E-Paper

সুরের আকাশে ধ্রুবতারা যাঁরা

সে-যাত্রা পার পেলেও, মেডিক্যাল কলেজের উল্টো ফুটে সিসিল হোটেলের উপরের ঘরে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের সামনে আবার অন্য বিপদ।

অলক রায়চৌধুরী

শেষ আপডেট: ২০ জুন ২০২৬ ০৬:০২

বাঙালি গালগল্প ভালবাসে, গান-গল্পও। গানের গল্প কি শুধু সুর বাণী শিল্পী রেকর্ডিং এই নিয়ে? আরও কত গল্প ছড়িয়ে ইতিহাসের প্রান্তে, প্রত্যন্তে। দেশ পত্রিকার তরফে দেবাশিস দাশগুপ্ত গিয়েছিলেন বেহালার সিরিটিতে, ব্রজতরঙ্গ-বাদক ও যন্ত্রটির উদ্ভাবক ব্রজেন বিশ্বাসের ঠিকানা খুঁজতে। শচীন দেব বর্মণের সুরসঙ্গী যিনি, তাঁকে কেউ না কেউ নিশ্চয়ই চিনবেন! দোকানে চা খেতে খেতে ক্লাবের কয়েকটি ছেলেকে জানালেন এক জনের খোঁজ করছেন, খুব প্রয়োজন, দেশ থেকে আসছেন। শুনে একটি ছেলের আগ্রহী প্রশ্ন, “দেশে এ বার ধান কেমন হল?”

এই শর্মার সাক্ষাৎকার নেওয়ার অভিজ্ঞতা জানানো যাক। বাগবাজারে জগন্ময় মিত্রের যদি বা দেখা মিলেছিল নির্দিষ্ট সময়ের ঘণ্টা দুই পরে, প্রতিপ্রশ্ন শুনে ঘাম ছোটার জোগাড়: “সাক্ষাৎকার পাবে, যদি আমার গাওয়া দশটা গানের প্রথম লাইন বলতে পারো।” সে-যাত্রা পার পেলেও, মেডিক্যাল কলেজের উল্টো ফুটে সিসিল হোটেলের উপরের ঘরে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের সামনে আবার অন্য বিপদ। আগে দু’-তিন দিন গুছিয়ে উত্তর দিয়েছেন, সে দিন বললেন, “আমার গলায় যে ট্রিমেলো আছে সেটা তুমি ভাল নকল করতে পারো শুনেছি, একটু গেয়ে দেখাবে?” লজ্জায় মাটিতে মিশে যাওয়ার দশা, কিন্তু তিনিও নাছোড়বান্দা। দু’লাইন গাওয়া গেল, ‘দূরে দূরে থেকো না’। জড়িয়ে ধরে বললেন, “গলা কাঁপছে দেখেই তো গান থেকে সরে এসেছি ভাই।” এমন সিদ্ধ শিল্পী আর পাওয়া যাবে?

মঞ্চে গাওয়া ওঁর রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে কাগজের আলোচনায় আমোদই পেতেন জর্জ বিশ্বাস। এক বার প্রেক্ষাগৃহে প্ৰখ্যাত সাংবাদিককে দেখেই বললেন, “আইজ আপনারে একটা লেখার খোরাক দিমু।” তার পর ওই গলায় ‘আমরা দূর আকাশের নেশায় মাতাল ঘরভোলা সব যত’, আগাগোড়া অচেনা সুরে! বিরতিতে বর্ষীয়ান সাংবাদিক মঞ্চের ধারে একটু উত্তেজিত গলায় প্রশ্ন করছেন, এ সুর কোথায় পেলেন! উত্তর এল, “দোষ দিবেন না, কাল রাতে দিনুদা (মানে দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর) স্বপ্নে দিসে।”

অম্লমধু-র স্রোত বইত রামকুমার চট্টোপাধ্যায়ের বাড়িতেও, বেলার দিকে গেলে। সার দিয়ে মানুষ, কেউ এসেছেন গান শিখতে, কেউ যাত্রার সুর নিতে। তার মাঝে প্রশ্ন শুনে শরীর দুলিয়ে হাসি, “না হে, আমি নিজেই আমার গানে লিপ দিতে পারি না, ফস্কে যায়, সৌমিত্র পারবে কী করে?” তখন অমরগীতি বাজারে সুপারহিট, রামনিধি গুপ্তর গানে রামকুমারকে অনেকে চিনছেন নতুন করে। বললেন, “তরুণ মজুমদারকে জানিয়েছি যে অনুষ্ঠানে রিকুয়েস্ট স্লিপ এসেছে, তাতে লেখা, একটা নিধিরাম সর্দারের গান হোক।” নিজে অল্প হেসে এ দিক-সে দিক দেখছেন, কে কার গায়ে গড়িয়ে পড়ল।

কলেজ ক্যান্টিনে গাওয়া প্যারডিই এক দিন আন্তঃকলেজ প্রতিযোগিতায় গেয়ে দিলেন এক প্রতিযোগী। বিচারক মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। গান শুনে প্রবল বিষম খেলেন, কারণ ছেলেটি নজরুলের গানের এক জায়গায় গাইছে, ‘সহসা দখিনবায়ে কচুবনে (হবে চাঁপাবনে) জাগে সাড়া’। হল-ময় চাপা হাসি। যে হত প্রথম, সে পেল শেষ স্থান। তার অন্তত কুড়ি বছর পর অনুষ্ঠানপ্রার্থী ক’জন এসেছেন ওঁর কাছে, এক জনকে দেখামাত্র চিনেছেন মানববাবু, সেই সে দিনের ছোকরা! বললেন, “ভাই আপনার একটা ইন্টারভিউ নেব। সে-কচুবন কত বড় হল, এই নিয়ে। ফাঁকি দিতে পারোনি, এমন ধাক্কা জন্মে খাইনি বলে। খালি মারটা বাকি আছে তোমার।”

গম্ভীর মুখে রসিকতা করতে জানতেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। মেনকা সিনেমার পাশে ওঁর ডেরায় দরবার করতে এসেছে এক দল, অনুষ্ঠান ঠিক নয়, সংবর্ধনা। উনি বলছেন, “সংবর্ধনা যখন, তবে তো অল্প সময়ের ব্যাপার, কুড়ি হাজার দেবেন। কিন্তু গান হবে না। আর সংবর্ধনা ছাড়া শুধু গান গাইতে বললে পনেরো হাজারে করে দেব।” আয়োজকদের মুখগুলো বোঝাতে চণ্ডী লাহিড়ী বা কুট্টিকে দরকার।

জহর রায় রসবোধে অদ্বিতীয়। বিজয়া সম্মিলনীর অনুষ্ঠানে অনুপ ঘোষালকে বসিয়ে রাখা হয়েছে; ছদ্মবেশী ছবির ‘আরে ছো ছো ক্যা শরম কি বাত’-এর সঙ্গে নাচবেন জহর, রংমহলে থিয়েটারের শো ভাঙলে নিয়ে আসা হবে ওঁকে। নিজের বাঁধা রিকশায় চেপে এলেন, ছেলেরা যারা আনতে গিয়েছিল, ফিরল হেঁটে। এসেই মঞ্চে স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে বললেন, “আজ এখানে আসার পথে বড় প্রাপ্তি হল মা-জননীরা। সত্যিই আপনারা সুসন্তানের জন্ম দিয়েছেন। যারা আনতে গিয়েছিল, তাদের কাছে গাড়ির খোঁজ নিলাম। আমায় বলা হল, অনুপ ঘোষালের জন্য গাড়ি যায় বলে আপনাকেও গাড়িতে আনতে হবে নাকি? নিন, রিকশায় উঠুন!” আদতে এ-সব ঘটেইনি, কিন্তু জহরবাবুর কথায় বড়রা তো ‘কনভিন্সড’। মঞ্চে এসে ক্ষমা চাইছেন, আর যারা আনতে গিয়েছিল তাদের দশা কহতব্য নয়।

আবার একেবারে অন্য ছবিও দেখেছি। খবর এল, তিমিরবরণ অসুস্থ, গিয়ে কথা বলতে হবে। ক্ষুধিত পাষাণ-এর ওই ‘অর্কেস্ট্রেশন’-এর রূপকার, উদয়শঙ্করের পরম আস্থাভাজন তিমিরবরণকে এলাকার কেউ যে চেনেন না, ভাবিনি। নেতাজিনগর বাজারের উপরে অন্ধকার ঘরে বিছানায় আধশোয়া কিংবদন্তি বলেছিলেন, “গুরুর নিষেধ মানিনি। উদয়শঙ্করের সঙ্গে বিদেশে চলে গেলাম শিক্ষা অপূর্ণ রেখে। আমার ভাল হওয়ার কথা নয়।” তিমিরবরণের গুরু— শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ধ্রুবতারা উস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সাহেব।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

bengal

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy