আর যে দিকেই দেখা যায়, অনন্ত জলরাশি চঞ্চল রবিরশ্মিমালাপ্রদীপ্ত হইয়া গগনপ্রান্তে গগনসহিত মিশিয়াছে। নিকটস্থ জল, সচরাচর সকর্দ্দম নদীজলবর্ণ; কিন্তু দূরস্থ বারিরাশি নীলপ্রভ। আরোহীরা নিশ্চিত সিদ্ধান্ত করিলেন যে তাঁহারা মহাসমুদ্রে আসিয়া পড়িয়াছেন; তবে সৌভাগ্য এই যে, উপকূল নিকটে, আশঙ্কার বিষয় নাই।” এই শব্দমালা ধীরে জন্ম নিচ্ছিল লেখকের ভিতরে। মেদিনীপুরের নেগুয়ার (অধুনা কাঁথি) সেই গভীর অরণ্যপথে লেখক এসেছেন কাজের সূত্রে। এখানে তাঁর পরিচয় ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট ও ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টর বাবু বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। এক ডাকাতির মামলার তদন্ত করতে এসে স্থানীয় ডাকবাংলোয় উঠেছেন। এক দিকে সমুদ্রের বিস্তৃত নীল জলরাশি, আর এক দিকে গভীর জঙ্গল। বালিয়াড়ি পেরিয়ে জঙ্গলের পথ দিয়ে যেতে হয় স্থানীয় লোকবসতিতে। এখানেই তদন্তের সূত্রে পরিচিত হন এক কাপালিকের সঙ্গে। কালীমন্দির, কাপালিক, বালিয়াড়ি, জঙ্গল, এ-সবের মধ্যেই হয়তো মানসলোকে তৈরি করেছেন নিরাভরণ দেবীমূর্তিস্বরূপ কপালকুণ্ডলাকে। বঙ্কিমচন্দ্র নেগুয়ায় বদলি হন ১৮৬০-এর ২১ জুন। পদোন্নতিও হয়, সে বছরই ৭ নভেম্বর। ডাকাতির ঘটনায় তদন্তের ফল জানা যায়নি। কপালকুণ্ডলা উপন্যাসের বীজটুকু সেই অঞ্চল থেকে পাওয়া, এটুকু তথ্যই সঞ্চিত। কপালকুণ্ডলা বেরিয়েছিল আরও ছয় বছর বাদে, ৫ মার্চ ১৮৬৬।
প্রশাসনিক কর্তা বঙ্কিমের পরিচয় পাওয়া যায় বেশ কয়েকটা ঘটনায়। সুন্দরবনের বারুইখালির ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ। ১৮৬০-এই বঙ্কিমচন্দ্র খুলনার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট পদে বদলি হয়ে আসেন। ঘটনাটি ১৮৬১-র। খুলনা জেলার সুন্দরবনের এক বিশাল অংশের নাম মরেলগঞ্জ। বারুইখালি তারই একটা গ্রাম। মরেলগঞ্জ জমিদারির ম্যানেজার ছিলেন ডেনিস হিলি, কৃষক-অত্যাচারের জন্য কুখ্যাত। বারুইখালিতে রহিমউল্লা নামে এক কৃষক ছিলেন; লাঠিচালনায় বিশেষ দক্ষ, গ্রামবাসীর বিপদে ভরসা। তাঁর নেতৃত্বে গ্রামের মানুষ সংগঠিত হচ্ছিলেন। রহিমউল্লা ও বারুইখালির মানুষদের দমন করতে এক রাতে ঘুমন্ত গ্রামের উপর আক্রমণ চালান হিলি ও তাঁর দলবল। দাঙ্গার একটা খবর খুলনার জেলাশাসকের কাছে ছিল, কিন্তু তাঁকে বিভ্রান্ত করে খবর দেওয়া হয়েছিল, দাঙ্গা হওয়ার সম্ভাবনা সুরুলিয়ায়। বঙ্কিম সুরুলিয়ায় পুলিশ পাহারা মোতায়েন করেন সেই রাতে। বারুইখালি সম্পূর্ণ প্রহরাহীন ছিল। হিলি সেই সুযোগ নেন।
