস্টদের, এমনকি পনেরো বছর আগে, এ-রাজ্যে সিপিআই(এম)-বিরোধীদের উত্থানও তো এই বহু-পরীক্ষিত পথে! দৈনন্দিন সমস্যার মূলটি চেনাতে পারলেই সহজে বোঝানো যায় আমেরিকা-রাশিয়ার দাদাগিরির সঙ্গে দেশের শাসকদের কী যোগাযোগ? তখন তাকে আর মানুষের সমর্থন টানতে অমুক চোর, অমুক তোলাবাজ বলে ভোটের প্রচার করতে হয় না। যদি অ-বামপন্থী, অ-কমিউনিস্টদের প্রচারের সঙ্গে বামপন্থী প্রচারের গুণগত পার্থক্য না থাকে, তা হলে আর কিসের বামপন্থা?
শুধুমাত্র ভোটের সওদা নয়, নীতিগত ভাবে বামপন্থা যে বাজার-চলতি ক্ষমতাভোগী পার্টিগুলির থেকে অন্য কিছু বলার থাকতে পারে, তাও তো বোঝাতে হবে বামপন্থীদের। এ-কথাও তো এই যুদ্ধের আশঙ্কায় কাঁপতে থাকা মানুষকে, মূল্যবৃদ্ধিতে পীড়িত মানুষকে বোঝাতে হবে, অহরহ বুঝিয়ে যেতে হবে, সমাজবাদ হতে পারে বাঁচার পথ।
মনে হয়, চার পাশের ভোটমুখী বামেরা সাধারণ মানুষের বিচারবুদ্ধির উপর, সমাজবাদের উপর তেমন একটা আস্থা রাখেন না। মনে মনে ধরে নেন, ভোটের সংখ্যার বাড়-বৃদ্ধি তাঁদের মধ্যে টাকা বিতরণের সমানুপাতিক! শাসকদের হাতে টাকার থলে, অতএব...। যদি তাও হয়, তা হলেও তো এ-কথা বোঝাার অবকাশ থাকছে, এই টাকা আসছে কোথা থেকে? হে কমরেডগণ, বিশ্বের কোথাও কি এমন ফক্কিকারির উপর দাঁড়িয়ে বাম-আন্দোলন এগিয়েছে? যদি বা বর্তমান শাসকের অনাচারের জন্য সাধারণ মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বামপন্থীদের ভোট দেন, তা হলেও তা হবে অপশাসন বিরোধী ভোট— সমর্থনের ভোট নয়। ফলে প্রশ্ন থাকলই।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)