E-Paper

সত্যের পথ প্রশ্নের পথ

প্রশ্ন করবে, তর্ক করবে। তবে সেই প্রশ্ন বা তর্কের আগে প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করতে হবে। পর্যবেক্ষণ ও সংবেদনের মাধ্যমে।

বিশ্বজিৎ রায়

শেষ আপডেট: ১১ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৫৩

কী  করেছিল বালক নচিকেতা? বাবাকে খ্যাতি ও প্রতিপত্তি লাভের সময় প্রশ্ন করে বিচলিত করেছিল? আজকাল ছেলেদের নাম নচিকেতা রাখা হয় না আর তেমন, আগে হত— কিছু দিন আগেও হত। নচিকেতা কি পারিবারিক সুখ-শান্তি বিনষ্ট করেছিল? অথচ স্বামী বিবেকানন্দ নচিকেতাকে খুব ভালবাসতেন।

পরিবার। সন্দেহ নেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সামাজিক সংগঠন, প্রতিষ্ঠান হিসাবে ক্ষমতাশালী। অনেকে তো আজকাল আবার রাষ্ট্রকেও বৃহত্তম পরিবার হিসাবে ভাবছেন, ভাবতে ও ভাবাতে চাইছেন। এতে নাকি রাষ্ট্রের সঙ্গে একাত্মতার বোধ তৈরি হয়। রাষ্ট্রপ্রধান পরিবারের পিতার মতো, মাননীয় ও ক্ষমতাশালী। সচরাচর পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোয় পরিবারের মাথায় থাকেন পিতা। তাঁকে কি প্রশ্ন করা যায়? বিশেষত এমন কোনও মুহূর্তে যখন সেই পরিবার-পতি আপাতদৃষ্টিতে খুবই ভাল কাজ করছেন বলে মনে হচ্ছে। সেই কাজে আবার যখন পরিবার-পতির ও পরোক্ষে গোটা পরিবারের বেশ খ্যাতি হচ্ছে, সেই খ্যাতি ও প্রতিপত্তি লাভের মুহূর্তে কি প্রশ্নহীন ভাবে নীরব থাকাই সঙ্গত নয়? তাতেই কি পরিবারের সংহতি রক্ষা পায় না? আদি-ভারতের রচনাসমূহের মধ্যে কি এর কোনও উদাহরণ কাহিনি আছে? আছে নচিকেতার গল্পে।

ভারতবর্ষীয় জ্ঞানকাণ্ডের প্রতিফলন উপনিষদ গ্রন্থাবলির মধ্যে রয়েছে। রামমোহন, যাঁর প্রতি বিবেকানন্দের গভীর শ্রদ্ধা ছিল, তিনি সতীদাহ প্রথার বিরোধিতা করার আগেই বাংলায় উপনিষদ গ্রন্থাবলি অনুবাদ করতে শুরু করেছিলেন। উপনিষদের নচিকেতা তাঁর পিতাকে প্রশ্ন করেছিলেন। তর্কশীল সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ কৃষ্ণযজুর্বেদীয় কঠোপনিষদের নচিকেতা চরিত্রটিকে ভালবাসতেন ছেলেটির প্রশ্নশীলতা ও আত্মবিশ্বাসের জন্য।

নচিকেতার পিতা বাজশ্রবস, যজ্ঞফলাভিলাষী হয়ে বিশ্বজিৎ যজ্ঞ করছিলেন। যজ্ঞ শেষ হবে, বাজশ্রবস তখন ব্রাহ্মণদের দক্ষিণা প্রদান করছেন। দাতা হিসাবে নাম প্রতিষ্ঠিত হোক এই তাঁর বাসনা। নচিকেতার বয়স তখন বেশি নয়, তবে পর্যবেক্ষণ শক্তি ও সংবেদনশীলতা গভীর। সে খেয়াল করল, পিতা যে গাভীগুলি পুরোহিতদের দিচ্ছেন তাদের আর জল বা ঘাস খাওয়ার শক্তি নেই। এরা যে আবার দুধ দেবে এমন সম্ভাবনাও আছে বলে মনে হচ্ছে না। গাভীগুলির ইন্দ্রিয় অকর্মণ্য হয়েছে, প্রসবক্ষমতা হারিয়েছে তারা। নচিকেতার মনে হল এই অকর্মণ্য, সামর্থ্যহীন গরুগুলি দান করা ঘোরতর অন্যায়। শাস্ত্রে আছে, যিনি নিষ্ফল গাভী দান করেন তিনি আনন্দশূন্য নরকে যান। তাই নচিকেতা বাবার এই দানকার্যের বিরুদ্ধে প্রশ্নশীল হয়ে উঠল।

প্রশ্নশীল হতে পারার কারণ, সে ‘শ্রদ্ধাবিবেশ’— আবিষ্টশ্রদ্ধা বালক। বাবা যজ্ঞ সমাপন করছেন, পুরোহিতেরা দান নিয়ে চলে যাচ্ছেন। গরুগুলির অবস্থা সম্বন্ধে তাঁরা তখনও অবধি কোনও কথা বলেননি। আপাতঅর্থে স্থিতাবস্থা বজায় রয়েছে। এই সময় কি নচিকেতার কিছু বলা উচিত? চুপ করে থাকাই তো ভাল, স্থিতাবস্থা ও পরিবারের সুনাম বজায় থাকবে। পরে সময়-সুযোগ মতো পিতাকে জিজ্ঞাসা করলেই হয়। নচিকেতা অবশ্য চুপ করে থাকার পাত্র নয়, সে যে শ্রদ্ধায় আবিষ্ট।

ইংরেজি ‘রেসপেক্ট’ শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হিসাবে আমরা শ্রদ্ধা শব্দটি প্রয়োগ করি। ‘রেসপেক্টেড’-এর প্রতিশব্দ শ্রদ্ধেয়। এখন দেশ-কাল-সমাজের চাপে যিনি মাননীয় তিনিই শ্রদ্ধেয়, যিনি ক্ষমতাশালী তিনিই মাননীয়। জাগতিক দিক দিয়ে ক্ষমতাশালী না-হলে মাননীয় হওয়া যায় না, আর মাননীয় হলেই তাঁকে শ্রদ্ধেয় বলে মেনে নিতে বাধ্য হন সাধারণ মানুষ। নইলে ক্ষমতাশালী মাননীয় ও তাঁর অনুচরেরা হামলা করতে পারেন নানা ভাবে। নচিকেতার গল্পে শ্রদ্ধা শব্দটি ‘রেসপেক্ট’, ‘রেসপেক্টেড’ ইত্যাদির অনুষঙ্গে ব্যবহৃত হয়নি, সেখানে শ্রদ্ধা-র অর্থ বিশ্বাস বা প্রত্যয়। নচিকেতার মনে প্রকৃত সত্যের প্রতি বিশ্বাস জেগে উঠেছিল। প্রকৃত সত্য হল: এই গোসম্পদ দানের অযোগ্য, এই দান ছলনা। সেই সত্য উপলব্ধিতে বিশ্বাসী বালক পিতাকে প্রশ্ন করল, “আপনি আমাকে কাকে দান করলেন?” কেন এই জিজ্ঞাসা! বাবা তো হাত খুলে দিতেই শেখেননি, অথচ দাতা হিসাবে খ্যাতি পেতে চাইছেন। তাই ছেলে চাইছে, বাবা তাঁর শ্রেষ্ঠ সম্পদ যে পুত্র তাকেই বরং দান করুন। বাবাকে দান করতে শেখানোই যেন তার প্রতিবাদ।

এক বার নয়, তিন বার বাবাকে এ প্রশ্ন করায় তিনি বিরক্ত। শেষে রেগে বললেন, “আমি তোমাকে যমের কাছে সমর্পণ করলাম।” অনেক সময় রেগে গিয়ে আমরা যেমন বলি ‘যমের বাড়ি যা’, এও তেমন। বাবার কথা শুনে নচিকেতা ভাবল, অনেকের মধ্যে আমি এগিয়ে, আবার অনেকের মধ্যে আমি মাঝারি, কিন্তু অধম তো কখনও নই। সচরাচর সবচেয়ে খারাপ জিনিস আমরা যমকে দিয়ে থাকি, খুব খারাপকে বলি যমেরও অরুচি। তাই নচিকেতা ভাবছে, আমি তো এত খারাপ নই যে আমাকে যমকে দিলেন বাবা! তবে দিয়েছেন যখন, প্রতিবাদী পুত্র বেরিয়ে পড়ল যমের বাড়ির দিকে। তার আত্মবিশ্বাস একটুও টাল খেল না বাবার কাজে। এও তো শ্রদ্ধার ফল, নিজের উপর বিশ্বাসের ফল।

বিবেকানন্দ নচিকেতার এই কাহিনির ভাবগত সম্প্রসারিত করেছিলেন। তাঁর মনে হয়েছিল, পরাধীন ভারতবাসীর নিজেদের উপর প্রত্যয় বা বিশ্বাসের অভাব। এই প্রত্যয়, বিশ্বাস ছাড়া প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। তাই নচিকেতার মতো প্রত্যয় চাই। পিতা যদি ভুল কাজ করেন, তাঁকে প্রশ্ন করতে হবে। বৃহতের প্রেক্ষাপটে আপাত স্থিতাবস্থাপ্রদায়ী ছোট কাজকে প্রশ্ন করা দরকার। বিবেকানন্দ তাঁর ‘প্র্যাক্টিকাল বেদান্ত’ বক্তৃতায় বলেন, আদি ভারতের দার্শনিক পন্থাকে কেবল বুদ্ধির অকেজো ব্যায়ামের উপকরণ হিসাবে দেখলে চলবে না। তাকে সমকালে প্রয়োগ করতে হবে। অন্যত্র, বিশেষত ভাববার কথা নামের গল্পগুলিতে এমন ইঙ্গিত স্পষ্ট দিয়েছিলেন, পুরনো ভারত মোটেই সবজান্তা ও সর্বজ্ঞ নয়। এ থেকে আদি ভারতের জ্ঞানকাণ্ডকে কাজে লাগানোর দু’টি উপায় বুঝতে পারা যায়। ভারতীয় জ্ঞানকাণ্ডে সব কিছুর সমাধান আছে, এমন ভাবা বাতুলতা। দ্বিতীয়ত, সেই জ্ঞানকাণ্ডের উপকরণের মধ্যে যে সত্য আছে, সমকালের সূত্রে তা প্রয়োগ করতে হবে। নচিকেতার কাহিনি সত্য উপলব্ধির সূত্রে বিশ্বাস বা প্রত্যয়ের গুরুত্ব স্বীকার করেছিল, বিবেকানন্দ তাঁর সমকালে সেই আত্মবিশ্বাসে ভারতবর্ষীয়দের প্রতিষ্ঠা দিতে চেয়েছিলেন।

এই বিশ্বাস বলে, পারিবারিক প্রাতিষ্ঠানিকতার কাঠামোকে বিচলিত করতে পারে এমন সত্যও উচ্চার্য। যে মুহূর্তে তা মনে হবে তখনই তা উচ্চারণ করা চাই। নচিকেতা যমের বাড়ি গেল, যমের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হল, সে আত্মজ্ঞান লাভ করল। উপনিষদের এই পরবর্তী অংশের কথা ছেড়ে পুনরায় এই প্রশ্নের মুহূর্তের কাছে ফেরা যেতে পারে। প্রশ্নের মুহূর্তটি বুঝিয়ে দিচ্ছে, বাবার দানবীর হিসাবে খ্যাতিলাভের ছদ্ম-প্রয়াসের বিরোধিতা পুত্রের করা উচিত। বাবা, বাবা বলেই মাননীয় নন।

ছোট আপাততুচ্ছ সাময়িক সত্যের সঙ্গে বড় সত্যের সংঘাত, রবীন্দ্রনাথের লেখাতেও ফিরে আসে। ফিরে আসে পরিবার ও দেশ, দুই প্রতিষ্ঠানের স্থিতাবস্থাকামী আধিপত্যের বিরুদ্ধে। রবীন্দ্রনাথ ‘সত্য’ নামের লেখাটিতে জানান, “আমাদের আত্মানুরাগ, দেশানুরাগ, লোকানুরাগ অনেক সময়ে আমাদিগকে সত্যভ্রষ্ট করিতে চেষ্টা করিতে থাকে; এইজন্যই সত্যানুরাগকে এই-সকল অনুরাগের উপরে শিরোধার্য করা আবশ্যক।” নচিকেতা পিতার প্রতি অনুরক্ত হয়ে সত্যানুরাগ ত্যাগ করেনি। পরে পিতা যখন তাকে যমের বাড়ি যাওয়ার ক্ষেত্রে আটকাতে চাইলেন, তখনও রাজি হয়নি।

দেশানুরাগের নামে আমরা কী করি? রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “বাঙালি মনে করে যথেষ্ট পরিমাণে পরিশ্রম না করিয়াও গোলেমালে কাজ সারিয়া লওয়া যায়, বীজ রোপণ না করিয়াও কৌশলে ফললাভ করা যায়, তেমন ফন্দি করিতে পারিলে মিথ্যার দ্বারাও সত্যের কাজ আদায় করা যাইতে পারে। এইজন্য বাঙালি... কাজ না করিয়াও দেশহিতৈষী হইয়া উঠে, বিশ্বাস করে না তবু লেখে ও এই উপায়ে মিথ্যাকথা বলিয়া অর্থ সঞ্চয় করে। বাঙালির জীবনটা কেবল গোঁজামিলন।” এ কি কেবল বাঙালির ধর্ম? এ তো নচিকেতার বাবারও পারিবারিক ধর্ম। ফন্দি করে অকর্মণ্য গরু দান করে দাতা হিসাবে নাম কেনার চেষ্টা। কাজ না করে দেশহিতৈষী হওয়ার মতো, প্রকৃত দান না করে দানবীর হওয়া। এ এক গোঁজামিলন।

এর বিরোধিতা কে করবে? করবে উত্তরপ্রজন্ম। প্রশ্ন করবে, তর্ক করবে। তবে সেই প্রশ্ন বা তর্কের আগে প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করতে হবে। পর্যবেক্ষণ ও সংবেদনের মাধ্যমে। যদি সেই প্রশ্নের মুহূর্তে পরিবার বা পরিবারকল্প প্রতিষ্ঠান থেকে দমিয়ে দেওয়ার মতো আঘাত আসে, তা হলেও নিজের উপর বিশ্বাস হারানো চলবে না।

নচিকেতার পথ কঠিন। সত্য তো কঠিনই। বালক নচিকেতা তা জানত। বিবেকানন্দ নচিকেতাকে ভালবাসতেন। রবীন্দ্রনাথ সত্য কঠিন জেনেই সত্যকে ভালবাসতেন।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

debate observer vivekananda Rabindranath Tagore

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy