E-Paper

একের পর এক সিনেমা-যুদ্ধ

২০১০-এ অকিঞ্চিৎকর অভিযোগে গ্রেফতার হন জাফর পানাহি। বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল কর্তৃপক্ষ মঞ্চের মাঝখানে একটা কুর্সি রাখলেন, তার উপরে লেখা ‘জাফর পানাহি’। অনুপস্থিতিতে এই স্বীকৃতির পাশাপাশি আবিশ্ব প্রশংসিত হল তাঁর লুকিয়ে তোলা ইৎ ফিল্ম নিস্ত— দিস ইজ় নট আ ফিল্ম— এটা ফিল্ম নয়।

অনমিত্র বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ২২ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৫৪

পুলিশ একটা মেয়েকে পাকড়াও করল প্যাভিলিয়নে। গাঁজা-চরস? উঁহু, হাতে জলের বোতল শুধু। মাঠের মধ্যে দৌড়েনেমেছিল? না তো, ঘাপটি মেরে ছিল এক কোনায়, পাছে কেউ দেখে ফেলে। পকেটমার? তার কাছে শুধু বাসভাড়া। তবে কি স্লেজিং? না, সে তো ভাল মেয়ে। তবে? মেয়ে, এটা মানতেই হবে। জায়গাটা যে স্টেডিয়াম, সেটাও। এই মুলুকে তার অস্তিত্বই অপরাধ; স্টেডিয়ামে উপস্থিতি আইনবিরুদ্ধ, উপাসনাগৃহেও। কয়েকটার বাইরে জীবিকা চয়নও।

সেই মেয়েটার দুর্ভোগ, দৃষ্টান্ত— ‘গব্বর আ জায়েগা!’ এক চিত্রপরিচালকের শিশুকন্যা খেলা দেখতে যাওয়ার বায়না করে; তখন গব্বরের ফরমান নয়, গব্বরের আধিপত্য তাঁকে ভাবায়। জাফর পানাহি (ছবি) তাই নেমে পড়লেন স্টেডিয়ামে। ছবি তুললেন সেই মেয়েদের যারা ইরানকে বিশ্বকাপে জিততে দেখতে চায়— অথচ দেশাত্মবোধের অর্ধেক সমিধকে শাসক রোদ্দুর লাগতে দেবে না। ইরানে নিয়ম, অন-স্ক্রিন কোনও মেয়ে অনাবৃত-শিরে থাকবে না। অথচ বাড়িতে কেউ হেডস্কার্ফ পরে না। যাতে কৃত্রিম না মনে হয়, পানাহিকে বাধ্য হয়ে শুটিং নামাতে হত আউটডোরে। সতীর্থরা সেই বাধ্যতা বোধ করেননি। সেন্সরের আড়ালে ভয়ঙ্কর ভবিষ্যৎকে উপেক্ষা করে ওই অপলাপটুকু মেনে নিয়েছিলেন। একা পানাহি বিব্রত বিদ্রোহের আগে শেষ আপসে। কিন্তু অফসাইড ছবিটি বানিয়ে যেন আপন কফিনে প্রথম পেরেক ঠুকলেন— ‘অবমানিতের মর্মবেদনা’র নীলকণ্ঠ হয়ে।

২০১০-এ অকিঞ্চিৎকর অভিযোগে গ্রেফতার হন জাফর পানাহি। বার্লিন ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল কর্তৃপক্ষ মঞ্চের মাঝখানে একটা কুর্সি রাখলেন, তার উপরে লেখা ‘জাফর পানাহি’। অনুপস্থিতিতে এই স্বীকৃতির পাশাপাশি আবিশ্ব প্রশংসিত হল তাঁর লুকিয়ে তোলা ইৎ ফিল্ম নিস্ত— দিস ইজ় নট আ ফিল্ম— এটা ফিল্ম নয়। কারণ, কুড়ি বছর ব্যাপী নিষেধাজ্ঞা। পানাহি নিষেধ ভাঙলেন— ঘরে, ট্যাক্সিতে, গ্রামের পথে। সামান্য উপাদানে, গেরিলা লড়াই। তাঁর নির্দেশে শুটিং চলে আউটডোরে, তিনি সহকারীর সঙ্গে দর্শভাষে সংযুক্ত।

ট্যাক্সি তেহরান ছবিতে স্বভূমিকায় পানাহি তাঁর ইন্টারোগেটরের কণ্ঠস্বর শুনে শিউরে উঠেছিলেন। পরে বলেছিলেন, বিবর্তিত সেই জুলুমের কথা তাঁর ছবিতে ঘুরেফিরে আসবেই। গত বছরের য়েক্ তসাদফ-এ সাদে বা ইট ওয়াজ় জাস্ট অ্যান অ্যাক্সিডেন্ট ছবিতে দেখছি, মরুভূমির মাঝখানে অত্যাচারিত কয়েকজন— কয়েদখানার ইন্টারোগেটরের বিচারসভা বসিয়েছে। সে তাদের কী কী করেছিল? ওয়াহিদের পিঠের হাড় ভেঙে দিয়েছিল, তাকে হাতে ভর দিয়ে সোজা হতে হয়। ওয়াহিদের বাগ্‌দত্তা আত্মহত্যা করেছিল। হামিদকে তিন দিন উল্টো ঝুলিয়ে রেখেছিল। রক্ত জমে হামিদের মাথার গোলমাল দেখা দিয়েছে। গোলিকে চোখ বেঁধে টানা তিন ঘণ্টা যে কোন মুহূর্তে ফাঁস এঁটে হত্যার ভয় দেখিয়েছিল। গোলি আর শিবা তার হাতে ‘মলেস্টেড’ হয়েছিল। এরা বন্দি ছিল শাসনতন্ত্রের বিরুদ্ধাচরণের অভিযোগে— লক-আউট কারখানার বাইরে ধর্না বা হেডস্কার্ফ না-পরা, সবই ইসলামিক রিপাবলিকের বিরুদ্ধাচরণ। তারা একে একে তাকে শনাক্ত করছে, অপরাধ স্বীকারের সুযোগ দিচ্ছে। এই বিচারসভায় রুদ্ধশ্বাস অ্যাড্রেনালিন নেই। ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধ হাওয়ামোরগের মতো তা দর্শকের বিবেককে ‘গিল্টি’ আর ‘নট গিল্টি’র মধ্যে চরকিপাক খাওয়ায় না। শিল্পগুণ যা কিছু, সত্যতার উপরে প্রতিষ্ঠিত— ‘তাই এ কাব্য’। তাঁর দুঃসাহসিক সংগ্রাম প্রতিফলিত না হলে হয়তো এই আঙ্গিককে বলা যেত ‘শিল্পহীন’।

এক কালে আরবের ‘নসখ’ লিপি ফারসি লেখার জন্য গৃহীত হয়। পারস্যের সাংস্কৃতিক উৎকর্ষের উত্তরাধিকারে মরুদেশের কাঠখোট্টা হরফের ক্যালিগ্রাফিক সংস্করণ তৈরি হল— ‘নস্তলিক’। পদ্যে, বিয়ের নিমন্ত্রণপত্রে, স্কুলের হাতের লেখার খাতায় আর সিনেমার পরিচয়-লিখনে সেই লিপিই দস্তুর। পানাহির ছবির টাইটল কার্ডে কাঠ-কাঠ নসখ। ভাবের গাম্ভীর্যকে অপ্রয়োজনীয় কারুকার্যে রূপ দিতে তাঁর অনীহা।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হয় ইজ়রায়েলের সঙ্গে সংঘাতকালে। সম্ভবত আন্তর্জাতিক বিদ্বৎমহলের নেকনজরে থাকতে চায় ইরান, আর পানাহি রাষ্ট্রের পক্ষে কথা বললে প্রজ্ঞাপনে সুবিধা। ফ্রান্সে জিজ্ঞাসা করা হল, এ বার তো শান্তিতে ফিল্ম বানাতে পারবেন? পানাহি বললেন, তা হতে পারে না। ইতিমধ্যে ইরানের অর্ধেক জনসংখ্যা খেপে উঠেছে সূর্যের আলোর জন্য। মাহশা আমিনিদের হত্যা সেই আগ্নেয়গিরি উস্কে দিয়েছে মাত্র। তেহরানের পথেঘাটে মেয়েরা হিজাব পরতে ঘৃণা বোধ করছেন। শৃঙ্খল হিসাবে যার ব্যবহার, তা আর কোনও মতেই অলঙ্কার হতে পারে না— ইরানের জেন-জ়ি বুঝেছে। তা ফিল্মে উঠলে সেন্সরে আটকাবে। অগত্যা জাফর পানাহি লুকিয়েই সিনেমা বানাবেন।

চাঁদের পাহাড়-এ শঙ্করের মনে হয়েছিল, আলভারেজ হিরের খনি খুঁজে মরেছেন বিপদসঙ্কুল আফ্রিকায়, অথচ কুবেরের ঐশ্বর্যও তাঁকে ঘরের কোণে বেঁধে রাখতে পারবে না। ওঁর নেশা হিরে পাওয়ার নয়, খোঁজার। জাফর পানাহিরও সেই ধাত, একটা যুদ্ধ মিটলে আর একটা খুঁজে নেন। একটার পর একটা যুদ্ধে জিতে বা হেরে মানবতাকে সাবালক করে তোলেন ওঁরা।

গবেষক, আইআইটি ভিলাই

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

fim Film Director

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy