E-Paper

সুস্থায়ী উন্নয়নের লক্ষ্যে

যাঁরা এত দিন জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারকারী কার্বন-নিঃসরণকারী শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সেই শ্রমিকদের কী হবে?

সুযাত্র ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৬:১২

কোভিড-পরবর্তী সময়ে জীবাশ্ম জ্বালানি, অর্থাৎ কয়লা ও তেলের অত্যধিক ব্যবহার প্রচুর পরিমাণে গ্রিনহাউস গ্যাস, যেমন— কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন ও জলীয় বাষ্পের নিঃসরণের জন্য দায়ী। ওয়ার্ল্ড এনার্জি আউটলুক-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২১ সালে মানব-ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কার্বন ডাইঅক্সাইড নিঃসৃত হয়েছিল। এই গ্রিনহাউস গ্যাসগুলি পৃথিবীকে উষ্ণ রেখে বসবাসযোগ্য করে তুললেও এদের অতিরিক্ত নিঃসরণ সরাসরি বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে।

আজকাল শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলি ‘এনভায়রনমেন্টাল, সোশ্যাল, অ্যান্ড গভর্ন্যান্স’ বা উন্নত ইএসজি রেটিং পাওয়ার জন্য তার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ প্রযুক্তি, কাঁচামাল ব্যবহার করে, কারণ বৃহৎ বিনিয়োগকারীরা কোনও ফার্মে বিনিয়োগের পূর্বে সেই ফার্মটির ইএসজি রেটিং দেখেন। জীবাশ্ম জ্বালানি-নির্ভর উৎপাদন পদ্ধতি সংস্থার রেটিং দুর্বল করে। তাই এখন নেট জ়িরো নিঃসরণের ধারণা প্রাধান্য পেতে শুরু করেছে। নেট জ়িরো বলতে বোঝায়, আমরা ঠিক যতটা গ্রিনহাউস গ্যাস, যেমন— মিথেন, কার্বন ডাইঅক্সাইড পরিবেশে যোগ করছি, ঠিক ততটাই কোনও না কোনও উপায়ে অকার্যকর করে দিচ্ছি, যাতে ফলাফল শূন্য হয়। এর জন্য প্রয়োজন প্রযুক্তিগত পরিবর্তন। অর্থনীতিগুলি এই কারণে পুনর্নবীকরণযোগ্য উৎস, যেমন— সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, হাইড্রোজেন প্রভৃতিতে রূপান্তরের পথে যাত্রা শুরু করেছে, যাতে দূষণহীন উৎপাদন সম্ভব হয়। এর জন্য চাই দক্ষ শ্রমশক্তি, যারা পরিবর্তনের এই বিপ্লব সংঘটিত করতে পারবে। ফলে, আগামী দিনে এই শ্রেণির শ্রমশক্তির চাহিদা বাড়বে।

যাঁরা এত দিন জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারকারী কার্বন-নিঃসরণকারী শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সেই শ্রমিকদের কী হবে? জলবায়ু পরিবর্তনের ‘ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি’ বা আইইএ-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে নেট জ়িরো নিঃসরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে ২০৩০ সালে ভারতে দূষণমুক্ত শক্তি ক্ষেত্রে প্রায় তিন কোটি নতুন কর্মসংস্থান হবে। কিন্তু ওই একই সময়ে জীবাশ্ম জ্বালানি-সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে প্রায় এক কোটি তিরিশ লক্ষ মানুষের কাজ চলে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। নেট জ়িরো নিঃসরণ যাতে সর্বব্যাপী উন্নয়ন প্রক্রিয়ার অন্তরায় না হয়ে দাঁড়ায়, তার জন্য আমরা যদি ওই পুরনো প্রযুক্তির শ্রমিকদের রি-স্কিলিং’এর সুযোগ দিতে পারি, তবে তাঁরাও উৎপাদনের মূল স্রোতে থেকে এক সুস্থায়ী উন্নয়ন সুনিশ্চিত করতে পারবেন।

কিন্তু এই রূপান্তর কি খুব সহজ? এই যে তিন কোটি নতুন কর্মসংস্থান হবে, সেই দক্ষ, প্রশিক্ষিত শ্রমিকের জোগান পাওয়া যাবে কী ভাবে? প্রথাগত জীবাশ্ম জ্বালানি-সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে যে এক কোটি তিরিশ লক্ষের চাকরি হারানোর সম্ভাবনা, তাঁদের পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে গেলে দক্ষতার বিস্তর পার্থক্য দেখা যাবে। এখানেই প্রয়োজন রি-স্কিলিং, যাতে প্রযুক্তির পাশাপাশি এই অদক্ষ শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রেরও সুচারু স্থানান্তর সম্ভব হয়। এক নামী তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, আমরা যদি সর্বোচ্চ ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বিশ্বের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি অনুমোদন করি, তা হলে ২০৩০ সালে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ মানুষের সচেতনতা, দূষণ সংক্রান্ত নিয়মবিধি, প্রযুক্তি প্রভৃতির জন্য বর্তমানের তুলনায় প্রায় ৪৫% হ্রাস পাবে। কিন্তু তখন যদি আমরা পূর্ববর্ণিত তিন কোটি দক্ষ শ্রমশক্তির জোগান না দিতে পারি, তা হলে প্রস্তাবিত সময়ে নেট জ়িরো নিঃসরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না। সময়মতো এবং সঠিক ভাবে রি-স্কিলিং না হলে শ্রমিকের অতিরিক্ত চাহিদা সৃষ্টি হবে, কাজও সময়মতো শেষ হবে না। জীবাশ্ম জ্বালানি সম্পর্কিত শক্তি ক্ষেত্র এবং পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি ক্ষেত্রে কাজ করা শ্রমশক্তির মধ্যে দক্ষতার একটা স্পষ্ট ফারাক আছে। এই ব্যবধান দূর করতে প্রয়োজন অদক্ষ শ্রমিকের যথোপযুক্ত প্রশিক্ষণব্যবস্থা। সময়োপযোগী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগের দক্ষতা থাকলে পুনর্নবীকরণযোগ্য শক্তি ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় সৌর প্যানেল প্রতিস্থাপন, বায়ু-টারবাইন প্রভৃতির যত্ন সহজেই সম্ভব। তাই প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষা— উভয়কেই প্রযুক্তি-নির্ভর না করলে রি-স্কিলিং সম্ভবপর হবে না।

রি-স্কিলিং’এর উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের সহাবস্থানে এবং সহযোগিতায়। সে ক্ষেত্রে ভারতে প্রধানমন্ত্রী কৌশল বিকাশ যোজনা (পিএমকেভিওয়াই)-র পাশাপাশি কর্পোরেট ক্ষেত্রকে এগিয়ে আসতে হবে। ‘কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি’ বা সিএসআর ভারতে রি-স্কিলিং’এর সমস্যা অনেকটাই দূর করতে পারে। পিএমকেভিওয়াই এবং সিএসআর সম্পূর্ণ ভাবেই এ ক্ষেত্রে একে অপরের পরিপূরক। কিন্তু ২০২৫-২৬’এ ক্যাগ রিপোর্টে পিএমকেভিওয়াই-এর বেশ কিছু ত্রুটি নজরে এসেছে। ডেটার বিশ্বাসযোগ্যতা, পারিশ্রমিক এবং বৃত্তি প্রদানে বিলম্ব, শিল্পের প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা— সব নিয়েই ক্যাগ প্রশ্ন তুলেছে।

অন্য দিকে, ২০১৫ সাল থেকে কোম্পানিগুলির সিএসআর-এর মাত্র ৩.৫% ব্যয় করা হচ্ছে দক্ষতা গঠনের জন্য। নেট জ়িরো নিঃসরণের পথ প্রশস্ত করতে হলে এই হার বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। তবে, এখানেই শেষ নয়। দেখতে হবে, এই নেট জ়িরো নিঃসরণের সুফল যেন অর্থনীতির দুর্বলতম ক্ষেত্রেও সমান ভাবে সঞ্চারিত হয়। নয়তো ভারতে সুস্থায়ী উন্নয়ন কেবল একটি স্বপ্নই থেকে যাবে।

নেতাজিনগর কলেজ

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Climate Crisis Central Government Carbon Emission

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy