×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

০৭ মে ২০২১ ই-পেপার

এক দেশ, এক মৃত্যুমিছিল

জয়ন্ত বসু
০৩ মে ২০২১ ০৫:৪১

উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যার এক কোভিড আক্রান্ত দম্পতি বিজেপি শাসিত কেন্দ্রীয় সরকারকে একটা মৌলিক প্রশ্নের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছেন। খবর অনুযায়ী, নির্মীয়মাণ রাম মন্দিরের শহর ও আশপাশের হাসপাতাল ঘুরে, বেড তো দূরস্থান, অক্সিজেনটুকুও না পেয়ে, উত্তরপ্রদেশ থেকে অ্যাম্বুল্যান্স চড়ে ৮০০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে তাঁদের পশ্চিমবঙ্গের একটি হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। প্রশ্ন হল— যা এক মধ্যবিত্ত পরিবার জীবন বাঁচাতে করে উঠতে পারল, তা কেন্দ্রীয় সরকার করা তো দূরস্থান, ভেবে পর্যন্ত উঠতে পারল না কেন এই মহাসঙ্কটের মুখোমুখি হয়েও? কেন ‘এক দেশ, এক নাগরিকত্ব কার্ড’ বা ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’ তত্ত্বের প্রবক্তা দল ও তার সরকার ‘এক দেশ, এক স্বাস্থ্যব্যবস্থা’র কথা বলছে না? কেন আদালতের ভাষায় কোভিড সুনামির সামনে দাঁড়িয়ে কার্যত প্রত্যেক রাজ্যকে নিজেরটা নিজেকেই বুঝে নিতে বলছে, এমনকি পাঁচ রাজ্যের নির্বাচন প্রায় মিটে আসতেই রাজ্যগুলিকে কেন্দ্রের তুলনায় অনেক বেশি দাম দিয়ে কোভিড টিকা কিনতে ঠেলে দিচ্ছে? কেন কোভিড সামলাতে দেশ জুড়ে কোনও সামগ্রিক পরিকল্পনা নেই, যার ফলে বিভিন্ন রাজ্যের হাই কোর্টকে পরিস্থিতি সামলাতে প্রায় প্রশাসনিক দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে?

গোটা দেশ কমবেশি কোভিড আক্রান্ত হলেও সব রাজ্যের অবস্থা সমান খারাপ নয়। রাজধানী দিল্লির মানুষ যখন অক্সিজেনের অভাবে আক্ষরিক অর্থেই হাঁসফাঁস করছেন, তখন অনেক রাজ্যেই অক্সিজেন যথেষ্ট। আসলে সরকার নিজের নীতির ফলেই গোটা দেশের মধ্যে অনেকগুলি দেশ তৈরি করে ফেলেছে। তাই সব রাজ্যই ‘আপনি বাঁচলে বাপের নাম’ ফর্মুলায় শুধুমাত্র নিজের অক্সিজেন, নিজের ওষুধের প্রয়োজনের কথা ভাবছে, পাশের রাজ্যের কথা ভাবছে না। কারণ রাজ্যটি নিশ্চিত নয় যে, নিজের প্রয়োজনে সে সাহায্য পাবে কি না!

যদি অক্সিজেন মূলত দিল্লির সমস্যা হয়, তবে অন্য অনেক রাজ্যের, যেমন পশ্চিমবঙ্গে সমস্যা হল কোভিড আক্রান্তদের জন্য হাসপাতালের বেড পাওয়া। পাশাপাশি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ক্ষেত্রেও আকালের সম্ভাবনা দেখছেন অনেকেই। রাজ্যে এই মুহূর্তে কোভিড বেড ১২,৩৫০-এর আশেপাশে। প্রতি দিন গড়ে আক্রান্ত হচ্ছেন ১৬,০০০। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সংখ্যাটা ২৫,০০০ হতে বেশি সময় লাগবে না। আক্রান্তদের অধিকাংশই হয় উপসর্গবিহীন, বা সামান্য উপসর্গ নিয়ে কয়েক দিনের মধ্যে ভাল হয়ে উঠছেন। কিন্তু শতাংশের হারে সামান্য হলেও হাসপাতালে যেতে হচ্ছে, এমন রোগীর সংখ্যা কম নয়। ইতিমধ্যেই কলকাতা ও তার চার পাশের হাসপাতালে ‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই’ রব। রাজ্য সরকার লম্বা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার জাঁতাকলে কোনও বড় সিদ্ধান্ত করতে পারেনি। আধিকারিকরা ‘যেমন চলছে তেমন চলুক’-এ গা ভাসাচ্ছেন, আর মানুষ গভীর সঙ্কটে নিক্ষিপ্ত হচ্ছেন।

Advertisement

কিন্তু দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু বা কলকাতার মতো শহরকে কোভিডের দ্বিতীয় ঢেউ ভাসিয়ে নিয়ে গেলেও এমন মাঝারি মাপের শহরও আছে, যেখানে পরিস্থিতি অপেক্ষাকৃত ভাল, পরিকাঠামোও আছে। কেন আয়ুষ্মান ভারত নিয়ে বড়াই করা সরকার গুরুতর অসুস্থদের বিমানে চাপিয়ে অন্য শহরে বা রাজ্যে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যেতে পারছে না? কেন দিল্লিতে হাসপাতালগুলি অক্সিজেন শেষ হয়ে যাবে জানানো সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় সরকার মুমূর্ষু মানুষগুলিকে হেলিকপ্টারে অন্য শহরে নিয়ে যেতে পারল না?

পাল্টা বক্তব্য, এত বড় খরচের ধাক্কা সরকারের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। নিশ্চয়ই সম্ভব। যে দেশে একটা রাজ্যের নির্বাচনে প্রচারের জন্য ব্যবহৃত চার্টার্ড ফ্লাইট আর হেলিকপ্টারের খরচ কম-বেশি একশো কোটি টাকা, নির্বাচন পরিচালনার জন্য হাজার হাজার আধা সেনাকে কোটি কোটি টাকা খরচ করে উড়িয়ে আনা যায়, সেখানে দাঁড়িয়ে মানুষের প্রাণ বাঁচাতে ‘সব কা সাথ, সব কা বিকাশ’-এর স্লোগান তোলা সরকার এটুকু করতে পারে না? পারে না এক রাজ্য থেকে চিকিৎসক বা স্বাস্থ্যকর্মীদের অন্য রাজ্যে আনতে, যেমন গত বছর প্রবল সঙ্কটের সময় ক্যালিফর্নিয়া পাঠিয়েছিল নিউ ইয়র্ককে?

এগুলি বললেই পাল্টা যুক্তি সাজানো হয় যে, স্বাস্থ্য রাজ্যের তালিকাভুক্ত, ফলে কেন্দ্রীয় সরকারের হাত-পা বাঁধা। কিন্তু ঘটনা হল, গত বছর কেন্দ্রীয় সরকার বিপর্যয় প্রতিরোধ আইন প্রয়োগ করে রাজ্যগুলির উপর কোভিড নিয়ে স্পষ্টতই কর্তৃত্ব করেছিল। এমনকি তারা কেন্দ্রের অনুমতি ছাড়া লকডাউন ঘোষণা করতে পারবে না, এমন নিদানও দিয়েছিল। এখন দিনে গড়ে সাড়ে তিন লক্ষের উপর মানুষ আক্রান্ত হওয়ার সময় কেন্দ্র কার্যত দায়িত্ব থেকে হাত ধুয়ে ফেলছে। গত বছর জানুয়ারি মাসে কেন্দ্রীয় অর্থ কমিশন প্রস্তাব দেয় যে, স্বাস্থ্যকে শুধুমাত্র রাজ্যের তালিকায় না রেখে কেন্দ্র ও রাজ্যের যৌথ তালিকায় আনা হোক। কিন্তু সম্ভবত কোভিড অতিমারিতে বাড়তি দায়িত্ব না নেওয়ার ইচ্ছা থেকেই এখনও অবধি মোদী সরকার এ বিষয়ে বিশেষ হেলদোল দেখায়নি। মাঝখান থেকে ‘এক দেশ, এক মৃত্যুমিছিল’ চলছেই।

Advertisement