E-Paper

এই ভস্মভার সময়ে

শীতের সন্ধ্যা দ্রুত নামে খালবিল আর সর্ষে খেতে ভরা এই গ্রামগুলিতে। আলো পড়ার আগেই গ্রাম ঘুরে দেখাতে নিয়ে গেলেন স্থানীয় মানুষজন। পাকা বাড়ির সংখ্যাই বেশি, ছোট ছোট জমিতে হাঁস-মুরগির দৌড়ঝাঁপ।

অগ্নি রায়

শেষ আপডেট: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ ০৮:২৩

অনন্ত গোধূলিলগ্নে সেইখানে বহি চলে ধলেশ্বরী’, ‘বাঁশি’ কবিতায়, সেই নদীর গন্ধ ভাসছে হাওয়ায়। গঞ্জের পাশে আরাইচা ঘাট থেকে কালিগঙ্গা বয়ে গিয়ে মিশেছে সন্নিকটের ধলেশ্বরীতে। আগে এই জলপথে ছিল মরিচা সর্ষের রমরমা বাণিজ্য। এখন তাকে নিয়ে জনপদে তৈরি অনেকানেক গল্প।

ঘণ্টাখানেক হল খিলজি রোজ, মিরপুর ছাড়িয়ে গাবতলি রোডের সুবিশাল বাস স্ট্যান্ড (যেখানে থেকে পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলি গন্তব্য) পার হয়ে আরাইচা রোডে পড়েছি। দু’ধারে পেঁপে, কুমড়ো, বেগুন এবং সর্ষের খেত খলিয়ান মাঘের ভোরে আশীর্বাদের মতো সবুজ-সোনালি হয়ে ছড়িয়ে। গোটা ঢাকা শহরকে আলু বেগুন ভুট্টা খাওয়ায় এই মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর উপজেলা। এখানকার জামশা, ধালা, জয়মন্টপ, চান্দারের গ্রামগুলির মাটির রসে বীজ যেন কথা বলে। লোককথা, রানি এলিজ়াবেথ সিঙ্গাইরের গুড় খেয়ে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, ব্রিটিশ সিংহের সিলমোহর দিয়ে শংসাপত্র পাঠিয়েছিলেন বিলেত থেকে। সেই হাজারি গুড়ের ঐতিহ্য এখনও চলছে বিশেষ পৌষ সংক্রান্তির পিঠে পায়েসে। চেখে দেখলে টের পাওয়া যায় বাংলাদেশের মাটির মায়া।

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের উপর পীড়ন এবং অত্যাচারের ভাষ্য যখন সাউথ ব্লকের রাতের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে, এই মানিকগঞ্জ এলাকাকে একফালি মরূদ্যানই বলি। সম্প্রীতি যেখানে ইতিহাসের ধুলোর সঙ্গে মিশে রয়েছে। রাস্তার ধারে ছোট্ট চুল্লি জ্বালিয়ে জিলিপি ভাজা হচ্ছে দেখে গাড়ি দাঁড় করানো হল। অদূরেই জয়মন্টপ বাজার, যার নাবাল জমিতে রমরম করে চলছে, ‘জয়মন্টপ প্রিমিয়ার লিগ’ ক্রিকেট ম্যাচ। হিন্দু এবং মুসলমান মিলেমিশেই দাপট দেখাচ্ছে বাইশ গজে। শুধু ক্রিকেটের নয়, জীবনের ময়দানে দাঁড়িয়েও এখানে একই বিড়িতে টান মারেন রাম ও রহিম। এটা বিএনপি-র ঘাঁটি বরাবরই, জামায়াতের বিশেষ উপস্থিতি নেই। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনেও বিএনপি-র ভোটভিত্তি এখানে পরান্মুখ হয়নি। ঘুমিয়ে থেকেছে বড় জোর।