অতর্কিত আক্রমণ হলেও রহিম ও তাঁর দলবল যথেষ্ট লড়াই করেছিল। কিন্তু বন্দুকের জয় হল। রহিমউল্লা-সহ বেশ কয়েকজনের মৃত্যু হল। বেশির ভাগের দেহই জঙ্গলে পুড়িয়ে দেওয়া হল। রহিমউল্লার লাশ হিলি সম্ভবত অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত করেন। ভোরে এই খবর পেয়েই বঙ্কিমচন্দ্র পঞ্চাশ জন সেপাই নিয়ে নিজে ঘটনাস্থলে এলেন, হিলি ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলেন। হিলি পালিয়ে যান। তদন্ত হল, মামলা চলল পনেরো বছর। হিলির সহযোগী এক সাহেবের ফাঁসি ও ৩৪ জন আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হল।
পরে ‘বাঙ্গালার কৃষক’ প্রবন্ধে বঙ্কিম জমিদারদের হাতে কৃষকদের নায্য বিচার না পাওয়ার কথা লিখেছেন। নায়েব-গোমস্তা গরিব প্রজার উপর জুলুম করেও কী ভাবে নিস্তার পায়, তা যুক্তি ও উদাহরণ-সহ বুঝিয়েছেন। আবার এক আখ চাষির খেতের সব আখ অসৎ প্রতিবেশী রাতের অন্ধকারে কেটে নিয়ে গেলে, বঙ্কিম নিজে গ্রামে এসে অভিযুক্তের অপরাধ প্রমাণ করেন। বিচারক বঙ্কিমের নিরপেক্ষতার বহু প্রমাণ মেলে। উচ্চপদস্থ কোনও ব্যক্তি বা তাঁর নিকটাত্মীয় কেউ তাঁর কাছে বিচারব্যবস্থার সুযোগ নিতে এলে তিনি রেগে যেতেন।
সেই সময় গোরা পল্টন ও পুলিশ ছিল ভয়ের কারণ। এক গোরা সেপাই একটি গাড়ির কোচোয়ান ও দুই যাত্রীকে অন্যায় ভাবে মেরেছিল। দুই যাত্রীর এক জন নাজির, অন্য জন উকিল। গোরা পুলিশের সপক্ষে পুরো কোতোয়ালি মিথ্যে সাক্ষী দিয়ে বলে, কোচোয়ান নাজির ও উকিলই নাকি পুলিশের গায়ে হাত দিয়েছে। বঙ্কিম নিজে তদন্ত করে, এক পথচারীর সাক্ষ্যকে মান্যতা দিয়ে ওই পুলিশের ছ’মাস কারাবাসের রায় দেন। ন্যায় ও সত্যের পথে চলার এই আদর্শ তাঁর পরিবারসূত্রেই প্রাপ্ত শিক্ষা: তাঁর পিতা যাদবচন্দ্র মেদিনীপুরের ডেপুটি কালেক্টর ছিলেন। মেদিনীপুরে যে স্কুলে বালক বঙ্কিমকে ভর্তি করা হয়, তাঁর সাহেব অধ্যক্ষ যাদবচন্দ্রের প্রতি ঔদার্যবশত ও বঙ্কিমের ভাল ফলাফলের জন্য তাঁকে ইস্কুলে ডবল প্রমোশন দিতে চাইলেও অতিরিক্ত সুবিধাজ্ঞানে যাদবচন্দ্র তা নেননি।
বঙ্কিমচন্দ্রের রায়দান ও বিচারপদ্ধতির সম্পূর্ণ নথি পাওয়া যায়নি। সে আমলের নিয়ম অনুযায়ী একটা নির্দিষ্ট সময় অতিক্রম করলে বিচারের নথি পুড়িয়ে ফেলার চল ছিল। বারুইপুরের রেজিস্ট্রি অফিসের হেড ক্লার্ক কালীদত্তের স্বচক্ষে দেখা ঘটনার বর্ণনা না পড়লে জানা হত না, ডায়মন্ড হারবার অঞ্চলে প্রবল বন্যার পর ত্রাণ সংগ্রহের প্রধান করে তাঁকে পাঠানোর কথা, বঙ্কিমচন্দ্রের ত্রাণ সংগ্রাহকের ভূমিকাও। এমন বহু ঘটনার নথি হারিয়ে গেছে, কিছু রয়ে গেছে লোক-কথায়।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)