সিঙ্গাইরের স্নায়ুমূল, সপ্তদশ শতকের একেবারে গোড়ায় তৈরি হওয়া গুরু বৈষ্ণব গোসাঁই শিবমন্দিরকে কেন্দ্র করে। বিশাল মাঠের পুবে এই সুপ্রাচীন মন্দির যার দু’হাতায় আরও একটি শিব ও দুর্গামণ্ডপ মন্দির। প্রতি দিন বিগ্রহ পূজাপাঠ। পৌষমেলা চড়ক কালবৈশাখী মেলা এবং দুর্গাপুজোর সময় যা জমায়েত হয় সেখানে কয়েক ক্রোশ দূর থেকে মানুষ আসেন, তিল ধারণের জায়গা থাকে না নাকি এই মাঠে। বাউল সাধুদের জন্য বানিয়ে দেওয়া হয়েছে একটি পাকাপাকি আস্তানা। হিন্দু মেলায় মুসলমান ছোট ব্যবসায়ীদের কামাই হয় ভাল, জানাচ্ছেন স্থানীয় বিএনপি পদপ্রার্থী মইনুল ইসলাম খান শান্ত। যাঁর বাবা ছিলেন খালেদা জ়িয়ার আস্থাভাজন মন্ত্রী। এখানকার শান্তিকল্যাণে তাঁর অবদানের কথা বলাবলি করেন হাটের মানুষ। মইনুলেরই ভাগ্নে আমিনুলের সঙ্গে এই হিন্দু-অধ্যুষিত গ্রাম দেখতে আসা। এই গ্রামে জন্ম ও বেড়ে ওঠা বংশ পরম্পরায় আমিনুলেরও। মন্দির কমিটির এক হিন্দু বাড়িতে মধ্যাহ্নভোজের ব্যবস্থা হয়েছে। উঠোনের চার পাশে পুরনো ধাঁচের দালানে ঘেরা বাড়ি, মাঝে তুলসীমঞ্চ। বাড়ির মেয়েরা দালানে স্নান সেরে বসে শীতের রোদে চুল শুকোচ্ছে। কাছেই গরুর বাথান তা গন্ধে টের পাওয়া যায়, বহিরাগত তাতে অনভ্যস্ত হলেও এখানে সেটাই স্বাভাবিক। সুগন্ধি নাজিরশাইল চাল, হাঁসের মাংস, টাকিমাছের ভর্তা আর গুড়ের পুলিপিঠেয় আন্তরিক আতিথ্য আর গল্পগুজব।

মধ্যাহ্নভোজের ওই আড্ডায় বাড়ির মালিক সজল দাস আর তার ছোটবেলার বন্ধু, আমার সফরসঙ্গী আমিনুল বলছেন, “চব্বিশের ৫ অগস্ট যখন দেশ জুড়ে তোলপাড় চলছে, আমি নিজের খরচে ওই মেলার মাঠে যৌথ হেঁশেল করেছিলাম, ধর্মনির্বিশেষে এলাকার সবার জন্য। দু’বেলা খিচুড়ি খাওয়া চলেছে বেশ কয়েক দিন। উৎসবের মতোই ছিল সেই ব্যাপারটা। মনে রাখতে হবে তখন দেশে কোনও সরকার নেই। আর এই এলাকায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বুনটটা শক্ত বলেই আশঙ্কা ছিল না। কিন্তু গোটা দেশে তো পরিস্থিতি খারাপই ছিল সে সময়। হিংসার আগুন ছড়াতেই পারত।”

হিংসার আগুন যে এখানে আদৌ ছড়ায়নি, ইতিহাস কিন্তু সে কথা বলে না। মুক্তিযুদ্ধের সময় এখান থেকে দু’কিলোমিটার দূরে রামনগরে বোমা পড়েছিল, বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছিল খান সেনা। সেই সময় বিএনপি প্রার্থী সামসুল ইসলাম খান (যিনি বাংলাদেশের শিল্পমন্ত্রী এবং বর্তমান প্রার্থী মইনুলের বাবা) পীড়িত মানুষদের আশ্রয় দিয়েছিলেন, হিন্দু মন্দির পাহারায় রাখা হত তাঁর উদ্যোগেই।

“থমথমে থাকত পরিবেশ। রেডিয়োতে খবর আসত যুদ্ধের। তার পর এক দিন বাড়িতে বাড়িতে বলাবলি শুরু হল দেশ স্বাধীন হয়ে গিয়েছে। তখন খুবই ছোট। বিশেষ কিছু বুঝিনি তবে আনন্দ একটা হয়েছিল, সবাই রাস্তায় নেমে একে অন্যকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছিল এটা মনে আছে। বঙ্গবন্ধুকে সম্মান করত এখানকার মানুষ।” বলছেন প্রবীণ দীনেশচন্দ্র হালদার, অবসরপ্রাপ্ত কৃষি মন্ত্রকের চাকুরে। হিন্দুদের পুজো উদ্‌যাপন পরিষদের সদস্যদের সঙ্গে বসে মত বিনিময় করছেন বিএনপি প্রার্থী শান্ত, যিনি তাঁর বাবার সুবাদে হিন্দু মনের আস্থা পেয়ে এসেছেন বরাবর। তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছি তাঁদেরই পারিবারিক প্রাচীন দালান আর গাছে ঘেরা বাড়িতে। বৈঠকের মাঝে ‘আল্লার দেন বিরিয়ানি হাউস’ থেকে কাচ্চি মোরগ বিরিয়ানি এসেছে হিন্দু মোড়লদের জন্য। বৈঠকের পর শান্তর বাড়িরই একটি ঘরে বসে খেলেন পূজা কমিটির মনোহরী মুদি, সুশীল দাস, শম্ভু সাহা পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের ইউনিয়ন কমিটির বিভিন্ন সদস্য। পরিষদের সাধারণ সম্পাদক পেশায় আইনজীবী ইতিরানি সাহা জানালেন, এখানকার দুর্গোৎসবগুলিতে মুসলমানদের দলে দলে যোগদানের কথা। কোনও হিংসা তিনি তাঁর এলাকায় ইহজীবনে দেখেননি। কিন্তু এটা তাঁর গ্রামের বিচ্ছিন্ন চিত্র।

বলছেন, “হীনম্মন্যতা আমাদেরও যেমন মজ্জাগত, জামায়াতের তেমনই হাড়মজ্জায় হিন্দু নির্যাতন মিশে রয়েছে। বেশির ভাগ জায়গায় উঁচু গলায় কথা বলতে পারে না হিন্দুরা, অন্য সম্প্রদায়ের উগ্র নেতারা তার সুযোগ নেয়। তবে এটা মানিকগঞ্জের কথা নয়, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, শ্রীহট্ট এমন অনেক জেলা রয়েছে, যেখানকার গ্রামগুলিতে হিন্দুরা আতঙ্কে। এটা কেবল বর্তমান জমানায় ভাবলেও ভুল হবে। শেখ হাসিনার সময়েও কিছু কম অত্যাচার হয়নি দুর্গাপুজোর সময়। কুমিল্লার নসিবনগর, কুষ্টিয়ার অভয়নগরে দুর্গাপ্রতিমা ভাঙচুর করে কোরান শরিফ রেখে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে আওয়ামী লীগের সময়ই।”

সরকারি হিসাবে মোট সাড়ে চার হাজার মন্দির রয়েছে এই দেশে। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি। দুর্গাপুজো হয় ৩৪ হাজার। সরকারি অনুদান (এককালীন কুড়ি হাজার টাকা) পাওয়া যায় বলে কিছুটা রোজগারের জন্যও পুজো করেন অনেকে। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিনিধিরাও টাকা দেন। এই উপজেলাতেই দেড়শোর মতো মন্দির রয়েছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বছরেও এখানে পুজো বন্ধ হয়নি, জানাচ্ছেন সজল দাস।

শীতের সন্ধ্যা দ্রুত নামে খালবিল আর সর্ষে খেতে ভরা এই গ্রামগুলিতে। আলো পড়ার আগেই গ্রাম ঘুরে দেখাতে নিয়ে গেলেন স্থানীয় মানুষজন। পাকা বাড়ির সংখ্যাই বেশি, ছোট ছোট জমিতে হাঁস-মুরগির দৌড়ঝাঁপ। একই পাঁচিলের এ-পারে হিন্দু ও-পারে মুসলিম ঘর, সারি দেওয়া। দুইয়ের মধ্যে ঝগড়া কাজিয়া লেগেই থাকে, কিন্তু তা ধর্ম নিয়ে নয়। সাধারণ পড়শির মধ্যে যেমনটা হওয়া স্বাভাবিক, তেমনটাই। আবার বিপদে-আপদে একে অন্যের জন্য বুক দিয়ে ঝাঁপায়। ছোটখাটো চুরি-বাটপাড়ি লেগে রয়েছে, কিন্তু সেই অপরাধের কোনও ধর্মীয় মেরুকরণ এখনও নেই।

পায়ে পায়ে এসে দাঁড়িয়েছি বিশাল সেই মাঠের মাঝখানে, যার তিন দিকে তিন প্রাচীন মন্দির। গ্রামবাসীরাও এসেছেন পিছনে পিছনে। তাঁদের মধ্যে গেরুয়া পরিহিত এক বৈরাগী, ভবানীচরণ এগিয়ে এলেন কৌতূহলী মুখে। প্রশ্ন করায় জানালেন, “এখানকার মুসলমান আর হিন্দুরাই দায়িত্ব দিয়েছে এই মন্দিরের পূজা-অর্চনা দেখার, গত পঁচিশ বছর ধরেই রয়ে গিয়েছি। খাওয়াদাওয়ার সংস্থান হয়েছে, গানবাজনা করে আনন্দেই আছি।” ভারত থেকে সাংবাদিক এসেছে, তাই চেয়ার পাতা হল। মুরুব্বিরা বসলেন সঙ্গে। সন্ধ্যা নামছে, ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। ছোট ছোট সুখ-দুঃখের গল্প বলছেন গ্রামের মানুষরা। শিবের গাজন আর চড়কের মেলার জন্য এখন অপেক্ষা তরঙ্গহীন জীবনে। ঢাকা থেকে মনিহারি নিয়ে মেলায় বেচবেন মাসুম শেখ, ঘনশ্যাম সাহারা। সুসার আসবে ক’দিনের জন্য সংসারে, জাতীয় নির্বাচন ধুয়ে তাঁদের জল আসবে না।

সূর্য পাটে যাচ্ছে এই আশ্চর্য গ্রামে। দেশের এই ঘনভার, ভস্মভার সময়ে। খোলা আকাশের তলায় বৈরাগী গান ধরেছেন “দয়া করে এসো শম্ভু এই অধীনের হৃদমন্দিরে, আনন্দ দাও দয়াল আমারে..।”

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bangladesh humanity

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy